অ্যারন সরকিনের সংলাপনির্ভর সিনেমা ‘দ্য সোশ্যাল রেকনিং’র শেষ কয়েক মিনিট দেখে উচ্ছ্বাসে হাততালি দিতে ইচ্ছা করে। প্রযুক্তির বিপুল ক্ষমতা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম এবং তার আড়ালে লুকিয়ে থাকা বিপজ্জনক বাস্তবতা নিয়ে নির্মিত এই সিনেমা দর্শককে ভাবায়, একই সঙ্গে রোমাঞ্চিতও করে।
গল্পটি অনেকটা ডেভিড-গোলিয়াথের লড়াইয়ের মতো। একদিকে ক্ষমতাধর প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, অন্যদিকে সেই প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম ও ক্ষতিকর কর্মকাণ্ড প্রকাশ্যে আনার চেষ্টা করা কয়েকজন মানুষ। দুর্বল পক্ষের এই লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত আশার আলো দেখা যায়। তবে প্রশ্ন হলো, বাস্তবের এত ক্ষমতাধর একজন মানুষ ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কতটা জোরালোভাবে দাঁড়াতে পারে সিনেমা?
সিনেমার পটভূমি ২০২০ সালের কাছাকাছি সময়। তখন ফেসবুকের ব্যবহারকারী ছিল প্রায় ২৮০ কোটি, আর প্রতিষ্ঠানটির বাজারমূল্য ছিল এক ট্রিলিয়ন ডলার। ছবিতে উঠে এসেছে ফেসবুকের অ্যালগরিদম কীভাবে ব্যবহারকারীদের উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর দিকে ঠেলে দিতে পারে এবং সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়ানোর ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে। সিনেমায় উল্লেখ করা হয়েছে, এ ধরনের গোষ্ঠীর দিকে পরিচালিত হওয়া ব্যবহারকারীদের ৬৪ শতাংশের ক্ষেত্রে অ্যালগরিদমের ভূমিকা ছিল।
প্রশ্ন হলো, সাংবাদিকতার মাধ্যমে এসব অভিযোগের প্রমাণ সামনে এলে বাস্তবে কী পরিবর্তন ঘটে? লেখকের পর্যবেক্ষণ, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানটির নাম ফেসবুক থেকে মেটা হলেও এর ক্ষমতা কমেনি। ফলে বাস্তবতার গভীরতা তুলে ধরলেও সিনেমার গল্প কখনো কখনো রূপকের সীমা ছাড়াতে পারে না।
সংলাপের শক্তিতে এগিয়ে যায় গল্প
এখানেই চিত্রনাট্যকার ও পরিচালক অ্যারন সরকিনের দক্ষতা। ‘আ ফিউ গুড মেন’ ও ‘দ্য ওয়েস্ট উইং’র মতো কাজের জন্য পরিচিত সরকিন সংলাপকে গল্প বলার প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তার সংলাপ কখনো সাহিত্যিক, কখনো তীক্ষ্ণ, আবার কখনো রাজনৈতিক বক্তব্যে ভরপুর।
সিনেমার প্রাণ দুই চরিত্র, ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের অনুসন্ধানী সাংবাদিক জেফ হরউইটজ (জেরেমি অ্যালেন হোয়াইট) এবং ফেসবুকের ভেতরের তথ্য প্রকাশকারী ফ্রান্সেস হাউগেন (মাইকি ম্যাডিসন)।
দুজনই নিজেদের পেশার সীমা ছাড়িয়ে বৃহত্তর একটি উদ্দেশ্য খুঁজে পান। তাদের পারস্পরিক সম্পর্কের শুরুতে দ্বিধা ও সংশয় থাকলেও ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে গভীর আস্থা। এই সম্পর্কই সিনেমাটিকে নিছক করপোরেট বা রাজনৈতিক নাটকের গণ্ডি থেকে বের করে আনে। এমনকি গল্পটি চাইলে রোমান্টিক কমেডির রূপও নিতে পারত। যদিও সরকিনের নির্মাণশৈলীতে আবেগের চেয়ে যুক্তি ও সংলাপের প্রাধান্যই বেশি।
শেষ ৪৫ মিনিটে জমে ওঠে উত্তেজনা
সিনেমার প্রকৃত নাটকীয়তা শুরু হয় শেষ ৪৫ মিনিটে। এর আগে ঘটনা ও তথ্যের বিন্যাস কিছুটা ধীর মনে হতে পারে। কিন্তু শেষ দিকে গল্পের গতি বাড়ে, উত্তেজনা তীব্র হয় এবং পরিণতি দর্শককে আবেগতাড়িত করে।
বিশেষ করে শেষ দৃশ্যগুলোতে ফ্রান্সেস হাউগেনের দৃঢ়তা ও প্রতিবাদের মুহূর্ত সিনেমার অন্যতম শক্তিশালী অংশ। কাঠামোগতভাবে গল্পটি আরও সাবলীল করা যেত কি না, সে প্রশ্ন অবশ্য থেকেই যায়।
