রাশিয়ার প্রতিদিনের হামলা কিয়েভের বাসিন্দাদের জীবনকে আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তায় ভরে তুলছে। স্কুল, হাসপাতাল, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে আবাসিক এলাকা—কোনো কিছুই হামলার বাইরে থাকছে না।
কিয়েভের বাসিন্দা ভ্যালেরিয়া তাকাচেঙ্কো ছেলেকে স্কুলে দিতে গিয়েছিলেন। হঠাৎ বিমান হামলার সতর্কতা জারি হলে স্কুলের শিক্ষকরা শিশু ও অভিভাবকদের আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে যান। সেখানে ছেলেকে নিয়ে প্রায় দুই ঘণ্টা কাটান তিনি।
ভ্যালেরিয়া বলেন, সারাদিন তার ভয় হয় ছেলের কী হতে পারে। আগের দিনই কাছের একটি স্কুলে রুশ জেটচালিত ড্রোন আঘাত হেনেছিল। এমন পরিস্থিতিতে কোনো কিছুই আর পরিকল্পনা করে করা সম্ভব হচ্ছে না।
কিয়েভের আরেক বাসিন্দা আর্তেম মার্চেঙ্কো শুক্রবার সকালে কাজে যাওয়ার সময় গাড়ি ফেলে হেঁটে পিভদেনি সেতু পার হন। রুশ হামলায় সেতুটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তাকে প্রায় ২০ মিনিট হেঁটে যেতে হয়।
তার আশঙ্কা, কিয়েভের অন্য সেতুগুলোতেও হামলা হলে প্রায় ৩০ লাখ মানুষের এই শহরের যোগাযোগব্যবস্থা অচল হয়ে যেতে পারে। ডিনিপ্রো নদী কিয়েভকে দুই ভাগে বিভক্ত করেছে।
কিয়েভের মেয়র ভিতালি ক্লিচকো বলেছেন, রাজধানীর পরিস্থিতি খুবই ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। এখন আর শান্তিকালীন জীবনের মতো করে চলার ভান করার সুযোগ নেই। ‘শত্রু কিয়েভকে ধ্বংস করে দিচ্ছে’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
গত কয়েক দিনে রুশ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় কিয়েভের বিভিন্ন অফিস, তথ্যকেন্দ্র, স্কুল, হাসপাতাল এবং গুরুত্বপূর্ণ একটি সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হামলা শুরু হয়েছে বিদ্যুৎ অবকাঠামোতেও। একটি তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রসহ বিভিন্ন জ্বালানি স্থাপনায় হামলার পর শহরের কয়েকটি এলাকায় বিদ্যুৎ ও পানির সরবরাহও বন্ধ হয়ে যায়।
এর আগে কিয়েভে জীবনযাত্রা তুলনামূলক স্বাভাবিক ছিল। রুশ হামলার বড় ধাক্কা সামলাচ্ছিল খারকিভ ও দিনিপ্রোর মতো সামনের সারির শহরগুলো। এখন সেই চাপ কিয়েভের দিকে বাড়ছে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছেন, রাশিয়া কিয়েভের মানুষকে রাজধানী ছাড়তে বাধ্য করতে চাইছে। তার মতে, রাজধানী ছাড়া কোনো দেশ নেই; এমন বার্তা দেওয়াই রাশিয়ার অন্যতম লক্ষ্য হতে পারে।
শহরটির জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে আকাশ প্রতিরক্ষায় প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাটতির কারণে। একই সময়ে রাশিয়া দ্রুতগতির নতুন ধরনের জেটচালিত ড্রোন ব্যবহার করছে, যেগুলো ঠেকানো তুলনামূলক কঠিন।
কিয়েভ এখন এসব ড্রোন মোকাবিলায় নতুন ধরনের প্রতিরোধী ড্রোন দ্রুত মোতায়েনের চেষ্টা করছে। তবে এগুলো প্রয়োজনীয় মাত্রায় ব্যবহার করতে আরও কয়েক সপ্তাহ বা মাস সময় লাগতে পারে বলে প্রতিরক্ষা খাতের কয়েকটি সূত্র জানিয়েছে।
ইউক্রেনের জ্বালানিমন্ত্রী ডেনিস শমিহাল ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের রাশিয়ার সম্ভাব্য বড় ধরনের হামলার বিষয়ে সতর্ক করেছেন। নিউইয়র্ক টাইমসের বরাত দিয়ে দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, রাশিয়া ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোয় একসঙ্গে প্রায় ১ হাজার ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও বোমা ব্যবহার করার পরিকল্পনা করেছে বলে ইউক্রেনের কাছে তথ্য রয়েছে।
এ ধরনের হামলার লক্ষ্য হতে পারে বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র, জলবিদ্যুৎ ও তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র এবং বয়লার হাউস। এর ফলে ইউক্রেনের শহরগুলোতে বিদ্যুৎ ও তাপ সরবরাহ বন্ধ হয়ে মানবিক সংকট তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
কিয়েভে থাকা এক পশ্চিমা কূটনীতিক বলেন, রাশিয়া কিয়েভকে এমনভাবে ঠান্ডা ও অন্ধকারে ঠেলে দিতে চাইছে, যাতে শহরটি ভয়াবহ সংকটে পড়ে।
রাশিয়ার হামলা বাড়লেও পশ্চিমা কূটনীতিকেরা প্রকাশ্যে কিয়েভ ছাড়ার পরিকল্পনা নেই বলে জানিয়েছেন। তবে পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে দূতাবাসগুলো লভিভ বা পূর্ব পোল্যান্ডে সরিয়ে নেওয়ার জন্য গোপনে প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বলেও দুই জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক জানিয়েছেন।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান








মন্তব্য