ইফতারের দোয়া বাংলা উচ্চারণ ও অর্থ: ইফতারের সুন্নত ও আদব
ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশ:
সূর্য ডোবার খবর আসে মাইকের আজানে, আর ঠিক তখনই সারা দিনের অপেক্ষার শেষ হয়। ইফতারের প্রথম মুহূর্তে মুখে যে দোয়াটি সবচেয়ে বেশি শোনা যায়, তা হলো আল্লাহুম্মা লাকা সুমতু ওয়া আলা রিজকিকা আফতারতু, অর্থাৎ হে আল্লাহ, আপনার জন্যই রোজা রেখেছি এবং আপনার দেওয়া রিজিক দিয়েই ইফতার করছি।
বিজ্ঞাপন
এর পাশাপাশি আরেকটি দোয়া আছে, যা নবী (সা.) ইফতারের পর পড়তেন: জাহাবাজ জামাউ ওয়াবতাল্লাতিল উরুকু ওয়া সাবাতাল আজরু ইনশাআল্লাহ। অর্থ, পিপাসা দূর হলো, শিরাগুলো সিক্ত হলো, আর আল্লাহ চাইলে প্রতিদান নিশ্চিত হলো।
ইফতার শুরু করবেন বিসমিল্লাহ বলে, যেমন যেকোনো খাবারের শুরুতে বলা হয়। তারপর দোয়া পড়ুন, খেজুর বা পানি মুখে দিন। নিচে দুটি দোয়ার আরবি, উচ্চারণ, অর্থ ও উৎস দেওয়া হলো, সঙ্গে ইফতারের সুন্নত ও আদব।
প্রথম দোয়া: আল্লাহুম্মা লাকা সুমতু
اللَّهُمَّ لَكَ صُمْتُ وَعَلَى رِزْقِكَ أَفْطَرْتُ
বিজ্ঞাপন
বাংলা উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা লাকা সুমতু ওয়া আলা রিজকিকা আফতারতু।
অর্থ: হে আল্লাহ, আমি আপনার জন্যই রোজা রেখেছি এবং আপনার দেওয়া রিজিক দিয়েই ইফতার করছি।
এই দোয়াটি আবু দাউদে মুআজ ইবনে জুহরা থেকে বর্ণিত। হাদিস বিশারদরা এর সনদকে মুরসাল, অর্থাৎ মাঝখান থেকে একজন সাহাবির নাম অনুল্লিখিত, বলে উল্লেখ করেছেন। তবে আলেমরা বলেছেন, ফজিলতের আমলে এ ধরনের বর্ণনা অনুযায়ী আমল করা যায়, আর দোয়াটির অর্থও সুন্দর। তাই যুগ যুগ ধরে মুসলমানরা এটি পড়ে আসছেন।
অনেক ক্যালেন্ডারে এর সঙ্গে ওয়া বিকা আমানতু ওয়া আলাইকা তাওয়াক্কালতু যোগ করা থাকে। এই অংশটি হাদিসের বর্ণনায় নেই। অর্থের দিক থেকে ভুল নয়, তবে হাদিসের দোয়া হিসেবে পড়তে চাইলে মূল অংশটুকু পড়াই যথেষ্ট।
বিজ্ঞাপন
দ্বিতীয় দোয়া: জাহাবাজ জামাউ
ذَهَبَ الظَّمَأُ وَابْتَلَّتِ الْعُرُوقُ وَثَبَتَ الْأَجْرُ إِنْ شَاءَ اللَّهُ
বাংলা উচ্চারণ: জাহাবাজ জামাউ ওয়াবতাল্লাতিল উরুকু ওয়া সাবাতাল আজরু ইনশাআল্লাহ।
অর্থ: পিপাসা দূর হয়েছে, শিরা-উপশিরা সিক্ত হয়েছে, আর আল্লাহ চাইলে প্রতিদান নিশ্চিত হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
আবু দাউদে আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) ইফতার করার পর এ দোয়াটি পড়তেন। মুহাদ্দিসদের অনেকে এর সনদকে হাসান বা গ্রহণযোগ্য বলেছেন। দোয়ার শব্দ থেকেই বোঝা যায়, এটি পানি পান করার পর পড়ার দোয়া। তাই আগে খেজুর বা পানি মুখে দিয়ে তারপর এটি পড়া উত্তম।
