ইনানীতে রিসোর্টের সংখ্যা জানে না প্রশাসন, বেশিরভাগের নেই ফায়ার লাইসেন্স ও পরিবেশ ছাড়পত্র
অগ্নিকাণ্ডে ১০ জনের মৃত্যুর পর উঠে এসেছে মেরিন ড্রাইভ এলাকার অর্ধশতাধিক হোটেল-রিসোর্টের নিরাপত্তাহীনতার চিত্র
কক্সবাজার জেলা প্রতিনিধি · উখিয়া, কক্সবাজার
প্রকাশ:
ইনানী কক্সবাজারের পাথুরে সৈকত, পর্যটকদের কাছে যার আকর্ষণ ক্রমেই বাড়ছে। কক্সবাজার থেকে মেরিন ড্রাইভ ধরে ইনানী ও টেকনাফের দিকে যাওয়া পর্যটকের সংখ্যা বাড়তে থাকায় এ অঞ্চলে অর্ধশতাধিক হোটেল, রিসোর্ট, কটেজ ও ভিলা গড়ে উঠেছে। অথচ এগুলোর বেশিরভাগেরই ফায়ার সার্ভিসের অনুমতি এবং পরিবেশ অধিদফতরের ছাড়পত্র নেই; নিরাপত্তার ঘাটতি নিয়েই চলছে এই স্থাপনাগুলো।
বিজ্ঞাপন
শনিবার (১৭ অক্টোবর) সকালে উখিয়ার ইনানীর পাটুয়ারটেক সৈকতে কাঠের তৈরি একটি রিসোর্টে আগুন লেগে ১০ জনের মৃত্যুর পর পর্যটকদের নিরাপত্তাহীনতার প্রসঙ্গটি আলোচনায় এসেছে। ফায়ার সার্ভিসের অনুমতি না নিয়েই টুপটুপ রিসোর্ট অ্যান্ড রেস্তোরাঁ বানানো হয়েছিল। চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর এক ব্যক্তি এটি নির্মাণ করেন। কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মুহাম্মদ মোরশেদ হোসেন জানান, জুন মাসে রিসোর্টটিকে এ নিয়ে সতর্ক করা হলেও মালিকপক্ষ সেটিকে গুরুত্ব দেয়নি।
দুর্ঘটনার পর ইনানী ও মেরিন ড্রাইভ এলাকার রিসোর্টগুলোর অনিয়ম এবং নিরাপত্তাহীনতা নিয়ে উদ্বিগ্ন পর্যটকেরা। তাঁরা জেলা প্রশাসনের দায়িত্বহীনতাকে দায়ী করছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মেরিন ড্রাইভ হয়ে ইনানী ও টেকনাফের পথে ঠিক কতগুলো হোটেল, রিসোর্ট, কটেজ ও ভিলা আছে, তার সুনির্দিষ্ট তালিকা জেলা প্রশাসনের হাতে নেই। এ কারণে এসব স্থাপনার পরিবেশগত ছাড়পত্র, অগ্নিনিরাপত্তা ও সরকারি অনুমোদন নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। স্থানীয়দের বক্তব্য, ইনানীর বেশিরভাগ ইকো-রিসোর্ট ও কটেজের কোনও নির্ভরযোগ্য সরকারি তালিকা নেই। ফায়ার লাইসেন্স, পরিবেশ ছাড়পত্র বা কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কউক) অনুমোদন না নিয়েই এগুলো অবৈধভাবে চলছে।
ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় প্রশাসনের তথ্যমতে, পাটোয়ারটেক ও ইনানী সৈকত এলাকার অর্ধশতাধিক রিসোর্টের বেশিরভাগের ফায়ার লাইসেন্স এবং পরিবেশ অধিদফতরের ছাড়পত্র কোনোটিই নেই। মালিকেরা অনুমতির জন্য ফায়ার সার্ভিস বা স্থানীয় প্রশাসনের কাছে আবেদনই করেননি, আর মাসের পর মাস অবৈধভাবে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রশাসনও এসব স্থাপনাকে অনুমতি দেয়নি। সর্বশেষ আগুনে পোড়া টুপটুপ রিসোর্টকে ফায়ার সার্ভিস গত ১১ জুন ঝুঁকিপূর্ণ ও বিপজ্জনক উল্লেখ করে আনুষ্ঠানিক নোটিশ দিয়েছিল। কর্তৃপক্ষ সেই নির্দেশনা পুরোপুরি অগ্রাহ্য করে ব্যবসা চালাচ্ছিল।
বিজ্ঞাপন
কয়েকজন রিসোর্ট মালিকের সঙ্গে আলাপে জানা গেছে, ইনানী এলাকায় এখন ৫০টির বেশি হোটেল, কটেজ ও রিসোর্ট চালু আছে। এগুলোর অনেকটাই কাঠ, বাঁশ ও অন্যান্য দাহ্য সামগ্রীতে তৈরি বলে আগুনের ঝুঁকিও তুলনামূলক বেশি।
পরিবেশ অধিদফতরের বিধি অনুযায়ী, নির্দিষ্ট শ্রেণির পর্যটন স্থাপনা বানাতে ও চালাতে পরিবেশগত ছাড়পত্র লাগে, যা নির্ধারিত নিয়মে নবায়নও করতে হয়। অধিদফতর অনলাইনেও এই সেবা দেয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ইনানী-মেরিন ড্রাইভ সড়ক ঘেঁষা বেশিরভাগ হোটেল-রিসোর্টে পরিবেশগত ছাড়পত্র যেমন নেই, তেমনি নেই পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থাও।
