নেত্রকোনা শহরে অটোরিকশার অদরশনে বেড়েছে যানজট
পৌরসভার হিসাবে নিবন্ধিত অটোরিকশা ৫ হাজার ৬৫৯, বাস্তবে এটির চেয়ে অনেক বেশি চলাচল করছে
নেত্রকোণা জেলা প্রতিনিধি · নেত্রকোণা
প্রকাশ:
নেত্রকোনা জেলা শহরে অটোরিকশায় করে মাত্র দুই কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে কখনো কখনো এক ঘণ্টা লেগে যাচ্ছে, যার মূল কারণ হলো প্রয়োজনের অতিরিক্ত অটোরিকশার নিয়ন্ত্রণহীন চলাচল। স্থানীয় বাসিন্দাদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ছোট শহরের এই পরিস্থিতিতে সড়কে যানজটের মাত্রা উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে।
বিজ্ঞাপন
নেত্রকোনা পৌরসভার হিসাবে, শহরে নিবন্ধিত ইজিবাইক, মিশুক ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সংখ্যা ৫ হাজার ৬৫৯। তবে বাস্তবে শহরে চলাচল করা অটোরিকশার সংখ্যা সাড়ে সাত হাজারের বেশি বলে মনে করা হচ্ছে। পৌরসভা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ১৮৮৭ সালে গঠিত এ পৌরসভার আয়তন ২১ দশমিক ২ বর্গকিলোমিটার, যেখানে ৯টি ওয়ার্ডে প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার মানুষের বসবাস এবং মোট ৯৩ কিলোমিটার সড়ক রয়েছে।
এই যানজটের শিকার হয়েছেন শহরের বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা। সাতপাই কলেজ রোড এলাকার বাসিন্দা ও জেলা রেজিস্ট্রারের কার্যালয়ে কর্মরত হেলেনা খাতুন বলেন, “আগে ইজিবাইক বা রিকশায় করে অফিসে যেতে তাঁর সর্বোচ্চ ১৫ মিনিট লাগত। এখন লাগে প্রায় এক ঘণ্টা।” বনোয়াপাড়ার আবু আব্বাছ ডিগ্রি কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাঈক সাফওয়ান জানায়, তার বাসা থেকে কলেজের প্রায় তিন কিলোমিটার দূরত্ব রিকশায় অতিক্রম করতে এক থেকে দেড় ঘণ্টা লেগে যাচ্ছে।
যানজটের প্রধান এলাকা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে বনোয়াপাড়া মোড় থেকে মোক্তারপাড়া সেতু হয়ে রাজুরবাজার পর্যন্ত প্রায় চার কিলোমিটার জুড়ে। এ ছাড়া তেরিবাজার থেকে সাতপাই চানখার মোড় পর্যন্ত ২ কিলোমিটার, আখড়া মোড় থেকে বড়বাজার হয়ে মালনী মোড় পর্যন্ত প্রায় ৬০০ মিটার এবং মোক্তারপাড়া সেতু এলাকা থেকে পারলা বাসস্টেশন পর্যন্ত এলাকায় দিনের বিভিন্ন সময়ে যানজট দেখা দেয়। এসব সড়কের দুই পাশে বাজার, বিপণিবিতান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, সরকারি-বেসরকারি দপ্তর ও হাসপাতাল থাকায় চাপ আরও বাড়ছে।
জেলা পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ জানায়, সড়কের তুলনায় শহরে যানবাহনের সংখ্যা বেশি এবং ব্যক্তিগত গাড়ির চাপও বেড়েছে। যত্রতত্র পার্কিং, রাস্তার পাশে বাজার এবং ফুটপাত দখল হয়ে যাওয়াও যানজটের অন্যতম কারণ। নেত্রকোনা সরকারি কলেজ, এম আকন্দ কামিল মাদ্রাসা, নেত্রকোনা উচ্চবিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনে সকালে ক্লাস শুরুর আগে ও বিকেলে ছুটির সময় ইজিবাইক ও গাড়ি পার্ক করার কারণে যানচলাচল ব্যাহত হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
স্থানীয় বাসিন্দারা সমস্যার সমাধানের জন্য নিয়ন্ত্রণের দাবি তুলছেন। ছোট বাজার এলাকার বাসিন্দা আজাহারুল ইসলাম বলেন, “ইজিবাইক বন্ধ করে দিলে সাধারণ মানুষের যাতায়াতে সমস্যা হবে। অনেক মানুষের কর্মসংস্থানও এর সঙ্গে জড়িত। তবে নিয়ন্ত্রণ দরকার। ইজিবাইকের পাশাপাশি রাস্তার পাশে বাজারও যানজটের বড় কারণ।” সাতপাই কলেজ রোড এলাকার বাসিন্দা রাকিবুল ইসলাম বলেন, “অল্প দূরত্বের পথেও যানজটে পড়ে অনেক সময় চলে যায়। ইজিবাইকগুলো যেখানে-সেখানে দাঁড়িয়ে থাকে। চালকদের কোনো প্রশিক্ষণ নেই। এভাবে চলতে থাকলে শহরে স্বাভাবিকভাবে চলাচল করাই কঠিন হয়ে যাবে।”
জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান জানান, শহরে যানজট নিরসনে বিভিন্ন পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, “ইজিবাইক নিয়ন্ত্রণ, নির্দিষ্ট স্ট্যান্ড করা ও সড়ক দখলমুক্ত করার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনা হচ্ছে। ধাপে ধাপে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।” জেলা ট্রাফিক পুলিশের পরিদর্শক মাহবুবুর রহমান বলেন, “শহরে যানবাহনের সংখ্যা বেড়েছে। সড়কের বিভিন্ন জায়গায় যানবাহন দাঁড়িয়ে থাকা, যাত্রী ওঠানো-নামানো এবং রাস্তার পাশে বাজার বসার কারণে যানজট হচ্ছে। ট্রাফিক পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে। তবে শুধু পুলিশ দিয়ে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। পৌরসভাসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।” নেত্রকোনা পৌরসভার নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নুরুল আমিন জানান, নিবন্ধনহীন এবং বাইরের ইজিবাইক যাতে শহরে প্রবেশ করতে না পারে, সে বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অতীতেও নেত্রকোনা শহরের যানজট কমাতে ইজিবাইকের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, নির্দিষ্ট স্ট্যান্ড তৈরি, সড়কের ওপর পার্কিং বন্ধ ও ফুটপাত দখলমুক্ত করার উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা হয়েছে এবং কিছু তৎপরতাও দৃশ্যমান হয়েছে। তবে দীর্ঘ মেয়াদে ও কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় কিছুদিন পর আবার আগের পরিস্থিতি ফিরে আসে বলে মত প্রকাশ করা হয়েছে।