ঘুমানোর দোয়া ও ঘুম থেকে ওঠার দোয়া: আরবি, উচ্চারণ ও অর্থ
ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশ:
ঘুমের আগে বিছানায় শুয়ে নবী (সা.) বলতেন, বিসমিকা আল্লাহুম্মা আমুতু ওয়া আহইয়া, অর্থাৎ হে আল্লাহ, আপনার নামেই মৃত্যুবরণ করি এবং জীবিত হই। আর ঘুম থেকে উঠে বলতেন, আলহামদু লিল্লাহিল্লাজি আহইয়ানা বাদা মা আমাতানা ওয়া ইলাইহিন নুশুর, অর্থাৎ সব প্রশংসা আল্লাহর, যিনি মৃত্যুর পর আমাদের জীবিত করলেন, আর তাঁর কাছেই ফিরে যেতে হবে। দুটি দোয়াই সহিহ বুখারিতে হুজাইফা (রা.) থেকে বর্ণিত।
বিজ্ঞাপন
দোয়া দুটির শব্দ খেয়াল করুন। ঘুমকে এখানে মৃত্যুর সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে, আর জেগে ওঠাকে নতুন জীবনের সঙ্গে। কোরআনেও আল্লাহ বলেছেন, তিনি মৃত্যুর সময় প্রাণ হরণ করেন, আর যারা মরেনি তাদের প্রাণও ঘুমের সময় নিয়ে নেন (সূরা জুমার, আয়াত ৪২)। প্রতিটি সকাল তাই একটি নতুন সুযোগ, আর প্রতিটি রাত শেষ বিদায়ের মহড়া।
এই দুটি ছোট দোয়ার বাইরেও ঘুমানোর আগে কয়েকটি সূরা, আয়াত ও জিকির পড়ার কথা হাদিসে এসেছে। নিচে সেগুলো আরবি, উচ্চারণ ও অর্থসহ সাজানো হলো, সঙ্গে ঘুমের কিছু সুন্নত আদব।
ঘুমানোর দোয়া
بِاسْمِكَ اللَّهُمَّ أَمُوتُ وَأَحْيَا
বিজ্ঞাপন
বাংলা উচ্চারণ: বিসমিকা আল্লাহুম্মা আমুতু ওয়া আহইয়া।
অর্থ: হে আল্লাহ, আপনার নামেই আমি মৃত্যুবরণ করি এবং আপনার নামেই জীবিত হই।
আমাদের দেশে অনেকে আল্লাহুম্মা বিসমিকা আমুতু ওয়া আহইয়া পড়েন। শব্দের ক্রমে সামান্য তফাত, অর্থ একই। হাদিসের বিভিন্ন বর্ণনায় এমন কাছাকাছি শব্দ এসেছে, তাই যেকোনোটি পড়লে সুন্নত আদায় হবে।
ঘুমানোর আগে আরেকটি ছোট দোয়া আবু দাউদ ও তিরমিজিতে বর্ণিত। নবী (সা.) ডান হাত গালের নিচে রেখে তিনবার বলতেন: আল্লাহুম্মা কিনি আজাবাকা ইয়াওমা তাবআসু ইবাদাক। অর্থ: হে আল্লাহ, যেদিন আপনি আপনার বান্দাদের পুনরুত্থিত করবেন, সেদিন আমাকে আপনার আজাব থেকে রক্ষা করুন।
বিজ্ঞাপন
ঘুম থেকে ওঠার দোয়া
الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي أَحْيَانَا بَعْدَ مَا أَمَاتَنَا وَإِلَيْهِ النُّشُورُ
বাংলা উচ্চারণ: আলহামদু লিল্লাহিল্লাজি আহইয়ানা বাদা মা আমাতানা ওয়া ইলাইহিন নুশুর।
অর্থ: সব প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আমাদের মৃত্যুর পর জীবিত করেছেন, আর তাঁরই কাছে পুনরুত্থান।
বিজ্ঞাপন
চোখ খুলেই মোবাইলের পর্দায় নোটিফিকেশন দেখার আগে এই দোয়াটি পড়ার অভ্যাস করুন। দিনের প্রথম কথাটি আল্লাহর শোকর দিয়ে শুরু হলে মন অন্যরকম স্থির থাকে।
