ওজন কমানোর উপায়: খাবার, ব্যায়াম আর অভ্যাসে সহজ পরিবর্তন
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ:
ওজন কমানোর আসল সূত্রটা জটিল নয়: শরীর প্রতিদিন যতটা শক্তি খরচ করে, তার চেয়ে কিছুটা কম ক্যালরি খেতে হবে, আর সেটা চালিয়ে যেতে হবে মাসের পর মাস। কোনো একটি চা, পাউডার বা বিশেষ খাবার একা মেদ গলিয়ে দেয় না। খাবারের পরিমাণ ও ধরন, নিয়মিত হাঁটা বা ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম আর কিছু ছোট অভ্যাস একসঙ্গে কাজ করলে তবেই ওজন কমে, এবং কমে যাওয়া ওজন ধরে রাখা যায়।
বিজ্ঞাপন
নিরাপদ গতি হলো সপ্তাহে মোটামুটি আধা কেজি থেকে এক কেজি। দৈনিক খাবার থেকে মোটামুটি ৫০০ ক্যালরি কমালে সপ্তাহে আধা কেজির মতো ওজন কমতে পারে, যদিও সবার শরীর একভাবে সাড়া দেয় না। প্রথম দু-এক সপ্তাহে ওজন দ্রুত কমতে দেখা যায়, যার বড় অংশ আসলে শরীরের পানি। এরপর গতি কমে আসে, এতে হতাশ হওয়ার কিছু নেই।
যাঁদের ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, থাইরয়েডের সমস্যা বা কিডনির রোগ আছে, কিংবা যাঁরা গর্ভবতী বা সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন, তাঁরা খাবার কমানোর আগে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের সঙ্গে কথা বলে নিন।
শুরুতে নিজের অবস্থা বুঝে নিন
ওজন কতটা কমাতে হবে, তা বোঝার সহজ মাপ হলো বিএমআই। ওজনকে (কেজি) উচ্চতার (মিটার) বর্গ দিয়ে ভাগ করলে বিএমআই পাওয়া যায়। এশীয়দের ক্ষেত্রে বিএমআই ২৩-এর বেশি হলে বাড়তি ওজন এবং ২৭.৫ বা তার বেশি হলে স্থূলতার ঝুঁকি ধরা হয়। এর সঙ্গে কোমরের মাপও দেখুন। দক্ষিণ এশীয় পুরুষের কোমর ৯০ সেন্টিমিটার এবং নারীর ৮০ সেন্টিমিটারের বেশি হলে পেটে চর্বি জমার ঝুঁকি বেশি বলে ধরা হয়।
বিজ্ঞাপন
এক সপ্তাহ ধরে যা খাচ্ছেন, তা খাতায় বা ফোনে লিখে রাখুন। অনেকেই দেখে অবাক হন যে চায়ের সঙ্গে বিস্কুট, বিকেলের ভাজাপোড়া আর রাতের বাড়তি এক প্লেট ভাতেই দিনের বড় একটা অংশ ক্যালরি চলে যাচ্ছে। কোথায় কমাতে হবে, এই তালিকাই তা দেখিয়ে দেবে।
খাবারে যে পরিবর্তনগুলো সবচেয়ে বেশি কাজ করে
বাংলাদেশি খাবারে ভাতই প্রধান, তাই ভাত পুরো বাদ দেওয়ার দরকার নেই, পরিমাণটা ঠিক করাই যথেষ্ট। প্লেটের অর্ধেক ভরুন শাকসবজি দিয়ে, এক-চতুর্থাংশে রাখুন ভাত বা রুটি, বাকি এক-চতুর্থাংশে মাছ, মুরগি, ডিম বা ডাল। এই সহজ ভাগেই একবেলার ক্যালরি অনেকটা কমে যায়, অথচ পেট ভরা থাকে।
১. চিনি কমান: চা-কফির চিনি, কোমল পানীয়, প্যাকেটের জুস আর মিষ্টিতে প্রচুর ক্যালরি থাকে, কিন্তু পেট ভরে না। চায়ে চিনি ধীরে ধীরে কমিয়ে আনুন, কোমল পানীয়র বদলে পানি বা লেবু-পানি খান।
বিজ্ঞাপন
