রাতে ঘুম না আসলে করণীয়: দ্রুত ঘুমিয়ে পড়ার সহজ কিছু অভ্যাস
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ:
রাত দুটো বাজে। চোখ বন্ধ, কিন্তু মাথার ভেতর দিনের কাজ, কালকের চিন্তা, পুরোনো কোনো কথা ঘুরছে। মোবাইলে সময় দেখলেন, আরও অস্থির লাগল, কারণ সকালে উঠতে হবে। এই চক্র প্রায় সবার জীবনেই মাঝেমধ্যে আসে। কয়েক রাত এমন হলে ভয়ের কিছু নেই, তবে নিয়মিত হলে তা দিনের কাজ, মেজাজ আর স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলে।
বিজ্ঞাপন
রাতে ঘুম না আসলে করণীয় দুই ভাগে ভাবা যায়: আজ রাতে বিছানায় শুয়ে কী করবেন, আর দিনের বেলা কোন অভ্যাস বদলালে ঘুম নিজে থেকে আসবে। প্রথমটি তাৎক্ষণিক স্বস্তি দেয়, দ্বিতীয়টি সমস্যার মূলে কাজ করে। প্রাপ্তবয়স্কদের রাতে সাধারণত সাত থেকে নয় ঘণ্টা ঘুম দরকার।
এখনই ঘুম না এলে যা করবেন
১. ঘড়ি দেখা বন্ধ করুন: বারবার সময় দেখলে মস্তিষ্ক হিসাব কষতে থাকে, কত ঘণ্টা বাকি। এতে উদ্বেগ বাড়ে। মোবাইল উল্টে রাখুন বা হাতের নাগালের বাইরে রাখুন।
২. ধীর শ্বাসের ব্যায়াম: নাক দিয়ে চার গোনা পর্যন্ত শ্বাস নিন, সাত গোনা পর্যন্ত ধরে রাখুন, তারপর মুখ দিয়ে আট গোনা পর্যন্ত ধীরে ছাড়ুন। এভাবে চার-পাঁচবার করুন। শ্বাস ধরে রাখতে অস্বস্তি হলে শুধু শ্বাস ছাড়ার সময়টা নেওয়ার চেয়ে লম্বা করুন; এতেই শরীর শান্ত হতে শুরু করে।
বিজ্ঞাপন
৩. পেশি ঢিলে করা: পায়ের আঙুল থেকে শুরু করে প্রতিটি পেশি পাঁচ সেকেন্ড শক্ত করে ধরে রেখে ছেড়ে দিন, তারপর পায়ের গোড়ালি, হাঁটু, ঊরু, পেট, হাত, কাঁধ, মুখ। শরীর ঢিলে হলে মনও শান্ত হয়।
৪. মনকে একঘেয়ে কাজ দিন: ধীরে উল্টো দিকে গোনা, পরিচিত কোনো পথে মনে মনে হাঁটা, কিংবা দোয়া বা প্রিয় কোনো শান্ত বাক্য মনে মনে বারবার পড়া দুশ্চিন্তার স্রোত থামাতে সাহায্য করে।
৫. ২০ মিনিটের নিয়ম: মোটামুটি ২০ মিনিট পরও ঘুম না এলে বিছানা ছেড়ে উঠে অন্য ঘরে বা আবছা আলোয় বসুন। কাগজের বই পড়ুন, হালকা কিছু করুন, মোবাইল নয়। ঘুম ঘুম লাগলে আবার বিছানায় যান। এতে মস্তিষ্ক বিছানাকে জেগে থাকার জায়গা হিসেবে চিনতে শেখে না।
টেনশনে ঘুম না আসলে করণীয়
বিজ্ঞাপন
দুশ্চিন্তা অনিদ্রার সবচেয়ে বড় কারণগুলোর একটি। শোবার এক-দুই ঘণ্টা আগে একটি খাতায় লিখে ফেলুন কী নিয়ে চিন্তা হচ্ছে এবং কাল এর জন্য কোন একটি ছোট কাজ করবেন। কাজের তালিকা কাগজে নামলে মাথা থেকে বোঝা কিছুটা নামে।
