ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের গবেষক, ধ্রুপদ শিল্পী, প্রাবন্ধিক ও সাংস্কৃতিক দার্শনিক সালাহ উদ্দীন মাহবুব ভারত ও বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনে একটি পরিচিত মুখ। সাধনা, গবেষণা ও শিক্ষকতা, তিন পথেই তিনি গুরুশিষ্য পরম্পরার ধারা এগিয়ে নিয়ে চলেছেন।
সুরের পথে যাত্রা – ছোটবেলা থেকেই সংগীতের প্রতি টান ছিল তার। নানির সংগীত শেখার অপূর্ণ ইচ্ছাই তাকে এই পথে এনেছে। গ্রামের শিক্ষক রেজাউল ইসলাম, লাভলু মিয়া ও মোকবুল হোসেনের কাছে তবলায় তার হাতেখড়ি। শৌখিন চিত্রশিল্পী বাবা মরহুম কাইসার উদ্দীন মাসুদ এবং মা নীলিমা বেগমসহ পরিবারের সবাই তাকে উৎসাহ দিয়েছেন।
শিক্ষাজীবন – আলমডাঙ্গা পাইলট হাই স্কুল থেকে এসএসসি এবং ন্যাশনাল আইডিয়াল কলেজ থেকে এইচএসসি সম্পন্ন করেন তিনি। মেধার স্বীকৃতি হিসেবে ভারতীয় সাংস্কৃতিক সম্পর্ক পরিষদ (আইসিসিআর) বৃত্তি পেয়ে ভারতে যান এবং ঐতিহ্যবাহী দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতে স্নাতক, স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। পাশাপাশি কলকাতার আইটিসি সংগীত রিসার্চ একাডেমির (আইটিসি এসআরএ) স্কলার ছিলেন।
গুরুদের সান্নিধ্য – সেখানে ওস্তাদ ওয়াসিফুদ্দিন ডাগর, বিদুষী গিরিজা দেবী ও পণ্ডিত উদয় ভাওয়ালকরের দীর্ঘ সান্নিধ্যে গুরুশিষ্য ধারায় তালিম নেন। পণ্ডিত যশরাজের সান্নিধ্যও পেয়েছেন। তার ঘরানা ডাগর বাণী। ডাগর বাণী ধ্রুপদ ধারার প্রায় বিশ প্রজন্মের এক ঐতিহ্য, যার উৎস স্বামী হরিদাসের কাল পর্যন্ত পিছিয়ে যায়। ডাগর পরিবার তাদের উৎস খুঁজে পায় দিল্লির কাছে ডাগুরি গ্রামের ব্রিজ চাঁদের মধ্যে, আর এ ঐতিহ্যের প্রায় চারশ বছরের পথচলার দাবি করে। এই ধারার বর্তমান গায়কি ও শিক্ষাপদ্ধতির পূর্ণ রূপ গড়ে ওঠে অষ্টাদশ শতকের জয়পুরের বেহরাম খাঁর হাত ধরে। একসময় জয়পুর, উদয়পুর ও মেওয়ার দরবারের সঙ্গে এই ঘরানার শিল্পীরা যুক্ত ছিলেন। আল্লাহ বান্দে খাঁর পুত্র রহিমুদ্দিন খাঁই প্রথম নামের শেষে ‘ডাগর’ পদবি যুক্ত করেন, পরে পরিবারের অন্যরাও তা গ্রহণ করেন।
বিংশ শতাব্দীতে ‘সিনিয়র ডাগর ব্রাদার্স’ নাসির মইনুদ্দিন ও নাসির আমিনুদ্দিন এবং ‘জুনিয়র ডাগর ব্রাদার্স’ নাসির জহিরুদ্দিন ও নাসির ফয়েজুদ্দিন ডাগর এই ধারাকে ইউরোপ, আমেরিকা ও জাপানে পৌঁছে দেন। ওস্তাদ ফয়েজ ওয়াসিফুদ্দিন ডাগর ফয়েজুদ্দিন ডাগরের পুত্র এবং ডাগর পরিবারের কুড়িতম প্রজন্মের প্রতিনিধি। গবেষণা ও অনুষ্ঠান উপলক্ষে বিভিন্ন দেশে ধ্রুপদ নিয়ে কর্মশালা পরিচালনা করেছেন সালাহ উদ্দীন মাহবুব।
পিএইচডি গবেষণা: ধ্রুপদ ও খেয়ালের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ
সালাহ উদ্দীন মাহবুবের পিএইচডি গবেষণার বিষয় ‘ধ্রুপদ ও খেয়ালের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ’, যা তিন খণ্ডের গ্রন্থ আকারে প্রকাশিত। ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের দুই প্রধান কণ্ঠধারা ধ্রুপদ ও খেয়াল কীভাবে জন্ম নিল, কোন ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে বিকশিত হলো এবং কালের পরিক্রমায় কীভাবে বদলাল, এই গবেষণায় তা বিশদভাবে অনুসন্ধান করা হয়েছে।
