সাংবাদিকের কাজ সত্য খুঁজে বের করা: কাদের গনি চৌধুরী
নিউইয়র্কে বিএফইউজে মহাসচিবের মতবিনিময়, ‘নো ওয়েজবোর্ড, নো মিডিয়া’ নীতিমালা কার্যকরের দাবি
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ:
সাংবাদিকতা হচ্ছে সত্যের আরাধনা, বলেছেন বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) মহাসচিব এবং বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান সম্পাদক কাদের গনি চৌধুরী। বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, সত্যকে খুঁজে বের করা এবং তা রক্ষা করাই সাংবাদিকের কাজ। সত্য না থাকলে আস্থা থাকে না, আর আস্থা না থাকলে গণতন্ত্রও থাকে না।
বিজ্ঞাপন
তাঁর মতে, সাংবাদিকতা দাঁড়াবে পুরোপুরি সত্যতার ওপর। এতে মিথ্যা কিংবা অর্ধ-সত্যের কোনো জায়গা নেই, আপসেরও সুযোগ নেই। সংবাদপত্র দেশের জনগণ ছাড়া আর কারও কাছে দায়বদ্ধ নয়। কালোকে কালো আর সাদাকে সাদা বলাই সাংবাদিকতার মূল মন্ত্র।
মঙ্গলবার স্থানীয় সময় রাতে নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটসে এক মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন। জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশন উপলক্ষে বাংলাদেশ থেকে আসা সাংবাদিকদের সঙ্গে নিউইয়র্কে কর্মরত সাংবাদিকদের এই সভার আয়োজক ছিল নিউইয়র্ক বাংলাদেশ প্রেসক্লাব।
কাদের গনি চৌধুরী বলেন, ‘মনে রাখতে হবে, দাসত্বের সাংবাদিকতাকে মানুষ ঘৃণা করে। গত ১৭ বছরে আমরা অনেক সাংবাদিককে দাসত্বের সাংবাদিকতা করতে দেখেছি। এর কারণে ফ্যাসিবাদী শাসন দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে।’ তাঁর অভিযোগ, এসব সাংবাদিক সাংবাদিকদের মর্যাদাকে ম্লান করে দিয়েছেন।
৫ই আগস্ট ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান এই বিষয়টি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। তাঁর বক্তব্য, যাঁরা দীর্ঘদিন দলীয় ব্যানারের আড়ালে সাংবাদিকতা করেছেন এবং ক্ষমতার সঙ্গে আঁতাত করে জনগণের স্বার্থ বিসর্জন দিয়েছেন, তাঁরা শেষ পর্যন্ত জনগণের রোষানল থেকে রক্ষা পাননি। কেউ দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন, কেউ হত্যা মামলার আসামি হয়ে কারাগারে গেছেন, আবার অনেকে আজও পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। এই বাস্তবতা থেকে এক অমোঘ সত্য বেরিয়ে এসেছে—সাংবাদিকতা কখনো দলীয় ব্যানারের ভিত্তিতে টিকে থাকতে পারে না। জনগণের আস্থা হারানো মানে সাংবাদিকতার মৃত্যু। সাংবাদিকতা মুনাফাভিত্তিক ব্যবসা নয়, এটি একটি সম্মানের পেশা।
বিজ্ঞাপন
সাংবাদিকতার পথ কখনোই সহজ বা মসৃণ ছিল না বলে মনে করিয়ে দেন তিনি। এখন গণমাধ্যমে যে অনুকুল পরিবেশ রয়েছে, তা বজায় থাকলে সাংবাদিকরা আরও বেশি সত্য তুলে ধরতে পারবেন। তবে যা ইচ্ছা লিখলেই সাংবাদিকতা হয় না, আর যা মুখে আসে তা বলাও বাকস্বাধীনতা নয়। স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্বশীলতার কথাও সাংবাদিকদের মনে রাখতে হবে।
