দরিদ্র পরিবার শনাক্তকরণ ও জরিপ নিয়ে জনমনে প্রশ্ন
দরিদ্র মানুষ শনাক্ত করতে ২০১০ কোটি টাকা ব্যয়ের খবরে জনমনে নানা প্রশ্ন
নিজস্ব প্রতিবেদক · ঢাকা
প্রকাশ:
মোবাইলে ইন্টারনেট থাকে, হাঁড়িতে ভাত থাকে না। দুটো সংযোগ একসঙ্গে চালু রাখার সামর্থ্য নেই। দেশে দরিদ্র মানুষ আছে, এটা সবাই জানে। কিন্তু তাদের খুঁজে বের করতেও যে এত আয়োজন লাগে, তা কি তারা জানে? ‘দরিদ্র খুঁজতেই ২০১০ কোটি’—এমন শিরোনাম দেখে এক দরিদ্র মানুষ পকেট হাতড়ে বললেন, ‘পকেটে ১০ টাকা নেই, অথচ আমাকে খুঁজতেই এত টাকা! আমি কি দরিদ্র, নাকি হারিয়ে যাওয়া কোনো ভিআইপি?’
বিজ্ঞাপন
পাশের আরেকজন বললেন, ‘চুপ! জীবনে প্রথমবার তোর দাম উঠেছে। এত টাকা খরচ করে তোকে খোঁজা হচ্ছে!’ লোকটি জানতে চাইলেন, ‘কত দাম?’ উত্তরে বলা হলো, ‘সেটা জানতে আবার জরিপ হবে।’
পরদিন লোকটির বাড়িতে হাজির জরিপকারী। হাতে ফরম, কাঁধে ব্যাগ, মুখে গুরুগম্ভীর ভাব। দেখে মনে হলো, দরিদ্র খুঁজতে নয়, আন্তর্জাতিক কোনো রহস্যের জট খুলতে এসেছেন। জরিপকারী প্রশ্ন করলেন, ‘আপনার মাসিক আয় কত?’ লোকটি পাল্টা প্রশ্ন করলেন, ‘কোন মাসের?’ তিনি ব্যাখ্যা করেন, ‘কোনো মাসে কাজ পাই, কোনো মাসে পাই না। যে মাসে পাই, সে মাসেও পুরো টাকা পাই না। আপনি মাস ঠিক করুন, আমি আয় বলি।’
জরিপকারী ফরমের দিকে তাকালেন। সেখানে আয়ের ঘর আছে, কিন্তু ‘আয় কখনো আসে, কখনো আসে না’—এমন জটিল পরিস্থিতির জন্য আলাদা ঘর নেই। জরিপকারী ফরমে লিখলেন, ‘আয় অনিয়মিত।’ মাসিক ব্যয়ের প্রশ্নে লোকটি বললেন, ‘আয়ের চেয়ে বেশি।’ সঞ্চয়ের বিষয়ে বললেন, ‘মাসের শেষে ধার।’ জরিপকারী একটু থেমে লিখলেন, ‘দারিদ্র্যের বহুমাত্রিকতা।’ লোকটি তখন বললেন, ‘দারিদ্র্য তো একটাই—পেটে ভাত নেই। এত মাত্রা যোগ করলে হাঁড়িতে ভাত বাড়বে?’ জরিপকারী উত্তর দিলেন না, কারণ প্রশ্নটি তাঁর ফরমে ছিল না।
জরিপকারী জানতে চাইলেন, ‘আপনার মোবাইল আছে?’ লোকটি জানালেন আছে। স্মার্টফোন কি না জানতে চাইলে তিনি হ্যাঁ সূচক উত্তর দেন। জরিপকারীর চোখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, কারণ লোকটি প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত। ইন্টারনেট ব্যবহারের প্রশ্নে লোকটি জানান, ফ্রি ওয়াই-ফাই পেলে ব্যবহার করেন। নিজে ডেটা কেনেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কিনি। তবে ডেটা কেনার পর বাজারে কী কিনব, সেটা নিয়ে একটু সমস্যা হয়।’ কী সমস্যা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মোবাইলে ইন্টারনেট থাকে, হাঁড়িতে ভাত থাকে না। দুটো সংযোগ একসঙ্গে চালু রাখার সামর্থ্য নেই।’ জরিপকারী বুঝলেন, ডিজিটাল সংযোগ আর আর্থিক সচ্ছলতা এক জিনিস নয়।
বিজ্ঞাপন
এরপর জরিপকারী জানতে চাইলেন টেলিভিশন, ফ্রিজ ও বাড়ির বিষয়ে। লোকটি জানান, টেলিভিশন ছিল কিন্তু নষ্ট হয়ে গেছে। সারাননি কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সারালে খবর দেখতে পারব। কিন্তু খবর দেখে তো বাজারের বাকি শোধ হবে না।’ ফ্রিজ নেই এবং বাড়ি ভাড়া বলে জানান তিনি। সব তথ্য লিখে জরিপকারী জানালেন, এবার তথ্য যাচাই হবে। লোকটি অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘ঘরে চাল নেই, সেটা আবার যাচাই করবেন কীভাবে?’ জরিপকারী জানালেন, ‘প্রক্রিয়া আছে। আগে তথ্য সংগ্রহ, তারপর যাচাই, বিশ্লেষণ।’ লোকটি মন্তব্য করেন, ‘চাল থাকলে ভাত হতো। এখন চাল নেই, তাই প্রক্রিয়া হজম করছি!’
