মিথ্যা ধর্ষণ মামলায় এক মাসের বেশি কারাভোগ এবং পরে ডিএনএ পরীক্ষায় নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ার পরও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি ফেনীর ইমাম Mozaffar Ahmed। দীর্ঘ কারাভোগ ও সামাজিক অপমানের মানসিক চাপ তাকে গুরুতর মানসিক বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিয়েছে। বর্তমানে তাকে ঢাকার National Institute of Mental Health-এ নেওয়া হয়েছে।
ফেনীর পরশুরাম উপজেলার বক্সমাহমুদ ইউনিয়নের টেটেশ্বর গ্রামের এক কিশোরীকে ধর্ষণের মামলায় অভিযুক্ত হয়ে ৩২ দিন কারাভোগ করেন মোজাফফর আহমদ। পরে ডিএনএ পরীক্ষায় কিশোরীর সন্তানের সঙ্গে তার কোনো জৈবিক সম্পর্ক না পাওয়ায় আদালত তাকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেয়।
বৃহস্পতিবার (১৪ মে) জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম সদস্য সচিব Tareq Reza তার ফেসবুক পোস্টে মোজাফফরের সর্বশেষ অবস্থার কথা তুলে ধরেন।
পোস্টে তিনি লেখেন, “জেলে থাকা অবস্থায় তিনি আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন এবং দেয়ালে মাথা ঠুকে আহত হয়েছিলেন। কিন্তু তিনি যে ভয়াবহ সাইকোসিস বা মানসিক ভারসাম্যহীনতার শিকার হয়েছেন, তা আমাদের জানা ছিল না।”
তারেক রেজা জানান, মোজাফফরকে তার ছোট ভাই ইমনের বাসায় রাখা হয়েছিল। সেখানে পৌঁছানোর কিছুক্ষণ পর তিনি আচমকা আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন। বাসার জিনিসপত্র ভাঙচুরের পাশাপাশি ইমন ও ইফতি নামের দুজনকে মারধর ও কামড় দেন। এমনকি পাশের ফ্ল্যাটের এক বাসিন্দাকেও আঘাত করার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ করা হয়।
তিনি আরও জানান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে তাকে বেঁধে ফেলা হয় এবং জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করে পুলিশের সহায়তা চাওয়া হয়।
পরে পুলিশের সহায়তায় মোজাফফরকে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে নেওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা ও ইনজেকশন দেওয়ার পর তিনি ঘুমিয়ে পড়েন বলে জানান তারেক রেজা।
তিনি বলেন, “জাতীয় পরিচয়পত্র ও আইনগত অভিভাবক না থাকায় তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে ভর্তি করানো যাচ্ছে না। পরিবারের সদস্যরা পৌঁছালে দ্রুত ভালো হাসপাতালে ভর্তি করানোর চেষ্টা করা হবে।”
পোস্টে চিকিৎসক Saidul Ashraful Kushal-এর প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানান তারেক রেজা। তিনি দাবি করেন, ওই চিকিৎসক মোজাফফরকে আজীবন বিনামূল্যে চিকিৎসা দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।
যেভাবে ফাঁসানো হয়েছিল মোজাফফরকে
মামলার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ২৪ নভেম্বর স্থানীয় মক্তব শিক্ষক ও ইমাম মোজাফফর আহমদের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ আনে এক কিশোরীর পরিবার। গ্রেপ্তারের পর তিনি টানা ৩২ দিন কারাগারে ছিলেন।
এ সময় শুধু কারাভোগই নয়, সামাজিকভাবে অপমানের পাশাপাশি তিনি মসজিদের ইমামতি এবং Islamic Foundation Bangladesh-এর চাকরিও হারান।
তদন্তে সিআইডির ফরেনসিক পরীক্ষায় প্রমাণ হয়, অভিযোগের সঙ্গে মোজাফফরের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। পরে কিশোরী স্বীকার করে, তার বড় ভাই মোরশেদ দীর্ঘদিন ধরে তাকে যৌন নির্যাতন করছিলেন।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, পরিবারের সম্মান রক্ষার জন্য এবং প্রকৃত ঘটনা আড়াল করতে পরিকল্পিতভাবে নির্দোষ শিক্ষক মোজাফফরকে মামলায় ফাঁসানো হয়েছিল।
গত ১৭ এপ্রিল আদালতে জমা দেওয়া চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদনে মোজাফফরকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয় এবং মোরশেদকে প্রধান অভিযুক্ত করা হয়।
পরবর্তীতে ডিএনএ পরীক্ষায় কিশোরীর সন্তানের সঙ্গে মোরশেদের ৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ মিল পাওয়া যায়। এতে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত হয়, শিশুটির জৈবিক পিতা মোরশেদই।
পরে পুলিশ মোরশেদকে গ্রেপ্তার করে। বর্তমানে তিনি কারাগারে রয়েছেন।
— পত্রিকা একাত্তর