দুটি দোয়া একসঙ্গে পড়তেও বাধা নেই: শুরুতে বিসমিল্লাহ, তারপর আল্লাহুম্মা লাকা সুমতু, ইফতার মুখে দেওয়া, পানি পানের পর জাহাবাজ জামাউ।
ইফতারের সময় দোয়া কবুল হয়
রোজাদারের দোয়ার বিশেষ মর্যাদা হাদিসে এসেছে। তিরমিজির এক বর্ণনায় আছে, তিন ব্যক্তির দোয়া ফিরিয়ে দেওয়া হয় না: রোজাদার, ইফতার করা পর্যন্ত; ন্যায়পরায়ণ শাসক; এবং মজলুম। ইবনে মাজাহর বর্ণনায় আছে, ইফতারের সময় রোজাদারের দোয়া ফিরিয়ে দেওয়া হয় না।
বিজ্ঞাপন
অথচ বাস্তবে ইফতারের শেষ দশ মিনিট কাটে টেবিল সাজানো, ছবি তোলা আর ফোনে কথা বলায়। একটু আগে প্রস্তুতি শেষ করে সূর্যাস্তের আগের কয়েক মিনিট দোয়ায় কাটানোর অভ্যাস করুন। নিজের, মা-বাবার, পরিবারের, অসুস্থ আত্মীয়দের জন্য দোয়া করুন। এ সময় হাত তুলে, নিজের ভাষায়, যত খুশি চাওয়া যায়।
কী বলবেন বুঝতে না পারলে কোরআনের ছোট দোয়াগুলো দিয়ে শুরু করুন। যেমন রাব্বানা আতিনা ফিদ্দুনিয়া হাসানাতাও ওয়া ফিল আখিরাতি হাসানাতাও ওয়া কিনা আজাবান নার, কিংবা মা-বাবার জন্য রাব্বির হামহুমা কামা রাব্বাইয়ানি সাগিরা, অর্থাৎ হে আমার রব, তাঁদের প্রতি দয়া করুন, যেমন তাঁরা শৈশবে আমাকে লালন-পালন করেছেন (সূরা বনি ইসরাইল, আয়াত ২৪)। তারপর নিজের প্রয়োজনের কথা নিজের ভাষায় বলুন।
ইফতারের সুন্নত ও আদব
১. দেরি না করা: সূর্য ডোবা নিশ্চিত হলে দ্রুত ইফতার করা সুন্নত। বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত, মানুষ ততদিন কল্যাণের মধ্যে থাকবে, যতদিন তারা দ্রুত ইফতার করবে। সতর্কতার নামে অযথা কয়েক মিনিট দেরি করা ঠিক নয়।
বিজ্ঞাপন
২. খেজুর দিয়ে শুরু: আবু দাউদ ও তিরমিজিতে আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) নামাজের আগে কয়েকটি তাজা খেজুর দিয়ে ইফতার করতেন; তা না থাকলে শুকনো খেজুর, আর তাও না থাকলে কয়েক ঢোক পানি।
৩. অল্প খেয়ে নামাজ: ইফতারে অল্প কিছু খেয়ে মাগরিবের নামাজ জামাতে আদায় করুন। পেট ভরে খেয়ে নামাজ দেরি করা উচিত নয়। ভারী খাবার নামাজের পর খাওয়া যায়।
৪. অন্যকে ইফতার করানো: তিরমিজির হাদিসে আছে, যে কোনো রোজাদারকে ইফতার করায়, সে রোজাদারের সমান সওয়াব পায়, অথচ রোজাদারের সওয়াব একটুও কমে না। একটি খেজুর বা এক গ্লাস পানি দিয়ে হলেও এ সওয়াব পাওয়া যায়।
৫. অপচয় না করা: ইফতারের টেবিলে খাবারের পাহাড় সাজিয়ে পরে ফেলে দেওয়া রোজার শিক্ষার বিপরীত।
বিজ্ঞাপন
