দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তি কম্পিউটার শিখিয়ে গড়ছেন নিজের পরিচয়
দৃষ্টিশক্তি হারানোর পরও তিনি ১১ বছর ধরে শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন
মেহেরপুর জেলা প্রতিনিধি · মুজিবনগর, মেহেরপুর
প্রকাশ:
৩৬ বছর বয়সী ওমর ফারুক মামুন, দুই চোখে দেখতে পান না, মেহেরপুরের মুজিবনগর উপজেলার মোনাখালী ইউনিয়নের শিবপুর গ্রামের বাসিন্দা। তাঁর পরিবার সচ্ছল হলেও নিজের পরিচয় গড়ে তোলার তাগিদে তিনি নিজের যোগ্যতায় কিছু করতে চেয়েছেন এবং এখন কম্পিউটার প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করছেন।
বিজ্ঞাপন
নবম শ্রেণিতে গ্লুকোমা ধরা পড়ে তার দৃষ্টিশক্তি হারাতে শুরু করে; চিকিৎসা সত্ত্বেও দৃষ্টি পুনরুদ্ধার করা যায়নি। ২০০৪ সালে তিনি এসএসসি পাস করেন, উচ্চমাধ্যমিক বিজ্ঞান বিভাগে পুরোপুরি দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ২০০৬ সালে এইচএসসি পরীক্ষা দিতে পারেননি, তবে দীর্ঘ বিরতির পরে ২০১২ সালে এইচএসসি পাস করেন এবং ২০১৮ সালে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ডিগ্রি অর্জন করেন।
দৃষ্টিশক্তি না থাকায় কম্পিউটার শেখা তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ ছিল, তবে ইউটিউবের সাহায্যে তিনি হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যার সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করেন এবং অনুশীলনের মাধ্যমে টাইপিং ও বিভিন্ন কম্পিউটার কার্যপ্রণালী শিখে নেন।
২০১৩ সালে মেহেরপুরের সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে তিনি কম্পিউটারের ওপর প্রশিক্ষণ নেন এবং ২০১৫ সালের ৭ জুলাই সমাজসেবা অধিদপ্তর তাকে খণ্ডকালীন প্রশিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেয়। বর্তমানে তিনি মেহেরপুরের সমাজসেবা কার্যালয়ে খণ্ডকালীন কম্পিউটার প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে, যেখানে তিনি নিজের শেখা বিষয়গুলো হাতে-কলমে অন্যান্যদের প্রশিক্ষণ দেন।
শিবপুর গ্রামের বাসিন্দা ও ওমর ফারুকের শৈশবের বন্ধু তৌফিকুল ইসলাম বলেন, "ওমর ফারুক তাঁর বন্ধু ও সহপাঠী। তাঁদের বন্ধুদের মধ্যে কেবল তিনি-ই চোখে দেখেন না। তা সত্ত্বেও অন্ধত্বকে জয় করে তিনি–ই সবার চেয়ে এগিয়ে গেছেন। যেখানে তাঁদের অনেক বন্ধু মাধ্যমিকের গণ্ডিও পার হতে পারেননি—কেউ পড়াশোনা ছেড়ে ব্যবসায় বা কৃষিকাজে যোগ দিয়েছেন, সেখানে ওমর ফারুক নিজের অদম্য চেষ্টায় আজ একজন সফল কম্পিউটার প্রশিক্ষক হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলেছেন।"
বিজ্ঞাপন
ওমর ফারুকের মতে দৃষ্টিশক্তি হারানোর পর জীবনের বাস্তবতা কঠিন হলেও তিনি আত্মনির্ভরশীলতার অর্থকে শুধু নিজের কাজ নিজে করা নয়, নিজের যোগ্যতা দিয়ে সমাজে একটি অবস্থান তৈরি করা হিসেবে দেখেন; এই পথচলায় গর্বিত তাঁর মা খাদিজা খাতুন, যিনি বলেন যে দৃষ্টিশক্তি হারানো ছেলের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া, কম্পিউটার প্রশিক্ষণ নেওয়া এবং সেই দক্ষতা দিয়ে অন্যদের প্রশিক্ষণ দেওয়া তার জন্য আনন্দ ও অনুপ্রেরণা।
মেহেরপুরের সমাজসেবা কর্মকর্তা সোহেল মাহমুদ জানান, "ওমর ফারুক দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হওয়া সত্ত্বেও শিক্ষার্থীদের ১১ বছর ধরে নিরলসভাবে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন, যা ভাবতেও অবাক লাগে। তাঁর প্রশিক্ষণের ধরন দেখে কেউ বুঝতেই পারবে না, তিনি চোখে দেখেন না। কেবল কি–বোর্ডের আওয়াজ শুনেই তিনি বুঝে নিতে পারেন কী শব্দ ও বাক্য লেখা হচ্ছে।" তিনি আরও উল্লেখ করেন যে ওমর ফারুককে স্থায়ী কম্পিউটার প্রশিক্ষক করার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি প্রেরণের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
দৃষ্টিশক্তি হারানোর পরেও ওমর ফারুকের অদম্য ইচ্ছাশক্তি তাকে নিজস্ব পথে এগিয়ে নিয়ে গেছে এবং তার গল্প অন্য দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য প্রেরণার উদাহরণ হয়ে আছে।