টাঙ্গাইলে নারীদের উদ্যোগে ১১ বছর ধরে দুর্গাপূজা
কালিহাতী উপজেলার মগড়া গ্রামে ‘উজ্জয়িনী’ নামের সংগঠনের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে এই ব্যতিক্রমী আয়োজন
টাঙ্গাইল জেলা প্রতিনিধি · কালিহাতী, টাঙ্গাইল
প্রকাশ:
টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার দশকিয়া ইউনিয়নের মগড়া গ্রামে গত ১১ বছর ধরে নারীদের উদ্যোগে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হচ্ছে। সামাজিক কুসংস্কার ও বৈষম্য থেকে মুক্তি পেতে স্থানীয় নারীরা ‘উজ্জয়িনী’ নামের একটি সংগঠন গড়ে তোলেন, যার মাধ্যমে তারা দুর্গাপূজার আয়োজন করে আসছেন। এই মণ্ডপে চাঁদা সংগ্রহ, বাজারঘাট থেকে শুরু করে ঢাক বাজানো পর্যন্ত সব কাজ নারীরাই সম্পন্ন করেন।
বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন পরিষদ কালিহাতী উপজেলা শাখার জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি কাশীনাথ মজুমদার জানান, টাঙ্গাইল জেলায় এবার ১ হাজার ৩৫৭টি দুর্গাপূজার মণ্ডপ হয়েছে। এর মধ্যে মগড়া গ্রামে নারীদের এই আয়োজনটি অত্যন্ত ব্যতিক্রমী। কাশীনাথ মজুমদার আরও বলেন, “টাঙ্গাইল জেলায় এবার ১ হাজার ৩৫৭টি দুর্গাপূজার মণ্ডপ হয়েছে। এর মধ্যে কালিহাতীর মগড়া গ্রামে নারীদের উদ্যোগে দুর্গাপূজার আয়োজনটি ব্যতিক্রম। এটিই জেলার একমাত্র মণ্ডপ, যেখানে পূজার আয়োজন করেন নারীরা।” এমনকি নারীদের এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগের জন্য উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আগে এই কমিটিকে পুরস্কারও দেওয়া হয়েছে।
পূজা কমিটির সাধারণ সম্পাদক সীমা কর্মকার (৪২) জানান, গ্রামের হিন্দু নারীরা পরিবার ও সমাজে নানা বৈষম্যের শিকার হতেন। তিনি বলেন, “এ গ্রামের হিন্দু মেয়েদের সমাজে, এমনকি পরিবারেও বৈষম্যের শিকার হতে হতো। ঘোমটা ছাড়া ঘরের বাইরে বের হলে কথা শুনতে হতো। পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করলেও ছেলে–মেয়ে একসঙ্গে পড়ে, এমন প্রতিষ্ঠানে উচ্চশিক্ষার জন্য ভর্তি হতে বাধা দিত, স্বামীর চেয়ে বেশি লেখাপড়া করা যাবে না, এমন নানা বিধিনিষেধ ছিল।”
সীমা কর্মকার আরও জানান, ২০০২ সালে উচ্চশিক্ষার সময় বৈষম্যের প্রতিবাদ করতে তিনি শিপ্রা পাল, বুলবুলি কর্মকার ও অন্য এক সীমা কর্মকারের সঙ্গে মিলে ‘উজ্জয়িনী’ গঠন করেন। তারা নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণে ২০১৬ সালে প্রথম দুর্গাপূজা শুরু করেন। তিনি বলেন, “২০০২ সালে সম্মান শ্রেণিতে ভর্তির সময় আমাকেও নানা সমস্যায় পড়তে হয়।
তখন মনে মনে চিন্তা করি, এর প্রতিবাদ করতে হবে। নারীদের সংগঠিত করতে হবে। আমাদের গ্রামেই বিয়ে হয়ে আসে এক বধূ।
বিজ্ঞাপন
ওনার নামও সীমা কর্মকার (এই সীমা আমার চেয়ে ছয় বছরের বড়)। আমরা নারীদের মুক্তির জন্য ওনার সঙ্গে আলাপ আলোচনা করতাম। একসময় আমরা দুজন (দুই সীমা কর্মকার) এবং শিপ্রা পাল ও বুলবুলি কর্মকার চারজন মিলে ওই বছরই গঠন করি ‘উজ্জয়িনী’ সংগঠন।
পরে একে একে আরও নারী, বিশেষ করে শিক্ষার্থীরা যুক্ত হতে থাকে আমাদের সঙ্গে। পরে আমরা সিদ্ধান্ত নেই ‘দুর্গতিনাশিনী দেবী’ দুর্গার পূজা করব আমরা নিজেরাই। সব জায়গায় পুরুষেরা আয়োজনে মুখ্য ভূমিকায় থাকে।
পুরুষেরা পারলে আমরা পারব না কেন। ২০১৬ সালে আমরা প্রথম দুর্গাপূজা শুরু করি। সফলভাবে পূজা সম্পন্ন করার পর আমাদের আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায়।
তারপর থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রতিবছর আমরা দুর্গাপূজার আয়োজন করছি। এবার ১১তম দুর্গাপূজা হচ্ছে।”
বিজ্ঞাপন
সোমবার দুপুরে মগড়া গ্রামের কর্মকার পাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, উজ্জয়িনীর উদ্যোগে অস্থায়ী মণ্ডপ তৈরি করা হয়েছে। সেখানে অষ্টমী পূজার পুষ্পাঞ্জলি দিয়ে নারীরা মন্দির প্রাঙ্গণে অবস্থান করছেন এবং এক তরুণী ঢাক বাজাচ্ছেন। টাঙ্গাইল থেকে পূজা দেখতে আসা সুব্রত কুমার তালুকদার বলেন, “অনেক পূজামণ্ডপ দেখেছি। শুধু নারীদের উদ্যোগে দুর্গাপূজা এই প্রথম দেখলাম। ভালো লাগল, নারীদের পূজার আয়োজন দেখে।” স্থানীয় তুষার কর্মকারের মতে, এই আয়োজন নারীদের ক্ষমতায়ন ও সক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ।
পূজা কমিটির সভাপতি সীমা কর্মকার (৪৮) জানান, তারা সবাই মিলে চাঁদা দিয়ে এই আয়োজন করেন এবং শুধু পুরুষ পুরোহিত পূজা পরিচালনা করেন। তিনি বলেন, “পূজার সব কাজ আমরা নারীরাই করি, শুধু পুরুষ পুরোহিত পূজা করেন। আমাদের সদস্যরা সবাই পূজার জন্য চাঁদা দিই। শুরুতে অনেকেই আমাদের এই আয়োজনকে ভালো চোখে দেখত না। এখন সবাই সহযোগিতা করেন।” এছাড়া বাংলাদেশ মহিলা ক্রীড়া সংস্থার সভানেত্রী সারওয়াত সিরাজ শুক্লা এবার উজ্জয়িনীর সব সদস্যকে শাড়ি উপহার দিয়েছেন।