‘দ্য সোশ্যাল রেকনিং’কে ২০১০ সালে মুক্তি পাওয়া ডেভিড ফিঞ্চারের ‘দ্য… সোশ্যাল নেটওয়ার্ক’র ভাবগত সিক্যুয়েল বলা যায়। দুটি ছবিরই চিত্রনাট্যকার সরকিন। তবে ফিঞ্চারের নিখুঁত চলচ্চিত্র নির্মাণশৈলীর সঙ্গে সরকিনের সংলাপনির্ভর পরিচালনার সরাসরি তুলনা করা কঠিন।
জাকারবার্গের চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন
দুটি সিনেমার তুলনায় সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে মার্ক জাকারবার্গের চরিত্রায়ণ। ‘দ্য সোশ্যাল নেটওয়ার্ক’ সিনেমায় জেসি আইজেনবার্গের অভিনয়ে জাকারবার্গকে তুলনামূলক মানবিকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিল। নতুন সিনেমায় জেরেমি স্ট্রংয়ের অভিনয়ে চরিত্রটি অনেক বেশি একমাত্রিক ও ব্যঙ্গাত্মক হয়ে উঠেছে বলে মনে হতে পারে।
এর পেছনে অভিনেতার অভিনয়শৈলী যেমন দায়ী হতে পারে, তেমনি প্রযুক্তি সাম্রাজ্যের ক্ষমতা নিয়েও নির্মাতাদের সতর্কতা কাজ করেছে কি না, সেই প্রশ্নও ওঠে। বাস্তবের জাকারবার্গের কতটা কাছাকাছি পৌঁছানোর সুযোগ পেয়েছিলেন নির্মাতারা, তা স্পষ্ট নয়।
২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি ওয়াশিংটনের ক্যাপিটলে হামলার ঘটনাও সিনেমায় এসেছে। সেখানে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সরাসরি নাম ধরে না ডেকে ‘তিনি’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ আলি আব্বাসির ‘দ্য অ্যাপ্রেন্টিস’ (২০২৪) ছবিতে ট্রাম্পের জীবন ও রাজনৈতিক উত্থান অনেক বেশি সরাসরি এবং নির্ভীকভাবে তুলে ধরা হয়েছিল।
বাক্স্বাধীনতার সীমা কোথায়?
সিনেমাটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি বাক্স্বাধীনতা নিয়ে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কি নিরঙ্কুশ হওয়া উচিত? সহিংসতায় উসকানি কিংবা বিদ্বেষ ছড়ানোর ক্ষেত্রে কি কোনো সীমারেখা টানা প্রয়োজন?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম কীভাবে বিদ্বেষ, ষড়যন্ত্রতত্ত্ব ও ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে দিতে পারে, তা নিয়েও ছবিটি প্রশ্ন তোলে। ভারতে যেমন ‘হোয়াটসঅ্যাপ ইউনিভার্সিটি’ শব্দবন্ধের মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো ভুল তথ্যকে ব্যঙ্গ করা হয়, তেমনি এ সমস্যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে ফেসবুকের মালিকানাধীন হোয়াটসঅ্যাপও।
সিনেমাটি নির্মিত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেক্ষাপটে, যেখানে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা ও তথ্য ফাঁসকারীদের সুরক্ষার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষমতা এবং জনমতকে প্রভাবিত করার সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগও ক্রমশ বাড়ছে।
সরকিনের বক্তব্যটি স্পষ্ট, ‘গণতন্ত্রই সরকার পরিচালনার সর্বোত্তম ব্যবস্থা। কিন্তু সবসময়ের জন্য তা সর্বোত্তম ব্যবস্থা নয়।’
এই বক্তব্যেই সিনেমাটির মূল সুর ধরা পড়ে। প্রযুক্তি, ক্ষমতা ও বাক্স্বাধীনতার সংঘাত নিয়ে ‘দ্য সোশ্যাল রেকনিং’ সব প্রশ্নের উত্তর দেয় না। তবে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলো সামনে আনে। কিছুটা দীর্ঘসূত্রতা থাকলেও শক্তিশালী সংলাপ, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার প্রেক্ষাপট এবং শেষের আবেগঘন মুহূর্তের জন্য সিনেমাটি দর্শকের মনোযোগ পাওয়ার যোগ্য।
সূত্র: মিড ডে








মন্তব্য