গণমাধ্যমের সংখ্যা দ্রুত বেড়ে যাওয়া নিয়ে বিএফইউজে মহাসচিব বলেন, এসব মিডিয়া সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করছে। অধিকাংশ মিডিয়ার প্রাতিষ্ঠানিকতা নেই। বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার বদলে ব্যবসায়ীসহ সমাজের নানা শ্রেণির মানুষকে হয়রানি ও ব্ল্যাকমেইল করার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। মোবাইল ফোন হাতে নিয়ে অনেকেই নিজেকে সাংবাদিক পরিচয় দিচ্ছেন। এর ভয়াবহতা থেকে কেউ নিরাপদ নয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করেও সামাজিকভাবে মানুষকে হেয়প্রতিপন্ন করা হচ্ছে।
এসব ঠেকাতে আইনের সঠিক প্রয়োগের ওপর জোর দেন তিনি। অপসাংবাদিকতা ও হয়রানি রোধে আইনের যথাযথ ব্যবহার করতে হবে, তবে আইনের যাতে অপব্যবহার না হয়, সে ব্যাপারেও সতর্ক থাকা দরকার।
কাদের গনি চৌধুরী বলেন, ‘নো ওয়েজবোর্ড, নো মিডিয়া’ নীতিমালা কার্যকর করতে হবে। তাঁর ব্যাখ্যা, ওয়েজবোর্ড মেনে বেতন দিতে হয় না বলেই অসংখ্য ভুঁইফোড় গণমাধ্যম গড়ে উঠছে। ভুঁইফোড় গণমাধ্যমের ক্ষেত্রেও ওয়েজবোর্ড বাধ্যতামূলক হলে অপসাংবাদিকতা অনেকটাই কমে আসবে বলে তাঁর ধারণা। এসব গণমাধ্যমের তথাকথিত সাংবাদিকদের একটি অংশ চাঁদাবাজি করছে এবং সাংবাদিকতার পরিচয়ের অপব্যবহার করছে, ফলে সাংবাদিকতার মর্যাদা ম্লান হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও চাকরির নিশ্চয়তা দাবি করে তিনি জানান, তাঁরা সাংবাদিক সুরক্ষা আইনের দাবি তুলছেন। সরকারি কর্মকর্তারা যেখানে নানা সুযোগ-সুবিধা ও ছুটি পান, সেখানে সাংবাদিকদের কর্ম-পরিবেশ ও ছুটির বিষয়টি এখনও যথাযথভাবে নিশ্চিত হয়নি।
বিগত সরকারের সময়ে সাগর-রুনিসহ অনেক সাংবাদিক হত্যার শিকার হয়েছেন বলে উল্লেখ করেন কাদের গনি চৌধুরী। তাঁর ভাষ্য, কথায় কথায় সাংবাদিকদের চাকরীচ্যুত করা হয়। জনগণের নিরাপত্তা ও অধিকারের কথা বললেও সাংবাদিকদের নিজেদের নিরাপত্তা কর্মক্ষেত্রসহ কোথাও নিশ্চিত নয়, চাকরির নিশ্চয়তাও নেই।
সাংবাদিক সমাজের বিভাজন নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে বিএফইউজে মহাসচিব বলেন, আজকে বহু বিভাজনের কারণে সাংবাদিকরা নিজেরাই দুর্বল হচ্ছেন, আর সরকার ও মালিকরা এর সুযোগ নেন। সাংবাদিকদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ঐক্যবদ্ধ হলে গণমাধ্যমের অনেক সমস্যার সমাধান সম্ভব হবে এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখা যাবে।
নিউইয়র্ক বাংলাদেশ প্রেস ক্লাবের সভাপতি মনোয়ারুল ইসলাম সভায় সভাপতিত্ব করেন এবং সাধারণ সম্পাদক সঞ্চালনা করেন। উপস্থিত অন্যদের মধ্যে ছিলেন নুরুল আলম রোকন, সাঈদ তারেক, আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, আবু রুশদ, ফরিদ আলম, গাউছুল আজম বিপু, কেরামত উল্লাহ বিপ্লব, আরিফুল ইসলাম মামুন, মঈনুদ্দীন নাসের, মমিনুল ইসলাম মজুমদার, ওয়াহেদ খান, এবিএম সালেহ উদ্দিন, সিরাজুল ইসলাম ও ডা. সারোয়ার ইসলাম।