গবেষণায় প্রাচীন প্রবন্ধ গানের ঐতিহ্য থেকে ধ্রুপদের উদ্ভব, মধ্যযুগে রাজদরবার ও মন্দিরের পৃষ্ঠপোষকতায় তার পূর্ণ রূপ লাভ এবং ডাগর বাণীসহ বিভিন্ন বাণী ও ঘরানার বৈশিষ্ট্য আলোচিত হয়েছে। অন্যদিকে ধ্রুপদের গাম্ভীর্যের পাশে অপেক্ষাকৃত স্বাধীন, কল্পনাপ্রধান ও অলংকারবহুল গায়কি হিসেবে খেয়ালের আবির্ভাব, দরবারি সংস্কৃতিতে তার প্রসার এবং ঘরানাভিত্তিক বিবর্তনের ধারাও বিশ্লেষণ করা হয়েছে। দুই ধারার গায়নরীতি, বন্দিশের গঠন, তাল ও লয়ের ব্যবহার এবং রাগ উপস্থাপনার পার্থক্য ও মিলের তুলনামূলক পর্যালোচনা গবেষণাটির বিশেষ দিক। তিন খণ্ডে ধারাবাহিকভাবে সাজানো এই কাজ শিক্ষার্থী, গবেষক ও সঙ্গীতপ্রেমীদের জন্য ধ্রুপদ ও খেয়াল বোঝার একটি তথ্যসমৃদ্ধ নির্ভরযোগ্য সূত্র।
গবেষণাগ্রন্থ
ধ্রুপদ ও খেয়ালের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ (তিন খণ্ড)
ধ্রুপদ ও মারফতি দর্শন
বাংলা খেয়ালের নান্দনিক পুনর্গঠন
আলেক সাঁইয়ের সন্ধানে (লালন দর্শনে শব্দতত্ত্ব ও আচার: ‘আলেক’ সম্বোধনের নৃতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ)
পিএইচডি গবেষণার পরবর্তী কাজগুলোতে তিনি শাস্ত্রীয় সংগীতের সঙ্গে আধ্যাত্মিক দর্শন ও বাংলার নিজস্ব সংগীতধারার সম্পর্ক খুঁজেছেন। ‘ধ্রুপদ ও মারফতি দর্শন’ গ্রন্থে ধ্রুপদের সাধনা ও মারফতি চিন্তার যোগসূত্র অনুসন্ধান করা হয়েছে। ‘বাংলা খেয়ালের নান্দনিক পুনর্গঠন’ গ্রন্থে বাংলা ভাষায় খেয়ালচর্চার সৌন্দর্যতত্ত্ব ও তার নতুন বিন্যাস নিয়ে আলোচনা রয়েছে।
সর্বশেষ গ্রন্থ ‘আলেক সাঁইয়ের সন্ধানে’ লালন দর্শনের শব্দতত্ত্ব ও আচার নিয়ে। লালনের গানে ব্যবহৃত ‘আলেক’ সম্বোধনের নৃতাত্ত্বিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে বাউল ও ফকিরি ধারার ভাষাগত ও মনস্তাত্ত্বিক দিক এখানে গভীরভাবে তুলে ধরা হয়েছে। শাস্ত্রীয় সংগীতের কাঠামোগত সূক্ষ্মতা এবং আধ্যাত্মিক দর্শনের গভীরতা, দুইয়ের সেতুবন্ধই তার গবেষণার মূল সুর।
অডিও অ্যালবাম – তার উল্লেখযোগ্য অডিও অ্যালবামের মধ্যে রয়েছে ‘নীলাম্বরী মেঘ’, ‘দুর্গা’, ‘শ্রী’ এবং সর্বশেষ ‘চারুকেশী’। অ্যালবামগুলোতে পাখোয়াজে সঙ্গত করেছেন পণ্ডিত সঞ্জয় মহারাজ।
বর্তমান গবেষণা – বর্তমানে তিনি বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের সৃষ্ট অনন্য রাগগুলোর আধুনিক উপস্থাপনা, স্বরলিপি ও সংরক্ষণ নিয়ে গবেষণা করছেন। নজরুল কেবল কবি ও গীতিকার ছিলেন না, নতুন রাগ সৃষ্টির মাধ্যমে বাংলা সংগীতে শাস্ত্রীয় ধারার সঙ্গে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছেন। অথচ এসব রাগের প্রামাণিক স্বরলিপি ও শাস্ত্রসম্মত উপস্থাপনা এখনো পর্যাপ্তভাবে সংরক্ষিত নয়। এই গবেষণার লক্ষ্য রাগগুলোকে সঠিক স্বরলিপিতে লিপিবদ্ধ করা, আধুনিক শিল্পীদের জন্য উপস্থাপনার রূপরেখা তৈরি করা এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য এই অমূল্য সংগীতিক উত্তরাধিকার সংরক্ষণ করা।