২. ভাজাপোড়া সীমিত করুন: পুরি, সিঙ্গাড়া, চপ, পরোটা আর ডুবো তেলে ভাজা খাবারে তেলের ক্যালরি অনেক। রান্নায় তেলের পরিমাণও কমান; এক টেবিল চামচ তেলেই প্রায় ১২০ ক্যালরি থাকে।
৩. প্রতি বেলায় প্রোটিন রাখুন: ডিম, ডাল, মাছ, মুরগি, দই বা ছোলা খেলে দীর্ঘক্ষণ ক্ষুধা লাগে না। সকালের নাস্তায় একটি সেদ্ধ ডিম বা এক বাটি ডাল রাখলে দুপুরের আগে টুকটাক খাওয়ার প্রবণতা কমে।
৪. আঁশযুক্ত খাবার বাড়ান: শাক, লাউ, পেঁপে, ঢ্যাঁড়স, শসা, পেয়ারা, আপেল, লাল আটা আর ডালে আঁশ বেশি। এগুলো ধীরে হজম হয় বলে পেট ভরা অনুভূতি থাকে অনেকক্ষণ।
৫. পর্যাপ্ত পানি খান: অনেক সময় তৃষ্ণাকে ক্ষুধা ভেবে ভুল হয়। খাবারের আগে এক গ্লাস পানি খেলে কম খাওয়া সহজ হয়।
বিজ্ঞাপন
রাতের খাবার ঘুমানোর অন্তত দুই-তিন ঘণ্টা আগে সেরে ফেলুন। ধীরে ধীরে চিবিয়ে খান; টেলিভিশন বা মোবাইল দেখতে দেখতে খেলে অজান্তেই বেশি খাওয়া হয়ে যায়। ছোট প্লেটে খাওয়ার কৌশলটিও অনেককে সাহায্য করে, কারণ অল্প খাবারেই প্লেট ভরা দেখায়।
ব্যায়াম: কতটুকু, কীভাবে
ওজন কমানোয় খাবারের ভূমিকা বড়, তবে কমানো ওজন ধরে রাখতে আর পেশি রক্ষা করতে ব্যায়াম জরুরি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ অনুযায়ী প্রাপ্তবয়স্কদের সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শারীরিক পরিশ্রম করা উচিত, অর্থাৎ সপ্তাহে পাঁচ দিন ৩০ মিনিট করে জোরে হাঁটা। ওজন কমানোর জন্য এর চেয়ে বেশি সময় দিতে পারলে আরও ভালো।
যাঁরা একেবারে নতুন, তাঁরা ১০ থেকে ১৫ মিনিট হাঁটা দিয়ে শুরু করুন, তারপর প্রতি সপ্তাহে একটু করে বাড়ান। দ্রুত হাঁটা, সাইকেল চালানো, সাঁতার, সিঁড়ি ভাঙা বা দড়িলাফ, যা ভালো লাগে তা-ই করুন। সপ্তাহে দুই দিন পেশির ব্যায়াম যোগ করুন: স্কোয়াট, পুশআপ, প্ল্যাংক বা পানিভর্তি বোতল দিয়ে হাতের ব্যায়াম। পেশি বাড়লে বিশ্রামের সময়ও শরীর কিছুটা বেশি ক্যালরি খরচ করে।
বিজ্ঞাপন
দিনের বাকি সময়টাও গুরুত্বপূর্ণ। লিফটের বদলে সিঁড়ি, কাছের দোকানে হেঁটে যাওয়া, এক ঘণ্টা বসে থাকার পর কয়েক মিনিট হাঁটা, ফোনে কথা বলার সময় পায়চারি করা, এসব ছোট নড়াচড়া মিলে দিনে উল্লেখযোগ্য ক্যালরি খরচ হয়। হাঁটু বা হৃদ্রোগের সমস্যা থাকলে কোন ব্যায়াম নিরাপদ, তা চিকিৎসকের কাছ থেকে জেনে নিন।
ঘুম, মানসিক চাপ আর ঘরের পরিবেশ
রাতে সাত ঘণ্টার কম ঘুম হলে পরদিন ক্ষুধার হরমোনে গড়বড় হয়, মিষ্টি ও তেলে ভাজা খাবারের প্রতি টান বাড়ে। প্রাপ্তবয়স্কদের রাতে সাত থেকে নয় ঘণ্টা ঘুমানোর চেষ্টা করা উচিত। একইভাবে মানসিক চাপে অনেকে বেশি খান। চাপ কমাতে হাঁটা, নামাজ বা প্রার্থনা, শ্বাসের ব্যায়াম কিংবা প্রিয় কারও সঙ্গে কথা বলা কাজে দেয়।
