শবে কদরের নামাজের নিয়ম, নিয়ত ও এ রাতের বিশেষ আমল
ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশ:
শবে কদরের জন্য আলাদা কোনো নামাজ, নির্দিষ্ট রাকাত সংখ্যা বা প্রতি রাকাতে নির্দিষ্ট সূরা নির্দিষ্টবার পড়ার নিয়ম কোরআন বা সহিহ হাদিসে নেই। এ রাতে যে নামাজ পড়া হয়, তা সাধারণ নফল নামাজ: দুই রাকাত করে, প্রতি রাকাতে সূরা ফাতিহার পর যেকোনো সূরা, যত রাকাত সামর্থ্য ও মনোযোগ থাকে। এটিই শবে কদরের নামাজের নিয়ম।
বিজ্ঞাপন
হাদিসে এ রাতের যে আমলের কথা জোর দিয়ে বলা হয়েছে, তা হলো কিয়াম, অর্থাৎ রাত জেগে ইবাদত। বুখারি ও মুসলিমে আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত:
যে ব্যক্তি ইমানের সঙ্গে ও সওয়াবের আশায় কদরের রাতে কিয়াম করে, তার আগের গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়। (বুখারি, মুসলিম)
কিয়ামের মধ্যে নফল নামাজ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সঙ্গে কোরআন তেলাওয়াত, জিকির, দোয়া ও ইস্তিগফার। নিচে নামাজ পড়ার পদ্ধতি, নিয়ত, প্রচলিত কিছু ভুল ধারণা এবং পুরো রাতটি কীভাবে সাজাতে পারেন, তা ধাপে ধাপে দেওয়া হলো।
শবে কদরের নফল নামাজ পড়ার নিয়ম
বিজ্ঞাপন
১. অজু ও প্রস্তুতি: পরিষ্কার কাপড় পরে অজু করুন। মসজিদে বা ঘরের নিরিবিলি কোণে জায়নামাজ বিছিয়ে নিন। মোবাইল নীরব রাখুন।
২. নিয়ত: মনে মনে বলুন, আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করছি। শবে কদরের নামাজ বলে আলাদা নিয়তের প্রয়োজন নেই; এ রাতে পড়া যেকোনো নফলই এ রাতের ইবাদত।
৩. প্রথম রাকাত: তাকবিরে তাহরিমা বলে হাত বাঁধুন, সানা পড়ুন, তারপর আউজুবিল্লাহ, বিসমিল্লাহ, সূরা ফাতিহা ও যেকোনো সূরা। রুকু, কওমা ও দুই সিজদা ধীরস্থিরভাবে করুন।
৪. দ্বিতীয় রাকাত ও সালাম: একইভাবে ফাতিহা ও সূরা পড়ে রুকু-সিজদা শেষে বসে তাশাহুদ, দরুদ ও দোয়া মাসুরা পড়ে সালাম ফেরান।
বিজ্ঞাপন
৫. আবার শুরু: এভাবে দুই রাকাত করে যত রাকাত ইচ্ছা পড়ুন। প্রতি দুই বা চার রাকাত পর কিছুক্ষণ বসে দোয়া ও জিকির করতে পারেন।
যাঁরা লম্বা সূরা জানেন না, তাঁরা ছোট সূরাগুলোই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে পড়ুন। একই সূরা বারবার পড়লেও নামাজ হয়ে যায়। কেরাতের দৈর্ঘ্যের চেয়ে রুকু-সিজদায় মনোযোগ ও স্থিরতা বেশি জরুরি। সিজদা বান্দা ও আল্লাহর সবচেয়ে কাছের মুহূর্ত, নফল নামাজের সিজদা একটু দীর্ঘ করতে পারেন।
শবে কদর নামাজ কত রাকাত
কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা নেই। দুই রাকাত থেকে শুরু করে সারা রাত যত রাকাত পারেন। আয়েশা (রা.)-এর বর্ণনা অনুযায়ী নবী (সা.) রাতের নামাজ সাধারণত বিতরসহ এগারো রাকাত পড়তেন, তবে প্রতিটি রাকাত হতো দীর্ঘ। রমজানের শেষ দশকে তিনি অন্য সময়ের চেয়ে বেশি পরিশ্রম করতেন। বুখারি ও মুসলিমে আয়েশা (রা.) বলেছেন, শেষ দশক এলে নবী (সা.) কোমর বেঁধে নিতেন, রাত জাগতেন এবং পরিবারকেও জাগিয়ে দিতেন।
বিজ্ঞাপন
বিভিন্ন বই ও প্রচারপত্রে শবে কদরের নামাজের কিছু বিশেষ পদ্ধতি পাওয়া যায়, যেমন বারো রাকাত, প্রতি রাকাতে সূরা কদর এতবার আর সূরা ইখলাস এতবার, এবং এর বিনিময়ে অমুক অমুক সওয়াব। এসব নির্দিষ্ট পদ্ধতি ও প্রতিশ্রুতির পক্ষে নির্ভরযোগ্য কোনো হাদিস নেই বলে মুহাদ্দিসরা জানিয়েছেন। নামাজ পড়তে বাধা নেই, কারণ নফল নামাজে যেকোনো সূরা যতবার ইচ্ছা পড়া যায়। কিন্তু সেই পদ্ধতিকে বাধ্যতামূলক মনে করা বা বানানো সওয়াবের ওপর ভরসা করা ঠিক নয়।
কোন রাতে নামাজ পড়বেন
বুখারিতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেছেন, তোমরা রমজানের শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোতে কদরের রাত তালাশ করো। ইসলামি দিন শুরু হয় সূর্যাস্ত থেকে। তাই বিশ রমজানের ইফতারের পর যে রাত আসে, সেটিই একুশতম রাত। এভাবে তেইশ, পঁচিশ, সাতাশ ও ঊনত্রিশতম রাত বেজোড় রাত।