পরিবেশ অধিদফতরের কক্সবাজার জেলা কার্যালয়ের কর্মকর্তারা জানান, পাটুয়ারটেকে গড়ে ওঠা হোটেল-রিসোর্টগুলো ছাড়পত্র নেয়নি, এমনকি আবেদনও করেনি। কার্যালয়ের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা জানান, আগুনে পোড়া রিসোর্টটিরও ছাড়পত্র ছিল না। তাঁর ভাষ্য, ‘ইনানীর পাটুয়ারটেক এলাকায় টুপটুপ রিসোর্ট অ্যান্ড রেস্তোরাঁ নামের কোনও প্রতিষ্ঠানকে পরিবেশ অধিদফতরের পক্ষ থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়নি।’ তিনি আরও বলেন, এই নামের কোনো প্রতিষ্ঠান ছাড়পত্রের জন্য আবেদনও করেনি এবং সেখানকার ঝুঁকিপূর্ণ কোনো প্রতিষ্ঠানকে অধিদফতর ছাড়পত্র দেয়নি।
ইনানীতে ঠিক কয়টি রিসোর্ট আছে, তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই বলে স্বীকার করেছেন উখিয়ার ইউএনও পান্না আক্তার। তাঁর বক্তব্য, হোটেল, মোটেল ও রিসোর্ট নির্মাণ এবং পরিচালনা জেলা প্রশাসনের বাণিজ্য শাখা, পরিবেশ অধিদফতর, ফায়ার সার্ভিস ও কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ের বিষয়। শনিবারের অগ্নিকাণ্ডের পর উপজেলা প্রশাসন রিসোর্টগুলোর সঠিক তালিকা সংরক্ষণের উদ্যোগ নেবে বলেও তিনি জানান।
বিজ্ঞাপন
ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক মোরশেদ হোসেনের ব্যাখ্যা, সমুদ্রের তীব্র বাতাসে কাঠের রিসোর্টে আগুন দ্রুত ছড়ায়। এমন স্থাপনায় বহনযোগ্য অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র, অগ্নিসংকেত, হোস পাইপ ও অগ্নিনিরাপত্তা পরিকল্পনা থাকা দরকার, কিন্তু টুপটুপ রিসোর্টে এসবের কিছুই ছিল না, ফায়ার লাইসেন্সও না। রিসোর্টটি তৈরি হয়েছিল মাত্র সাত-আট মাস আগে, জায়গার মালিকানা নিয়েও দ্বন্দ্ব ছিল। এমনকি রিসোর্টের নিচতলায় খাবার রান্না হতো। তিনি জানান, এই এলাকায় গড়ে ওঠা বেশিরভাগ রিসোর্টের অনুমোদন নেই; ফায়ার সার্ভিস সেগুলো অনুমোদন দেয়নি।
ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরিন জুনাইদও একই কথা জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, কেবল ইনানী নয়, কক্সবাজারসহ দেশের নানা পর্যটন এলাকায় প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়াই কাঠের রিসোর্ট চলছে। এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ধাপে ধাপে ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করা হবে।
কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকার মতে, হোটেল-মোটেল ও রিসোর্টে পরিবেশগত ছাড়পত্র না থাকা জেলা প্রশাসনের উদাসীনতারই প্রমাণ। কয়েকটি সংস্থার সমন্বয়ে একটি হোটেল, মোটেল বা রিসোর্টের চূড়ান্ত অনুমোদন দেয় জেলা প্রশাসন। তিনি বলেন, সামান্য অবহেলার কারণে রিসোর্ট ব্যবসায়ীরা পার পেয়ে যাচ্ছেন; এখনই এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সময় এসেছে, নইলে প্রাণহানি বাড়তেই থাকবে।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, পর্যটনের টেকসই উন্নয়নে নতুন রিসোর্ট বানালেই চলবে না; পরিবেশগত মানদণ্ড মানা, অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ভবন নির্মাণবিধি অনুসরণ এবং নিয়মিত তদারকিও জরুরি। নইলে ভবিষ্যতেও এমন ভয়াবহ দুর্ঘটনার ঝুঁকি থেকে যাবে।