চার বছর আগে চীনের একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকে বৈশ্বিক বাণিজ্যে সম্ভাব্য ‘অস্ত্র’ হিসেবে সতর্ক করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। আন্তর্জাতিক পণ্য পরিবহনের তথ্য সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনার জন্য তৈরি ‘লজিস্টিকস ডেটা এক্সচেঞ্জ’ বা লগইঙ্ক নামের এই প্ল্যাটফর্মটি এখন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কার্যত পিছিয়ে পড়েছে।
রয়টার্সের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্ল্যাটফর্মটির আন্তর্জাতিক অংশীদারত্বের উদ্যোগগুলো থমকে গেছে। এটি একটি আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংগঠন থেকেও সরে গেছে। একই সঙ্গে চীনের ভেতরে বকেয়া বিল পরিশোধ না করাকে কেন্দ্র করে আইনি জটিলতায় জড়িয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
সেপ্টেম্বরে রয়টার্সের এক সাংবাদিক চীনের উপকূলীয় শহর ওয়েনঝৌতে লগইঙ্কের কার্যক্রমের কেন্দ্রে গিয়ে দেখেন, অফিসটি প্রায় পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। অফিসে আলো জ্বলছিল না। অভ্যর্থনা ডেস্কও ফাঁকা ছিল। কম্পিউটারের তার ও অন্যান্য সরঞ্জামও খুলে নেওয়া হয়েছে। লগইঙ্কের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।
চীনের পরিবহন মন্ত্রণালয়ও এ বিষয়ে রয়টার্সের প্রশ্নের জবাব দেয়নি। তবে গত জুনে মন্ত্রণালয় একটি নীতিপত্র প্রকাশ করে। সেখানে লগইঙ্ককে আরও বেশি অভ্যন্তরীণ তথ্যের সঙ্গে যুক্ত করার কথা বলা হয়।
লগইঙ্ক কীভাবে কাজ করত
লগইঙ্ক এমন একটি ডিজিটাল ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে শুল্ক কর্তৃপক্ষ, বন্দর এবং পরিবহনসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের লজিস্টিকস তথ্য আদান-প্রদান করা যায়। এর মাধ্যমে কাগজভিত্তিক প্রক্রিয়ার পরিবর্তে ডিজিটাল পদ্ধতিতে আন্তর্জাতিক পণ্য পরিবহন ব্যবস্থাপনা সহজ করার লক্ষ্য ছিল।
চার বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা সতর্ক করেছিলেন, চীন এই প্ল্যাটফর্মকে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দিতে পারলে আন্তর্জাতিক পণ্য পরিবহনের ওপর ব্যাপক তথ্যগত নিয়ন্ত্রণ তৈরি করতে পারে।
বিশ্বের মোট বাণিজ্যের প্রায় ৮০ শতাংশ সমুদ্রপথে পরিবহন করা হয়। তাই বৈশ্বিক জাহাজ চলাচল ও পণ্য পরিবহনের তথ্য নিয়ন্ত্রণে রাখা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে যুক্তরাষ্ট্র।
মার্কিন কর্মকর্তা ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা ছিল, লগইঙ্কের মাধ্যমে চীন পণ্য, পরিবহনের পরিমাণ ও দামের মতো বাণিজ্যিক তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। এসব তথ্য চীনা কোম্পানিগুলোকে পশ্চিমা প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় সুবিধা দিতে পারে বলেও তারা মনে করতেন।
এ ছাড়া ইউক্রেন ও তাইওয়ানে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র সরবরাহসহ সামরিক পণ্য পরিবহনের তথ্যও এই ব্যবস্থার মাধ্যমে নজরদারি করা সম্ভব হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন কেউ কেউ। তবে লগইঙ্ক ঠিক কী ধরনের এবং কত পরিমাণ তথ্য সংগ্রহ করত, তা প্রকাশ্যে বিস্তারিত জানায়নি।
২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তরে দেওয়া এক বক্তব্যে লগইঙ্কের কর্মকর্তা লি ঝাও দাবি করেন, সংবেদনশীল বাণিজ্যিক তথ্য সংগ্রহ বা বিশ্বজুড়ে পণ্য পরিবহন নিয়মিতভাবে নজরদারি করার সক্ষমতা প্রতিষ্ঠানটির নেই।
যুক্তরাষ্ট্রের চাপ
রয়টার্স জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে লগইঙ্কের কার্যক্রম পিছিয়ে পড়ার সময়টি যুক্তরাষ্ট্রের চাপ প্রয়োগের সময়ের সঙ্গে মিলে যায়। যুক্তরাষ্ট্র যেসব দেশ ও আন্তর্জাতিক সংগঠন লগইঙ্কের সঙ্গে সহযোগিতার উদ্যোগ নিয়েছিল, তাদের এ বিষয়ে সতর্ক করেছিল।
২০২২ সালে লগইঙ্ক নিয়ে মার্কিন কংগ্রেসের একটি কমিশনের প্রতিবেদনে সতর্কতা প্রকাশ করা হয়। কমিশনের চেয়ারম্যান র্যান্ডাল শ্রাইভার বলেন, লগইঙ্ক ব্যবহারকারীদের প্রকাশ্যে চিহ্নিত করে চাপ সৃষ্টি করার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র এর আন্তর্জাতিক বিস্তার ঠেকাতে ভূমিকা রেখেছে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক মুখপাত্র বলেন, বেইজিংয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন কোনো প্ল্যাটফর্মকে বৈশ্বিক সামুদ্রিক তথ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সুযোগ দেওয়া হবে না। যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি প্রতিষ্ঠান ও গুরুত্বপূর্ণ বন্দর অবকাঠামোয় লগইঙ্কের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
তবে লগইঙ্কের আন্তর্জাতিক কার্যক্রম কেন হঠাৎ থমকে গেল এবং প্রতিষ্ঠানটি কীভাবে আর্থিক ও আইনি সংকটে পড়ল, তার সুনির্দিষ্ট কারণ রয়টার্স নিশ্চিত করতে পারেনি।
লগইঙ্কের আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পিছিয়ে পড়াকে বৈশ্বিক জাহাজ চলাচল ও বাণিজ্য অবকাঠামোর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিযোগিতায় বেইজিংয়ের জন্য একটি বড় ধাক্কা হিসেবে দেখছে সংশ্লিষ্টরা।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স








মন্তব্য