দিনের বেলায় দুশ্চিন্তার জন্য ১৫ মিনিট নির্দিষ্ট সময় রাখার কৌশলও কাজে দেয়। রাতে কোনো চিন্তা এলে নিজেকে মনে করিয়ে দিন, এটা কালকের নির্ধারিত সময়ে ভাবব। শোয়ার আগে ঝগড়া, অফিসের ই-মেইল বা উত্তেজনাপূর্ণ খবর এড়িয়ে চলুন। ঘুমের আগে অজু করে নামাজ বা প্রার্থনা, হালকা গরম পানিতে গোসল কিংবা শান্ত কোনো আলাপ অনেককে স্থির হতে সাহায্য করে।
যদি দুশ্চিন্তা বা মন খারাপ সারা দিন জুড়ে থাকে, কাজে মন বসে না, দুই সপ্তাহের বেশি এমন চলে, তাহলে এটি বিষণ্নতা বা উদ্বেগজনিত সমস্যার লক্ষণ হতে পারে। তখন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা কাউন্সেলরের সাহায্য নেওয়া জরুরি; এতে লজ্জার কিছু নেই।
দ্রুত ঘুমানোর উপায়: দিনের অভ্যাস
বিজ্ঞাপন
রাতের ঘুম আসলে তৈরি হয় দিনের বেলায়।
১. প্রতিদিন একই সময়ে উঠুন: ছুটির দিনেও। রাতে দেরিতে ঘুমালেও সকালে নির্দিষ্ট সময়ে উঠলে কয়েক দিনের মধ্যে রাতে সময়মতো ঘুম আসতে শুরু করে।
২. সকালের আলো নিন: ঘুম থেকে উঠে ১৫-৩০ মিনিট বাইরের আলোয় থাকুন, বারান্দা বা ছাদে হলেও। এটি শরীরের ঘড়ি ঠিক রাখে।
৩. চা-কফির সময়: ক্যাফেইনের প্রভাব কয়েক ঘণ্টা থাকে। বিকেল তিনটার পর চা, কফি, কোমল পানীয় এড়িয়ে চলুন। ধূমপানের নিকোটিনও ঘুম নষ্ট করে।
বিজ্ঞাপন
৪. দিনের ঘুম ছোট রাখুন: দুপুরে ঘুমাতে চাইলে ২০-৩০ মিনিট, আর বিকেল তিনটার আগে। লম্বা দিবানিদ্রা রাতের ঘুম কেড়ে নেয়।
৫. ব্যায়াম করুন, তবে রাতে নয়: দিনে ৩০ মিনিট হাঁটা বা ব্যায়াম গভীর ঘুমে সাহায্য করে। শোবার দুই-তিন ঘণ্টা আগে ভারী ব্যায়াম না করাই ভালো।
৬. রাতের খাবার: ঘুমানোর অন্তত দুই-তিন ঘণ্টা আগে খান, খুব ভারী বা ঝাল নয়। একেবারে খালি পেটেও ঘুম আসতে চায় না; দরকার হলে হালকা কিছু, যেমন এক গ্লাস গরম দুধ বা একটি কলা।
শোবার ঘর আর শেষ এক ঘণ্টা
বিজ্ঞাপন
ঘর অন্ধকার, শান্ত আর আরামদায়ক ঠান্ডা রাখুন। বাইরের আলো এলে মোটা পর্দা, শব্দ হলে ইয়ারপ্লাগ ব্যবহার করা যায়। বিছানা শুধু ঘুমের জন্য রাখার চেষ্টা করুন; বিছানায় বসে অফিসের কাজ, পড়াশোনা বা দীর্ঘ সময় মোবাইল দেখা কমান।
শোবার এক ঘণ্টা আগে থেকে আলো কমিয়ে দিন। মোবাইল, ল্যাপটপ ও টেলিভিশনের আলো আর অন্তহীন ভিডিও মস্তিষ্ককে জাগিয়ে রাখে। এই সময়টায় প্রতিদিন একই রকম কিছু কাজ করুন: হাত-মুখ ধোয়া, দাঁত ব্রাশ, পরদিনের জামা গুছিয়ে রাখা, কয়েক পাতা বই পড়া। এই রুটিন শরীরকে সংকেত দেয় যে ঘুমের সময় হয়েছে।