বাংলাদেশে সাধারণত ছাব্বিশ রমজান দিবাগত রাত, অর্থাৎ সাতাশতম রাতকে শবে কদর হিসেবে পালন করা হয়। এই রাতে কদর হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে সাহাবি উবাই ইবনে কাব (রা.)-এর জোরালো মত মুসলিম শরিফে আছে। তবে নিশ্চিতভাবে কোনো একটি রাতকে নির্দিষ্ট করা হয়নি। তাই শুধু সাতাশের রাতে সব আশা রেখে বাকি বেজোড় রাতগুলো অবহেলা করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। শেষ দশকের প্রতিটি রাতেই কিছু না কিছু ইবাদত করুন।
বিজ্ঞাপন
নামাজের পাশাপাশি এ রাতের বিশেষ আমল
১. এশা ও ফজর জামাতে: মুসলিম শরিফে উসমান (রা.) থেকে বর্ণিত, যে এশার নামাজ জামাতে পড়ল, সে যেন অর্ধেক রাত ইবাদত করল; আর যে ফজরও জামাতে পড়ল, সে যেন পুরো রাত ইবাদত করল। সারা রাত জেগে ফজর জামাত হারানো তাই বড় ক্ষতি।
২. কোরআন তেলাওয়াত: এই রাতেই কোরআন নাজিল হয়েছে। তেলাওয়াতের পাশাপাশি অর্থ পড়ুন, সম্ভব হলে কোনো তাফসির থেকে সূরা কদরের ব্যাখ্যা পড়ুন।
৩. ক্ষমা প্রার্থনার দোয়া: আয়েশা (রা.) জানতে চেয়েছিলেন, কদরের রাত পেলে কী বলবেন। নবী (সা.) শিখিয়েছিলেন: আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন তুহিব্বুল আফওয়া ফাফু আন্নি (তিরমিজি)। অর্থ: হে আল্লাহ, আপনি ক্ষমাশীল, ক্ষমা করতে ভালোবাসেন, অতএব আমাকে ক্ষমা করুন।
বিজ্ঞাপন
৪. জিকির ও দরুদ: সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহু আকবার এবং দরুদ শরিফ বেশি বেশি পড়ুন।
৫. নিজের ভাষায় দোয়া: নিজের, মা-বাবার, পরিবারের, মৃত আত্মীয়দের এবং দেশ ও উম্মাহর জন্য দোয়া করুন। একটি ছোট তালিকা আগে থেকে লিখে রাখলে কারও নাম বাদ পড়বে না।
৬. ইতিকাফ ও দান: শেষ দশকে মসজিদে ইতিকাফ করা সুন্নত; নবী (সা.) প্রতি বছর শেষ দশকে ইতিকাফ করতেন (বুখারি, মুসলিম)। যাঁরা ইতিকাফে নেই, তাঁরা এ রাতগুলোতে সামর্থ্য অনুযায়ী দান করতে পারেন।
রাতটি যেভাবে সাজাতে পারেন
বিজ্ঞাপন
পুরো রাত জাগতে না পারলেও হতাশ হওয়ার কিছু নেই। একটি সহজ পরিকল্পনা এমন হতে পারে: ইফতারের পর একটু বিশ্রাম, তারপর এশা ও তারাবি জামাতে। এরপর এক-দেড় ঘণ্টা তেলাওয়াত, জিকির ও কয়েক রাকাত নফল। মাঝরাতে কিছুক্ষণ ঘুম। শেষ রাতে উঠে তাহাজ্জুদ, দোয়া ও ইস্তিগফার, তারপর সেহরি এবং ফজর জামাতে।
পরিবারের সবাইকে যুক্ত করুন। শিশুদের সঙ্গে কোরআনের ছোট সূরা পড়ুন, তাদের দোয়াটি শিখিয়ে দিন। নারীরা ঘরে নিরিবিলি নামাজ ও দোয়ায় সময় দিন। ঋতুস্রাবের দিনগুলোতে নামাজ না পড়লেও জিকির, দরুদ, দোয়া ও ইস্তিগফারে এ রাতের সওয়াব থেকে বঞ্চিত হবেন না।
এ রাতে আতশবাজি, আলোকসজ্জা, অযথা ঘোরাঘুরি বা দলবেঁধে আড্ডার কোনো ভিত্তি নেই। এগুলো বরং ইবাদতের মনোযোগ নষ্ট করে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
বিজ্ঞাপন
শবে কদরের নামাজ কি জামাতে পড়া যায়?
হানাফি মাজহাবে তারাবি ছাড়া নফল নামাজ লোক ডেকে জামাতে পড়া মাকরুহ। তাই শবে কদরের নফল একা পড়াই নিয়ম।
শবে কদরের নিয়ত কী?
আলাদা কোনো নিয়ত নেই। দুই রাকাত নফল নামাজের সাধারণ নিয়ত করলেই হয়। মুখে বলা জরুরি নয়।
বিজ্ঞাপন
কাজা নামাজ বাকি থাকলে কি নফল পড়ব?
যাঁর অনেক কাজা নামাজ বাকি, আলেমরা তাঁকে নফলের চেয়ে কাজা আদায়কে অগ্রাধিকার দিতে বলেন। চাইলে রাতের একটি অংশে কাজা, আরেকটি অংশে নফল পড়তে পারেন।
শবে কদরে তাহাজ্জুদ ও নফল কি আলাদা?
রাতের শেষ ভাগে ঘুম থেকে উঠে পড়া নফলই তাহাজ্জুদ। শবে কদরে আলাদা করে দুই রকম নামাজ পড়ার দরকার নেই; রাতের যেকোনো নফলই কিয়ামের অংশ।