প্রবীণ অভিনেতা নানা পাটেকরের মৃত্যু নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া একটি মন্তব্যের জেরে অভিনেত্রী তনুশ্রী দত্তের সমালোচনা করেছে অল ইন্ডিয়ান সিনে ওয়ার্কার্স অ্যাসোসিয়েশন (এআইসিডব্লিউএ)। সংগঠনটির অভিযোগ, শোকের এই সময়ে তনুশ্রীর মন্তব্য ছিল সংবেদনহীন। এ নিয়ে তাকে তিরস্কার করে বলা হয়েছে, কথা বলার সময় তার আরও সতর্ক থাকা উচিত ছিল।
বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে নানা পাটেকরের মৃত্যুসংবাদ প্রসঙ্গে ইভিল ডেড শব্দবন্ধ ব্যবহার করেন তনুশ্রী। তার এই মন্তব্যের পরই শুরু হয় সমালোচনা। চলচ্চিত্রকর্মীদের সংগঠনটির অভিযোগ, প্রবীণ অভিনেতার মৃত্যুর পর শোক প্রকাশের পরিবর্তে নিজের মন্তব্যের মাধ্যমে সস্তা প্রচারের চেষ্টা করেছেন এই অভিনেত্রী।
বৃহস্পতিবার ভোরে গোয়ায় নিজের বাসভবনে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান নানা পাটেকর। চিকিৎসকরা প্রায় ৪৫ মিনিট ধরে তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করেন। তবে শেষ পর্যন্ত তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। ভোর ৫টা ১০ মিনিটের দিকে তার মৃত্যুর ঘোষণা দেওয়া হয়। এই ঘটনায় একটি মেডিকো লিগ্যাল মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার ১৯৪ ধারায় অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলা করেছে গোয়া পুলিশ।
এআইসিডব্লিউএর প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি সুরেশ শ্যামলাল গুপ্ত এক বিবৃতিতে তনুশ্রীর মন্তব্যের নিন্দা জানান। বিবৃতিতে বলা হয়, কিংবদন্তি অভিনেতা নানা পাটেকরের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে তনুশ্রীর ইভিল ডেড মন্তব্যের তীব্র নিন্দা জানাচ্ছে সংগঠনটি।
নানা পাটেকরের অভিনয়জীবনের পাশাপাশি সমাজসেবামূলক কাজের কথাও স্মরণ করেছে সংগঠনটি। কৃষক পরিবারের সহায়তায় নাম ফাউন্ডেশনের উদ্যোগ এবং পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয় সেখানে। কার্গিল যুদ্ধের সময় দেশের জন্য তার অবদানের কথাও তুলে ধরে এআইসিডব্লিউএ।
তনুশ্রীর বক্তব্যের সময় ও ধরন নিয়ে প্রশ্ন তুলে সংগঠনটি বলেছে, একজন মানুষের মৃত্যুর পর তাকে নিয়ে এমন শব্দ ব্যবহার করা মৌলিক মানবিকতার পরিপন্থি। শোকের সময়ে কী বলা উচিত, আর কখন নীরব থাকা প্রয়োজন, সে বিষয়ে সচেতন থাকার আহ্বান জানানো হয়।
এআইসিডব্লিউএর পোস্টের ক্যাপশনে বলা হয়, মৃত্যুর পর কোনো ব্যক্তির জন্য এমন শব্দ ব্যবহার করা মৌলিক মানবিকতার বিরোধী। চলচ্চিত্রজগতে এর আগে কারও মৃত্যুর পর কেউ এমন মন্তব্য করেননি। আপনিই প্রথম। আমরা প্রার্থনা করি, আপনিই যেন শেষ ব্যক্তি হন। এমন পরিস্থিতিতে কী বলতে হয় এবং কখন চুপ থাকতে হয়, তা এই শিল্পের মানুষ জানেন। আপনার জিহ্বার ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখা উচিত ছিল।