লোকটি আরও বলেন, ‘ভাই, আমার রান্নাঘরে এসে হাঁড়ির ঢাকনা খুললেই তো হবে। এত শ্রেণিবিন্যাস করলে আমার দারিদ্র্য কি পদোন্নতি পাবে?’ জরিপকারী বোঝালেন, সবাইকে একইভাবে দরিদ্র বলা যায় না। কেউ দরিদ্র, কেউ অতিদরিদ্র, কেউ ঝুঁকিপূর্ণ, কেউ আবার দরিদ্র হওয়ার ঝুঁকিতে। লোকটি জানতে চাইলেন, ‘আমি কোন শ্রেণিতে?’ জরিপকারী জানান, তথ্য বিশ্লেষণের পর জানা যাবে। লোকটি বলেন, ‘আমার ঘরে তিন দিন ধরে চাল নেই। এটা কোন শ্রেণি?’ জরিপকারী উত্তর দেন, ‘সেটাও যাচাই করতে হবে।’ লোকটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, ‘আমার দারিদ্র্যের ধরন প্রতিদিন একই। শুধু বাজারের দর বদলায়!’
এত প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার পর লোকটির মনে আশা জাগল, এবার নিশ্চয়ই কিছু একটা হবে। তিনি জানতে চাইলেন, ‘আমাকে খুঁজে পেলে কী হবে?’ জরিপকারী জানান, তথ্যের ভিত্তিতে দারিদ্র্য বিমোচনের পরিকল্পনা করা হবে। কবে জানতে চাইলে জরিপকারী বলেন, তথ্য বিশ্লেষণের পর। এরপর প্রতিবেদন তৈরি, সুপারিশ ও বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে। লোকটি মাথা চুলকে বললেন, ‘আপনাদের ধাপ এত বেশি যে আমার দারিদ্র্য এক ধাপ থেকে আরেক ধাপে যেতে যেতেই অবসরে চলে যাবে!’ জরিপকারী বললেন, ‘আপনি বিষয়টিকে হাস্যরসের সঙ্গে নিচ্ছেন।’ লোকটি বললেন, ‘না ভাই, পেটের সঙ্গে নিচ্ছি। পেটকে পরিকল্পনা খাওয়াতে পারি না, প্রতিবেদন খাওয়াতে পারি না। পেট শুধু ভাত চেনে।’ জরিপকারী কলম বন্ধ করলেন, কারণ এই উত্তরটি ফরমে লেখার জায়গা নেই।
দরিদ্র মানুষকে সঠিকভাবে শনাক্ত করা জরুরি। না হলে সহায়তা ভুল মানুষের কাছে যেতে পারে। কিন্তু শনাক্ত হওয়ার পর তাঁর জীবনে কী বদল আসবে, সেটিও তো জরুরি। লোকটি জানতে চাইলেন, ‘তালিকায় নাম উঠলে দোকানদার কি বাকি দেবে?’ জরিপকারী জানালেন, ‘তা বলতে পারছি না।’ বাড়িওয়ালা ভাড়া মওকুফ করবেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সেটা আমার দায়িত্ব নয়।’ অসুখ হলে চিকিৎসা মিলবে কি না জানতে চাইলে জরিপকারী জানান, এটা অন্য বিষয়। লোকটি মাথা নাড়লেন, ‘বুঝেছি। আপনাদের দায়িত্ব আমাকে খুঁজে বের করা, আর আমার দায়িত্ব দারিদ্র্য নিয়ে বেঁচে থাকা!’
বিজ্ঞাপন
জরিপকারী চলে যাওয়ার পর লোকটি দরজায় একটি কাগজ ঝুলিয়ে দিলেন। তাতে লেখা—‘দরিদ্র মানুষ পাওয়া গেছে। এবার দারিদ্র্যটাকে খুঁজে বের করে বিদায় করুন।’ নিচে আরও লিখলেন, ‘আমাকে খুঁজতে ২০১০ কোটি টাকার কথা শুনেছি। এবার জানতে চাই, আমাকে পাওয়ার পর দারিদ্র্য দূর করতে কত লাগবে?’ শেষে একটি নোট লিখলেন, ‘আমাকে খুঁজে পেতে এত আয়োজন দেখে খুশি হয়েছি। তবে অনুরোধ, আমাকে পাওয়ার পর যেন আবার নতুন জরিপ শুরু না হয়—আমার দারিদ্র্য দূর করতে কত টাকা লাগবে, সেটা জানার জন্য!’