ঘুমের আগে যে সূরা ও আয়াত পড়বেন
১. আয়াতুল কুরসি: বুখারিতে আবু হুরায়রা (রা.)-এর এক দীর্ঘ ঘটনায় এসেছে, ঘুমানোর আগে আয়াতুল কুরসি পড়লে সকাল পর্যন্ত আল্লাহর পক্ষ থেকে একজন রক্ষক নিযুক্ত থাকে এবং শয়তান কাছে আসতে পারে না। নবী (সা.) এ কথার সত্যতা নিশ্চিত করেছিলেন।
২. সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত: বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত, যে ব্যক্তি রাতে সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত পড়ে, তার জন্য তা যথেষ্ট হয়ে যায়। আমানার রাসুলু থেকে সূরার শেষ পর্যন্ত।
বিজ্ঞাপন
৩. তিন কুল: আয়েশা (রা.) বলেছেন, নবী (সা.) প্রতি রাতে বিছানায় যাওয়ার সময় দুই হাত একত্র করে তাতে সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক ও সূরা নাস পড়ে ফুঁ দিতেন। তারপর মাথা ও চেহারা থেকে শুরু করে শরীরের যতটুকু সম্ভব হাত বুলিয়ে নিতেন, এভাবে তিনবার করতেন (বুখারি)।
৪. সূরা মুলক: তিরমিজির বর্ণনায় আছে, নবী (সা.) সূরা সাজদা ও সূরা মুলক না পড়ে ঘুমাতেন না।
৫. সূরা কাফিরুন: আবু দাউদ ও তিরমিজিতে বর্ণিত, এক সাহাবিকে নবী (সা.) ঘুমানোর আগে সূরা কাফিরুন পড়ে ঘুমাতে বলেছিলেন, কারণ এতে শিরক থেকে মুক্তির ঘোষণা আছে।
তাসবিহে ফাতেমি: ক্লান্তি দূর করার আমল
বিজ্ঞাপন
ফাতেমা (রা.) সংসারের কাজে ক্লান্ত হয়ে নবী (সা.)-এর কাছে একজন সাহায্যকারী চেয়েছিলেন। নবী (সা.) তাঁকে ও আলি (রা.)-কে বললেন, আমি কি তোমাদের এর চেয়ে উত্তম কিছু শিখিয়ে দেব না? যখন বিছানায় যাবে, তখন তেত্রিশবার সুবহানাল্লাহ, তেত্রিশবার আলহামদুলিল্লাহ এবং চৌত্রিশবার আল্লাহু আকবার পড়বে। এটি তোমাদের জন্য একজন সাহায্যকারীর চেয়ে উত্তম (বুখারি, মুসলিম)।
এই জিকিরকেই তাসবিহে ফাতেমি বলা হয়। সারা দিনের পরিশ্রমের পর বিছানায় শুয়ে আঙুলে গুনে গুনে পড়া যায়। মাত্র এক-দুই মিনিটের কাজ।
ঘুমের সুন্নত আদব
১. অজু করে ঘুমানো: বুখারি ও মুসলিমে বারা ইবনে আজিব (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেছেন, বিছানায় যাওয়ার আগে নামাজের অজুর মতো অজু করো, তারপর ডান কাতে শোও। এরপর তিনি একটি দোয়া শিখিয়ে দেন, যার শুরু আল্লাহুম্মা আসলামতু নাফসি ইলাইকা। বলেন, ওই রাতে মারা গেলে ফিতরাতের ওপর মারা যাবে।
বিজ্ঞাপন
২. বিছানা ঝেড়ে নেওয়া: শোয়ার আগে কাপড়ের কোনা দিয়ে তিনবার বিছানা ঝেড়ে নেওয়া সুন্নত, কারণ জানা নেই বিছানায় কী এসে পড়েছে (বুখারি, মুসলিম)।