৬. সঠিক সময় নিশ্চিত হওয়া: বাংলাদেশের এক জেলা থেকে আরেক জেলায় সূর্যাস্তের সময় কয়েক মিনিট এদিক-সেদিক হয়। তাই ঢাকার সময়সূচি দেখে অন্য জেলায় ইফতার না করে নিজের এলাকার সময়সূচি বা স্থানীয় মসজিদের আজান অনুসরণ করুন। আকাশে মেঘ থাকলে বা সন্দেহ হলে সূর্যাস্ত নিশ্চিত হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করুন, কারণ সূর্য ডোবার আগে ইফতার করলে রোজা ভেঙে যায় এবং কাজা করতে হয়।
৭. ইফতারের পর কৃতজ্ঞতা: খাওয়া শেষে আলহামদুলিল্লাহ বলুন। সারা দিন না খেয়ে থাকার পর এক গ্লাস পানির মূল্য যেভাবে বোঝা যায়, সেই উপলব্ধি থেকেই কৃতজ্ঞতা আসে, আর সেটিই রোজার বড় শিক্ষা।
কারও বাড়িতে ইফতার করলে যে দোয়া
কেউ ইফতারের দাওয়াত দিলে মেজবানের জন্য দোয়া করা সুন্নত। আবু দাউদে বর্ণিত, নবী (সা.) সাদ ইবনে উবাদা (রা.)-এর বাড়িতে ইফতার করে এই দোয়া করেছিলেন:
বিজ্ঞাপন
أَفْطَرَ عِنْدَكُمُ الصَّائِمُونَ، وَأَكَلَ طَعَامَكُمُ الْأَبْرَارُ، وَصَلَّتْ عَلَيْكُمُ الْمَلَائِكَةُ
উচ্চারণ: আফতারা ইনদাকুমুস সায়িমুন, ওয়া আকালা তাআমাকুমুল আবরার, ওয়া সাল্লাত আলাইকুমুল মালাইকা। অর্থ: আপনাদের এখানে রোজাদাররা ইফতার করুক, নেককার লোকেরা আপনাদের খাবার খাক এবং ফেরেশতারা আপনাদের জন্য রহমতের দোয়া করুক।
স্বাস্থ্যকর ইফতারের কিছু কথা
সারা দিন না খেয়ে থাকার পর হঠাৎ অনেক ভাজাপোড়া খেলে বুকজ্বালা, পেট ফাঁপা ও অস্বস্তি হয়। পানি, খেজুর, ফল ও হালকা খাবার দিয়ে শুরু করে ধীরে খেলে শরীর ভালো থাকে। একবারে অনেক পানি না খেয়ে ইফতার থেকে সেহরি পর্যন্ত ভাগ করে পান করুন। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা কিডনির সমস্যা থাকলে রমজানের খাদ্যতালিকা নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
বিজ্ঞাপন
সাধারণ জিজ্ঞাসা
ইফতারের দোয়া ইফতারের আগে পড়ব নাকি পরে?
আল্লাহুম্মা লাকা সুমতু দোয়াটি ইফতার শুরুর মুহূর্তে বা সামান্য পরে পড়া যায়। জাহাবাজ জামাউ দোয়াটি পানি পানের পর পড়ার কথা। আগে বিসমিল্লাহ বলে ইফতার শুরু করুন।
দোয়া পড়তে ভুলে গেলে কি রোজায় সমস্যা হবে?
বিজ্ঞাপন
না। ইফতারের দোয়া সুন্নত আমল, রোজার শর্ত নয়। মনে পড়লে পরে পড়ে নিন।
খেজুর না থাকলে কী দিয়ে ইফতার করব?
পানি দিয়ে। হাদিসে খেজুরের পরের বিকল্প হিসেবে পানির কথাই এসেছে। যেকোনো হালাল খাবার দিয়েও ইফতার করা যায়।
বিমানে বা চলন্ত বাসে ইফতারের সময় কীভাবে বুঝব?
বিজ্ঞাপন
যেখানে আছেন, সেখান থেকে সূর্য ডুবেছে কি না, সেটিই বিবেচ্য। বিমানে উঁচুতে থাকলে মাটির চেয়ে সূর্য দেরিতে ডোবে, তাই জানালা দিয়ে সূর্যাস্ত নিশ্চিত হয়ে ইফতার করুন। বাসে থাকলে যে এলাকা দিয়ে যাচ্ছেন, সেখানকার সূর্যাস্তের সময় ধরুন।