গরমের রাতে ঘরে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা রাখুন, মশারি টানিয়ে নিন; মশার কামড় আর ঘামও ঘুম ভাঙায়। বালিশ খুব উঁচু বা খুব নিচু হলে ঘাড়ব্যথায় ঘুম বারবার ভেঙে যায়, তাই আরামদায়ক বালিশ বেছে নিন। পাশের মানুষের নাক ডাকা বা আলো জ্বালিয়ে রাখার অভ্যাস থাকলে খোলাখুলি কথা বলে সমাধান খুঁজুন। যাঁরা রাতের শিফটে কাজ করেন, তাঁরা দিনে ঘুমানোর সময় ঘর পুরো অন্ধকার করে নিন এবং কাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে সানগ্লাস পরলে সকালের আলো ঘুমের সংকেতে কম বাধা দেয়।
ঘুমের ওষুধ আর কখন চিকিৎসক
বিজ্ঞাপন
ফার্মেসি থেকে নিজে নিজে ঘুমের ওষুধ কিনে খাওয়া বিপজ্জনক। এগুলোতে অভ্যাস তৈরি হতে পারে, পরদিন ঝিমুনি, পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি, স্মৃতিতে সমস্যা হতে পারে, আর বয়স্কদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি। প্রয়োজন হলে চিকিৎসক কারণ দেখে স্বল্প সময়ের জন্য ওষুধ দিতে পারেন।
সপ্তাহে অন্তত তিন রাত, তিন মাসের বেশি সময় ধরে ঘুমের সমস্যা চললে চিকিৎসকের কাছে যান। জোরে নাক ডাকা, ঘুমের মধ্যে দম আটকে যাওয়া বা হাঁপিয়ে জেগে ওঠা আর দিনে প্রচণ্ড ঘুম পাওয়া স্লিপ অ্যাপনিয়ার লক্ষণ হতে পারে। রাতে পায়ে অস্বস্তি ও নাড়ানোর তাগিদ, ঘন ঘন প্রস্রাব, ব্যথা, শ্বাসকষ্ট বা বুকজ্বালার কারণে ঘুম ভাঙলে সেই সমস্যার চিকিৎসা দরকার। অনিদ্রার জন্য কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি নামের একটি কার্যকর মনস্তাত্ত্বিক চিকিৎসাও আছে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
রাতে কতক্ষণ ঘুমানো দরকার?
বিজ্ঞাপন
প্রাপ্তবয়স্কদের সাধারণত সাত থেকে নয় ঘণ্টা, কিশোরদের আট থেকে দশ ঘণ্টা। কেউ কেউ একটু কমেও সতেজ থাকেন; দিনে ক্লান্ত না লাগলে সেটাই যথেষ্ট।
গরম দুধ খেলে কি ঘুম আসে?
এর সরাসরি প্রভাব নিয়ে প্রমাণ সীমিত, তবে শোবার আগে উষ্ণ পানীয় খাওয়ার অভ্যাস একটি আরামদায়ক রুটিন তৈরি করে, যা ঘুমে সাহায্য করে।
সারা রাত না ঘুমালে দিনে ঘুমিয়ে পুষিয়ে নেওয়া যায়?
বিজ্ঞাপন
অল্প সময় বিশ্রাম নিতে পারেন, কিন্তু দীর্ঘ দিবানিদ্রা পরের রাতের ঘুম নষ্ট করে। বরং নির্দিষ্ট সময়ে উঠে রাতে একটু আগে শুয়ে পড়ুন।
মোবাইলের নাইট মোড কি যথেষ্ট?
নাইট মোড আলোর রং কিছুটা বদলায়, কিন্তু ভিডিও বা সামাজিক মাধ্যমের উত্তেজনা থেকেই যায়। শোবার আগে মোবাইল দূরে রাখাই ভালো সমাধান।
মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেলে কী করব?
বিজ্ঞাপন
ঘড়ি না দেখে চোখ বন্ধ রেখে ধীর শ্বাসের ব্যায়াম করুন। ২০ মিনিটেও ঘুম না এলে বিছানা ছেড়ে আবছা আলোয় শান্ত কিছু করুন, মোবাইল নয়। প্রস্রাবের জন্য বারবার ঘুম ভাঙলে সন্ধ্যার পর পানি পান কিছুটা কমান; সমস্যা চলতে থাকলে চিকিৎসক দেখান।