রোমের অলিম্পিক স্টেডিয়ামে তখন জয়ের আগাম উৎসব। স্কোরবোর্ডে ৩-১। ম্যাচের ৮২ মিনিট পেরিয়ে গেছে। রিয়াল মাদ্রিদকে হারাতে যাচ্ছে রোমা; এমন বিশ্বাসে গ্যালারিতে হাসি সমর্থকদের মুখে। কিন্তু ম্যাচের গল্প যে তখনো শেষ হয়নি!
চ্যাম্পিয়নস লিগে রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে শেষ বাঁশির আগে জয় নিশ্চিত ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই, এই সত্য অনেক দলই টের পেয়েছে। এবার সেই অভিজ্ঞতা হলো রোমার। কেন চ্যাম্পিয়নস লিগকে রিয়ালের টুর্নামেন্ট বলা হয়, সেটি যেন আরেকবার দেখল ফুটবলবিশ্ব।
৮৩ থেকে ৯০ মিনিট মাত্র সাত মিনিটের ব্যবধানে তিন গোল করে রোমার সাজানো উৎসব ভণ্ডুল করে দেয় রিয়াল। কার্লোস এসপি, এনদ্রিক ও আন্তোনিও রুডিগারের গোলে ৪-৩ ব্যবধানের অবিশ্বাস্য জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে হোসে মরিনিওর দল। চ্যাম্পিয়নস লিগের ইতিহাসে যোগ হয় আরেকটি নাটকীয় প্রত্যাবর্তনের গল্প।
মরিনিওর জন্য রাতটি ছিল বিশেষ। ২০২১-২২ মৌসুমে এই রোমাকেই তিনি জিতিয়েছিলেন কনফারেন্স লিগ। পরের মৌসুমে দলটিকে নিয়ে গিয়েছিলেন ইউরোপা লিগের ফাইনালে। সেই কৃতজ্ঞতা থেকেই গ্যালারিতে প্রিয় কোচের নামে ব্যানার টাঙিয়েছিলেন সমর্থকেরা।
ম্যাচের শুরুটা অবশ্য ভালো ছিল রোমারই। ২০ মিনিটে মাতিয়াস সুলের পাস থেকে প্রায় ২০ গজ দূর থেকে শটে দলকে এগিয়ে দেন মার্তেন দে রুন। তবে পাঁচ মিনিটের বেশি পিছিয়ে থাকতে হয়নি রিয়ালকে। চ্যাম্পিয়নস লিগে নিজের শততম ম্যাচ খেলতে নামা কিলিয়ান এমবাপের শট রোমার জিয়ানলুকা মানচিনির পায়ে লেগে দিক বদলায়। গোলরক্ষক পিয়েরলুইজি গোল্লিনিকে পরাস্ত করে বল জালে জড়ায়।
দ্বিতীয়ার্ধে ছয় মিনিটের ব্যবধানে দোনিয়েল মালেনের জোড়া গোলে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ প্রায় পুরোপুরি নিজেদের হাতে নিয়ে নেয় রোমা। ২০২৫ সালে অ্যাস্টন ভিলায় খেলা এই ডাচ স্ট্রাইকারের প্রথম গোলের পেছনে ছিল ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের ভুল। ফ্লিক করতে গিয়ে বলের নিয়ন্ত্রণ হারান তিনি। মালেনের শট রিয়াল অধিনায়ক ফেদেরিকো ভালভের্দের গায়ে লেগে জালে ঢুকে যায়।
এরপর ঠান্ডা মাথায় নিজের দ্বিতীয় গোলটি করেন মালেন। প্রথমে অফসাইডের পতাকা উঠলেও ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর) পর্যালোচনায় দেখা যায়, ভালভের্দের অবস্থানের কারণে তিনি অনসাইডে ছিলেন।
তখন মনে হচ্ছিল, রোমার জয় ঠেকানো রিয়ালের পক্ষে অসম্ভব।
ম্যাচের শেষ দিকে রক্ষণ শক্তিশালী করতে একের পর এক পরিবর্তন আনেন গাসপেরিনি। ৩-১ ব্যবধানে এগিয়ে থাকা দলের জন্য সিদ্ধান্তটি অস্বাভাবিক ছিল না। হাতে সময় কম, প্রতিপক্ষের আক্রমণ সামলাতে পারলেই জয় নিশ্চিত। কিন্তু রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে রক্ষণে নেমে যাওয়ার ঝুঁকি কতটা বড়, তা আবারও বুঝল রোমা।
মরিনিওর বদলিগুলো যেন জাদুর মতো কাজ করল। আরদা গুলের মাঠে নামার পর রিয়ালের কর্নারগুলোই হয়ে উঠল রোমার দুঃস্বপ্ন।
৮৩ মিনিটে এনদ্রিকের হেড ফিরিয়ে দেন গোলরক্ষক গোলিনি। ফিরতি বলে গোল করে ব্যবধান কমান এসপি। পাঁচ মিনিট আগে মাঠে নামা এই বদলি ফরোয়ার্ডের গোলেই ম্যাচে ফেরার বিশ্বাস ফিরে পায় রিয়াল।
এরপর গোল করেন এনদ্রিক। গুলেরের কর্নার থেকে হেডে বল জালে পাঠিয়ে স্কোরলাইন ৩-৩ করেন ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ড। কয়েক মিনিট আগেও যে ম্যাচ রোমার হাতের মুঠোয় ছিল, সেটিই এখন হাতছাড়া হওয়ার পথে—গ্যালারিতে বসে সমর্থকদের নিশ্চয়ই তা বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল।
কিন্তু সমতা ফিরিয়েই থামেনি রিয়াল। ৯০ মিনিটে গুলেরের আরেকটি সেট পিস থেকে কাছ থেকে ভলিতে বল জালে পাঠান রুডিগার। তাতেই পূর্ণ হয় রিয়ালের অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন।
৩-১ থেকে ৪-৩। মাত্র সাত মিনিটে তিন গোল। যে ম্যাচে রোমা সমর্থকেরা জয় উদ্যাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, শেষ পর্যন্ত সেই ম্যাচেই জয়োল্লাস রিয়ালের।
অলিম্পিক স্টেডিয়ামে ব্যানার টাঙানো হয়েছিল প্রিয় কোচের জন্য। কিন্তু রাত শেষে সেই প্রিয় মানুষই যেন কেড়ে নিলেন রোমার সব আনন্দ।








মন্তব্য