৩. ডান কাতে শোয়া: ডান কাতে শুয়ে ডান হাত গালের নিচে রাখা সুন্নত। উপুড় হয়ে শোয়াকে হাদিসে অপছন্দ করা হয়েছে (আবু দাউদ, তিরমিজি)।
৪. ঘরের নিরাপত্তা: রাতে দরজা বন্ধ করা, খাবার-পানির পাত্র ঢেকে রাখা এবং আগুন বা বাতি নিভিয়ে ঘুমানোর নির্দেশ বুখারি ও মুসলিমের হাদিসে আছে। আজকের দিনে চুলা ও গ্যাসের লাইন বন্ধ করে ঘুমানোও এর মধ্যে পড়ে।
৫. এশার পর অহেতুক জেগে না থাকা: নবী (সা.) এশার আগে ঘুমানো এবং এশার পর অপ্রয়োজনীয় গল্পগুজব অপছন্দ করতেন (বুখারি)। তাড়াতাড়ি ঘুমালে ফজরে ওঠা সহজ হয়।
বিজ্ঞাপন
খারাপ স্বপ্ন দেখলে করণীয়
মুসলিম শরিফে বর্ণিত, ভালো স্বপ্ন আল্লাহর পক্ষ থেকে, আর খারাপ স্বপ্ন শয়তানের পক্ষ থেকে। খারাপ স্বপ্ন দেখলে বাঁ দিকে হালকা থুতুর মতো তিনবার ফুঁ দিন, আউজু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম পড়ে আশ্রয় চান, পাশ ফিরে শোন এবং স্বপ্নটি কাউকে বলবেন না। চাইলে উঠে দুই রাকাত নামাজ পড়তে পারেন। হাদিসে আছে, এমন করলে সেই স্বপ্ন কোনো ক্ষতি করবে না। ভালো স্বপ্ন দেখলে আল্লাহর প্রশংসা করুন এবং যাকে ভালোবাসেন শুধু তাকে বলুন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
ঘুমানোর দোয়া পড়ে ঘুম না এলে কী করব?
বিজ্ঞাপন
যতক্ষণ ঘুম না আসে, শুয়ে শুয়ে জিকির, ইস্তিগফার বা মুখস্থ সূরা পড়তে থাকুন। এতে সময়ও কাজে লাগে, মনও শান্ত হয়। দীর্ঘদিন ঘুমের সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
দিনে ঘুমানোর সময়ও কি এই দোয়া পড়তে হয়?
হ্যাঁ। দুপুরের বিশ্রাম বা যেকোনো ঘুমের আগে ও পরে এই দোয়া পড়া যায়।
শিশুদের কোন দোয়া শেখাব?
বিজ্ঞাপন
শুরুতে ঘুমানোর ও ঘুম থেকে ওঠার এই দুটি ছোট দোয়া আর তিন কুল শেখান। শিশুরা দ্রুত মুখস্থ করে এবং অভ্যাসটি সারা জীবন থেকে যায়।
রাতে হঠাৎ ঘুম ভাঙলে কী পড়ব?
বুখারিতে উবাদা ইবনে সামিত (রা.) থেকে বর্ণিত, রাতে ঘুম ভেঙে কেউ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু দিয়ে শুরু হওয়া জিকিরটি পড়ে তারপর ক্ষমা চাইলে বা দোয়া করলে তা কবুল হয়, আর অজু করে নামাজ পড়লে সে নামাজও কবুল হয়। পুরো জিকির মুখস্থ না থাকলে অন্তত লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ ও আস্তাগফিরুল্লাহ পড়ে আবার ঘুমাতে পারেন।
অজু ছাড়া ঘুমালে কি গুনাহ হবে?
বিজ্ঞাপন
না, গুনাহ হবে না। অজু করে ঘুমানো সুন্নত ও উত্তম। ক্লান্তির কারণে অজু করা না হলে অন্তত দোয়া ও তিন কুল পড়ে ঘুমান।