ঘরে চিপস, বিস্কুট, মিষ্টি জমিয়ে রাখবেন না; হাতের কাছে থাকলে খাওয়া হবেই। তার বদলে ফল, শসা, গাজর, ভেজানো ছোলা বা অল্প বাদাম রাখুন। বাইরে খেতে গেলে ভাজা খাবারের বদলে গ্রিল বা ঝোলের তরকারি বেছে নিন, আর দাওয়াতে প্রথমে সালাদ ও সবজি দিয়ে প্লেট সাজান।
বিজ্ঞাপন
দ্রুত ওজন কমানোর উপায় খুঁজছেন? আগে ঝুঁকিটা জানুন
বিয়ে বা কোনো অনুষ্ঠানের আগে অনেকে দ্রুত ওজন কমানোর উপায় খোঁজেন। না খেয়ে থাকা, শুধু ফল বা শুধু স্যুপ খাওয়া, কিংবা বিজ্ঞাপনের ওজন কমানোর চা ও বড়ি খেয়ে অল্প সময়ে কয়েক কেজি কমানো সম্ভব হলেও তা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পানি আর পেশি। এতে দুর্বলতা, মাথা ঘোরা, চুল পড়া, পিত্তথলিতে পাথরের ঝুঁকি বাড়তে পারে, আর ডায়েট ছাড়ার পর ওজন ফিরে আসে আগের চেয়েও দ্রুত।
প্রাকৃতিক উপায়ে ওজন কমানো মানে কোনো ভেষজ জাদু নয়; মানে স্বাভাবিক খাবার পরিমিত পরিমাণে খাওয়া, শরীর সচল রাখা আর পর্যাপ্ত ঘুম। লেবু-মধু পানি, গ্রিন টি বা কালোজিরা স্বাস্থ্যকর পানীয় বা খাবার হতে পারে, কিন্তু এগুলো একা চর্বি পোড়ায় না। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওজন কমানোর কোনো ওষুধ বা সাপ্লিমেন্ট খাবেন না।
অগ্রগতি মাপুন, তবে রোজ নয়
বিজ্ঞাপন
প্রতিদিন ওজন মাপলে পানির ওঠানামায় সংখ্যা বাড়ে-কমে, এতে মন খারাপ হয়। সপ্তাহে একবার একই দিনে, সকালে খালি পেটে ওজন মাপুন। মাসে একবার কোমরের মাপ নিন। ওজন কয়েক সপ্তাহ একই জায়গায় আটকে থাকলে খাবারের খাতায় ফিরে যান, পরিমাণ আবার খেয়াল করুন বা হাঁটার সময় বাড়ান।
চেষ্টা ছাড়াই হঠাৎ ওজন কমতে থাকলে, অথবা নিয়ম মেনে চলার পরও ওজন একেবারে না কমলে চিকিৎসকের কাছে যান। থাইরয়েড, ডায়াবেটিস বা হরমোনের সমস্যা থাকলে আগে সেটির চিকিৎসা দরকার।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
ভাত খাওয়া পুরোপুরি বাদ দিলে কি ওজন দ্রুত কমে?
বিজ্ঞাপন
প্রথম দিকে কিছুটা কমতে পারে, তবে বেশির ভাগ মানুষ বেশি দিন এভাবে থাকতে পারেন না। ভাতের পরিমাণ কমিয়ে সবজি আর প্রোটিন বাড়ানোই দীর্ঘ মেয়াদে বেশি কার্যকর।
এক মাসে কত কেজি ওজন কমানো নিরাপদ?
সাধারণভাবে মাসে দুই থেকে চার কেজি নিরাপদ ধরা হয়। এর চেয়ে বেশি কমাতে চাইলে চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে থাকা ভালো।
শুধু হাঁটলেই কি ওজন কমবে?
বিজ্ঞাপন
হাঁটায় ক্যালরি খরচ হয় এবং স্বাস্থ্য ভালো থাকে, কিন্তু খাবারের পরিমাণ না কমালে ওজন কমে খুব ধীরে। হাঁটা আর খাদ্যাভ্যাস একসঙ্গে বদলালে তবেই ভালো ফল মেলে।
সকালের নাস্তা বাদ দিলে কি সুবিধা হয়?
কারও কারও ক্ষেত্রে হয়, তবে অনেকে নাস্তা বাদ দিয়ে দুপুরে অনেক বেশি খেয়ে ফেলেন। ডায়াবেটিস থাকলে কোনো বেলা বাদ দেওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।