ফ্রান্সজুড়ে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ঘিরে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) দেশটির বিভিন্ন শহরে শিক্ষক, অভিভাবক ও উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে আসেন। বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে কয়েক শ মানুষ আহতও হয়েছেন। আর দেশটির প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু এ পরিস্থিতিকে কয়েক দশকের মধ্যে শিক্ষাব্যবস্থার ওপর সবচেয়ে ভয়াবহ আঘাত হিসেবে বর্ণনা করেছেন। খবর রয়টার্সের।
দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মঙ্গলবার কয়েক ডজন শহরে অনুষ্ঠিত বিক্ষোভে আড়াই লাখের বেশি মানুষ অংশ নেন। তবে আয়োজকদের দাবি, অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৪ লাখ ৫০ হাজার। প্যারিস, স্ত্রাসবুর, রেন ও তুলুজসহ বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভের একপর্যায়ে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়লে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করে। সোমবারের সংঘর্ষে এক কিশোরের হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটে।
মঙ্গলবার সংসদে লেকর্নু জানান, সংঘর্ষে এখন পর্যন্ত অন্তত ২১৫ জন কিশোর ও ৮৫ জন স্কুলকর্মী আহত হয়েছেন। তার ভাষায়, কয়েক দশকের মধ্যে শিক্ষা খাতকে এমন প্রাণহানি ও হতাহতের মুখে পড়তে হয়নি। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর জানিয়েছে, মঙ্গলবারের সহিংসতায় ৭০০-এর বেশি পুলিশ সদস্যও আহত হয়েছেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, এদিন ৪৮৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং আহত হয়েছেন ৪৮ জন নিরাপত্তাকর্মী।
প্যারিসে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ানো প্রায় ৩০০ জনের অধিকাংশই মুখ ঢাকা বা মুখোশ পরা ছিলেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। রাজধানীর বাইরে অধিকাংশ বিক্ষোভ অবশ্য শান্তিপূর্ণ ছিল। তবে কয়েকটি দোকানের সামনের অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সেপ্টেম্বরে প্যারিসের দরিদ্র উপশহরগুলোতে এ বিক্ষোভের শুরু। পরে তা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বিভিন্ন স্কুলে শিক্ষক সংকট, অর্থের অভাব এবং অবকাঠামোর বেহাল দশা দীর্ঘদিনের সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোথাও পানি চুইয়ে পড়ছে, কোথাও আবার ইঁদুরের উপদ্রবের মতো মৌলিক সমস্যাও রয়েছে।
উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সংগঠন জানিয়েছে, দেশের অর্ধেকের বেশি উচ্চবিদ্যালয় মঙ্গলবার অবরুদ্ধ ছিল অথবা সেদিনের জন্য বন্ধ হয়ে যায়। কিছু এলাকায় শিক্ষা কর্তৃপক্ষ অনলাইনে পাঠদানের ব্যবস্থা করেছে।
বিক্ষোভকারীদের দাবির মধ্যে রয়েছে অনুপস্থিত শিক্ষকদের দ্রুত বদলি শিক্ষক দিয়ে পূরণ করা, সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত দীর্ঘ স্কুল সময় পুনর্বিবেচনা এবং মধ্যাহ্নভোজের বিরতি বাড়ানো। পাশাপাশি পুরোনো ও জরাজীর্ণ স্কুল ভবন সংস্কারের দাবিও রয়েছে।
এদিকে, বিক্ষোভের কারণে জরুরি বৈঠক ডেকেছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ। মঙ্গলবার লেকর্নু ও সরকারের জ্যেষ্ঠ মন্ত্রীদের নিয়ে তিনি বৈঠক করেন। লেকর্নু মন্ত্রীদের শিক্ষার্থীদের প্রধান দাবিগুলো নিয়ে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং অক্টোবরের শেষ নাগাদ প্রাথমিক প্রস্তাব দিতে বলেছেন।
তবে সরকারের এসব উদ্যোগে বিক্ষোভকারীদের মধ্যে সন্তুষ্টি দেখা যায়নি। প্যারিসের একটি স্কুলের সামনে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া অভিভাবক এমিলি লোম বলেন, সরকারের বক্তব্যে বাস্তব জীবনে তাদের সন্তানদের পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হবে না।
মানবাধিকার সংগঠন, শিক্ষার্থী ও অভিভাবক সংগঠনগুলো অপ্রাপ্তবয়স্কদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগের অভিযোগ তুলেছে। অন্যদিকে সরকার বলছে, আন্দোলনটি কিছু বহিরাগত ব্যক্তি নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করছে এবং কয়েকটি এলাকায় তা নগর সহিংসতায় রূপ নিয়েছে। বিচার মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বিভিন্ন অভিযোগে ১ হাজার ৮০০-এর বেশি মানুষের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, যাদের মধ্যে ১ হাজার ৪৮৩ জনই অপ্রাপ্তবয়স্ক।
ফ্রান্সের চলমান অর্থনৈতিক সংকটও আন্দোলনের পেছনে বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। দুর্বল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বাড়তে থাকা সরকারি ঋণ এবং বাজেট ঘাটতি কমানোর চাপের মধ্যে শিক্ষা খাতে নতুন অর্থ বরাদ্দ করা সরকারের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
গত সপ্তাহে ফ্রান্সের ১০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের সুদের হার সাময়িকভাবে ২৪ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ৫ শতাংশের ওপরে উঠে যায়।
শিক্ষায় সরকারের ব্যয় মূল্যস্ফীতির তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে। একই সময়ে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডেও ফ্রান্সের শিক্ষার্থীদের ফলাফল নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। ২০২৫ সালের আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী মূল্যায়ন কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী, সামগ্রিক শিক্ষাগত পারফরম্যান্সে ফ্রান্সের শিক্ষার্থীরা অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থাভুক্ত (ওইসিডি) অন্যান্য দেশের শিক্ষার্থীদের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে।
এদিকে ফ্রান্সের চলমান বিক্ষোভকে অভিবাসন ও ইসলাম প্রসঙ্গের সঙ্গে যুক্ত করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি ফ্রান্সের পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণহীন অভিবাসনের প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
ফ্রান্সে আগামী বসন্তে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হওয়ার কথা। এর আগে দেশটির রাজনীতিতে ডান ও বাম উভয় ধারার জনতুষ্টিবাদী দলগুলোর সমর্থন বাড়ছে। এই রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেই শিক্ষার্থীদের আন্দোলন সরকারকে নতুন করে চাপের মুখে ফেলেছে।








মন্তব্য