ঊনবিংশ শতাব্দীতে বাংলায় যে বাউল আন্দোলনের প্রসার ঘটেছিল, তার অন্যতম প্রধান পুরুষ ছিলেন লালন সাঁই। তিনি কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা পাননি, কিন্তু তার গানে যে দর্শনের উন্মেষ ঘটেছিল, তা গভীর চিন্তার খোরাক জোগায়। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লালনের গান দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন এবং বিশ্বভারতী তথা শান্তিনিকেতনে তার গান প্রচারের ব্যবস্থা করেছিলেন। আজ ১৭ অক্টোবর (শনিবার) বাউল সম্রাট ফকির লালন সাঁইয়ের ১৩৬তম তিরোধান দিবস।
ফকির লালন সাঁই কেবল একজন সাধক বা সুরকার নন, তিনি ছিলেন মানবতাবাদী দর্শনের এক অনন্য প্রতীক। জাতপাত, ধর্ম, বর্ণ বা গোত্রের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষকে সবচেয়ে বড় করে দেখেছেন তিনি। তার গানে মানবতার যে জয়গান গাওয়া হয়েছে, তা আজও বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে কিংবা খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায় এই ধরনের গানগুলোতে লুকিয়ে আছে গভীর জীবনদর্শন ও আত্মোপলব্ধির বাণী।
শিলাইদহের পদ্মাতীর আর কুষ্টিয়ার গ্রামীণ জনপদ একসময় বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মনকে গভীরভাবে আলোড়িত করেছিল। জমিদারি দেখাশোনার সুবাদে তিনি যখন কুষ্টিয়ার শিলাইদহে আসেন, তখন তার পরিচয় ঘটে বাংলার বাউল সংস্কৃতির সঙ্গে। বিশেষ করে বাউল সম্রাট ফকির লালন সাঁইয়ের গানে তিনি শুধু মুগ্ধই হননি, বরং নিজের জীবনদর্শন ও সাহিত্যকর্মেও সেই সুরের প্রভাব ফুটিয়ে তুলেছিলেন।
রবীন্দ্রনাথ প্রথম লালনের গানের সঙ্গে পরিচিত হন শিলাইদহে অবস্থানকালে। বাউলদের মারফতি ও দেহতাত্ত্বিক গান তাকে ভীষণভাবে আকর্ষণ করে। বাউল সাধনার মূল সুর ছিল মানুষের মাঝে ঈশ্বরকে খুঁজে পাওয়া, যা রবীন্দ্রনাথের মানবতাবাদী চেতনার সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যায়। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকলেও লালন তার গানে জীবনের যে গভীর সত্য তুলে ধরেছেন, তা অতুলনীয়।
রবীন্দ্রনাথের উদ্যোগে প্রথম বাউল গান সংকলিত ও প্রকাশিত হয়। ১৯১৫ সালের (১৩২২ বঙ্গাব্দ) পৌষ ও মাঘ মাসে ‘প্রবাসী’ মাসিক পত্রিকায় ‘বাউল গান’ শিরোনামে লালনের কিছু গান প্রকাশ করেন তিনি। গবেষকদের মতে, লালনের গান সংরক্ষণে রবীন্দ্রনাথের এই উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। তিনি শান্তিনিকেতনেও বাউল গান প্রচারের ব্যবস্থা করেন এবং বাউলদের তার সাহিত্য ও বক্তৃতায় শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করতেন।
লালনের গানের মূল আকর্ষণ ছিল ‘মনের মানুষ’। মানুষই শ্রেষ্ঠ জীব এবং মানুষের মাঝেই পরম সত্তার বাস, এই ভাবনা রবীন্দ্রনাথের মনে গভীর রেখাপাত করেছিল। তার বহু গানে এবং দর্শনে বাউল চেতনার প্রভাব স্পষ্টভাবে লক্ষ করা যায়। “আমার প্রাণের মানুষ আছে প্রাণে” কিংবা এই ধরনের অনেক রচনার পেছনের ভাবনায় লালনের আধ্যাত্মিক চিন্তার পরশ রয়েছে বলে মনে করেন গবেষকরা।
তথ্যসূত্র:
গবেষক আবুল আহসান চৌধুরী রচিত ‘রবীন্দ্রনাথ ও লালন’ গ্রন্থ
বিশিষ্ট গবেষক উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য রচিত ‘বাংলার বাউল ও বাউল গান’
১৯১৫ সালে প্রকাশিত ‘প্রবাসী’ পত্রিকার সংখ্যাসমূহ, যেখানে রবীন্দ্রনাথের ভূমিকা ও লালনের গান প্রথম সংকলিত আকারে প্রকাশিত হয়








মন্তব্য