গুরুকুল ও শিক্ষকতা – তার প্রতিষ্ঠিত ‘গুরুকুল’ প্রতিষ্ঠানে গুরুশিষ্য পরম্পরার আদি রীতিতে বিনা পারিশ্রমিকে শাস্ত্রীয় সংগীতের তালিম দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া তিনি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ধ্রুপদ সংগীত পড়ান।
সম্মাননা – ২০১৯ সালে ভারতীয় হাইকমিশনের উদ্যোগে আয়োজিত ‘দিল্লি ক্লাসিক্যাল ফেস্ট’ অনুষ্ঠানে সম্মাননা পান। এ ছাড়া আইসিসিআর, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি ও আইটিসি এসআরএ কলকাতা তাকে সম্মাননা দিয়েছে। ২০২৪ সালে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগ এবং ভারতের রামকৃষ্ণ মিশন বিবেকানন্দ এডুকেশনাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট তাকে বিশেষ সম্মাননা প্রদান করে।
পরিবার – সিরাজগঞ্জ জেলার একটি কবি ও সাহিত্যিক পরিবারে তার বৈবাহিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সহধর্মিণী তাসনিয়া ফিরোজী তমা তাকে এগিয়ে চলার সাহস জোগান। তাদের একমাত্র কন্যা তাবিয়া মাহবুব নীলাম্বরী পাঁচ বছর বয়স থেকেই বাবার কাছে সঙ্গীতের তালিম নিচ্ছে।
শাস্ত্রীয় সংগীতের ভবিষ্যৎ – বাংলাদেশে শাস্ত্রীয় সংগীত শিক্ষায় ছেলেমেয়েদের আগ্রহ নিয়ে গবেষক সালাহ উদ্দীন মাহবুব বলেন, আধুনিক জীবনের গতি ও বিনোদনের বিপুল সুযোগের মাঝে নতুন প্রজন্মের অনেকেই শাস্ত্রীয় সংগীতকে কঠিন ও সময়সাপেক্ষ মনে করে দূরে সরে থাকে। অথচ সঠিক পথে এগিয়ে দিলে তারা এই সুরের গভীরতায় সহজেই মুগ্ধ হয়। তার মতে, শাস্ত্রীয় সংগীত কেবল গান নয়, এটি ধৈর্য, সাধনা ও আত্মোপলব্ধির শিক্ষা।
এই ধারার বিকাশে তিনি শৈশব থেকেই সংগীতশিক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন। তার পরামর্শ, প্রাতিষ্ঠানিক পাঠ্যক্রমের পাশাপাশি গুরুমুখী তালিমের চর্চা বাড়াতে হবে এবং নিয়মিত আসর, কর্মশালা ও সেমিনারের আয়োজন করতে হবে। তিনি মনে করেন, ডিজিটাল মাধ্যমের ব্যবহার বাড়ালে এই ধারা আরও সমৃদ্ধ হবে। ইউটিউব ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাগের পরিচিতি, সংক্ষিপ্ত পাঠ ও অনুষ্ঠানের ভিডিও ছড়িয়ে দিলে তরুণেরা সহজেই শাস্ত্রীয় সংগীতের সঙ্গে পরিচিত হবে। অনলাইন ক্লাস ও রেকর্ডিংয়ের মাধ্যমে দূরের শিক্ষার্থীরাও গুরুর তালিম পেতে পারবে, আর দুর্লভ বন্দিশ ও গানের সংরক্ষণও সহজ হবে। তবে তার মতে, প্রযুক্তি কখনোই গুরুমুখী শিক্ষার বিকল্প নয়, বরং তার সহায়ক। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্র, সবার সম্মিলিত উদ্যোগেই বাংলাদেশে শাস্ত্রীয় সংগীতের ভবিষ্যৎ আরও উজ্জ্বল হবে বলে তার বিশ্বাস।
শাস্ত্রীয় সংগীতের চর্চা, লোকঐতিহ্যের শিকড় অনুসন্ধান এবং গণমাধ্যমে সক্রিয় উপস্থিতির মাধ্যমে সালাহ উদ্দীন মাহবুব উপমহাদেশের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও দর্শন বৈশ্বিক পরিসরে তুলে ধরতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।








মন্তব্য