তনুশ্রীর ভিডিওতে নিজের পেশাগত কর্মসূচির কথা বলার বিষয়টিও ভালোভাবে নেয়নি সংগঠনটি। ভিডিওতে অভিনেত্রী জানান, নানা পাটেকরের মৃত্যুর খবর তিনি শুনেছেন। তবে আপাতত লক্ষ্ণৌয়ের একটি অনুষ্ঠানে মনোযোগ দিতে চান তিনি।
এআইসিডব্লিউএর বিবৃতিতে বলা হয়, তনুশ্রী জানিয়েছেন, ওই দিন তার কাজ রয়েছে এবং একটি বড় অনুষ্ঠানে যোগ দিতে তিনি লক্ষ্ণৌ যাচ্ছেন। তার পুরো দিনের পরিকল্পনাও করা আছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
সংগঠনটির বক্তব্য, দেশের মানুষ যখন একজন প্রবীণ ও গুণী অভিনেতার মৃত্যুতে শোকাহত, তখন নিজের অনুষ্ঠান ও ব্যক্তিগত পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলা সংকীর্ণ মানসিকতার পরিচয় দেয়। লক্ষ্ণৌ কিংবা লন্ডন, যেখানেই তার অনুষ্ঠান হোক না কেন, সেটি নিয়ে অন্যদের আগ্রহ নেই বলেও মন্তব্য করে সংগঠনটি।
ইনস্টাগ্রামে প্রকাশিত ভিডিওতে তনুশ্রী বলেন, নানা পাটেকরের মৃত্যুর খবর তিনি পেয়েছেন। তবে কী ধরনের প্রতিক্রিয়া জানানো উচিত, তা ভেবে নিয়ে পরে এ বিষয়ে কথা বলবেন তিনি।
ভিডিওতে তাকে বলতে শোনা যায়, আমি কী ধরনের প্রতিক্রিয়া জানাব, তা ঠিক করার পর আমার বক্তব্য দেব। অবশ্যই তার পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছি, কিন্তু…। এরপর ভিডিওটি মাঝবাক্যে শেষ হয়ে যায়। একই ভিডিওতে তিনি ইঙ্গিত দেন, সন্ধ্যার মধ্যে সংবাদমাধ্যমের মনোযোগ ইভিল ডেডের দিকে চলে যেতে পারে। তার শব্দচয়ন ও মন্তব্যের সময় নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা শুরু হয়। পরে এআইসিডব্লিউএও এ নিয়ে বিবৃতি দেয়।
নানা পাটেকর ও তনুশ্রী দত্তের বিরোধের সূত্রপাত ২০১৮ সালে। ওই বছর ২০০৮ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত হর্ন ওকে প্লিজ ছবির শুটিংয়ের সময় নানা পাটেকরের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ তোলেন তনুশ্রী। তার অভিযোগ ভারতের মিটু আন্দোলনের সময় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয় এবং চলচ্চিত্রশিল্পে যৌন হয়রানির বিষয়টি নতুন করে সামনে আসে।
তনুশ্রীর দাবি, ২০০৮ সালে তিনি নানা পাটেকরের বিরুদ্ধে সিনে অ্যান্ড টিভি আর্টিস্টস অ্যাসোসিয়েশনে অভিযোগ করেছিলেন। তবে সে সময় কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি। পরে নানা পাটেকরের বিরুদ্ধে এফআইআর নথিভুক্ত হয়। অভিনেতা অবশ্য অভিযোগ অস্বীকার করেন।
২০১৯ সালে পর্যাপ্ত প্রমাণের অভাবে মামলাটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর ২০২৫ সালে মুম্বাইয়ের আন্ধেরির ম্যাজিস্ট্রেট আদালত অভিযোগ দায়েরের ক্ষেত্রে আইন নির্ধারিত সময়সীমা অতিক্রান্ত হওয়ায় নানা পাটেকরের বিরুদ্ধে ফৌজদারি কার্যক্রম খারিজ করেন।
সূত্র: হিন্দুস্তান টাইমস








মন্তব্য