প্লট বরাদ্দের লটারি ৮ মাসেও হয়নি, নতুন আবেদনের উদ্যোগ
১৩২টি প্লটের বিপরীতে ৬৯৬টি আবেদন জমা থাকলেও লটারি স্থগিত করে নতুন বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ
হবিগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি · হবিগঞ্জ
প্রকাশ:
হবিগঞ্জ শহরতলির ধুলিয়াখাল এলাকায় সরকারি প্লট পাওয়ার আশায় দেড় থেকে দুই লাখ টাকা জামানত দিয়ে আট মাস ধরে অপেক্ষায় আছেন ৬৯৬ জন আবেদনকারী। কিন্তু জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের এই প্রকল্পে প্লট বরাদ্দের লটারি এখনো হয়নি। উল্টো এখন নতুন করে আবেদন নেওয়ার প্রস্তুতি শুরু করেছে কর্তৃপক্ষ, যা প্লটপ্রত্যাশীদের অনিশ্চয়তা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
বিজ্ঞাপন
গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা যায়, ২০১৬ সালে জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের সিলেট বিভাগের অধীন স্বল্প ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য ‘সাইট অ্যান্ড সার্ভিসেস আবাসিক প্লট উন্নয়ন প্রকল্প’ গ্রহণ করা হয়। ২০১৭ সালে প্রকল্পটির ডিপিপি অনুমোদন পায় এবং এর বাস্তবায়নে ২৭ কোটি ৪১ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়। প্রকল্পের আওতায় প্রায় সাড়ে ১৬ একর জমি অধিগ্রহণ করে ভূমি উন্নয়নের জন্য মাটি ভরাটের কাজও ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে।
প্রকল্প এলাকার ১৩২টি আবাসিক প্লটের বিপরীতে জমা পড়েছে ৬৯৬টি আবেদন। অর্থাৎ প্রতি প্লটের বিপরীতে পাঁচটির বেশি আবেদন জমা হয়েছে। স্থানীয় প্লটপ্রত্যাশীদের ভাষ্যমতে, আবেদন গ্রহণের সময়সীমা আট মাস পার হওয়ার পর নতুন করে আবেদন নেওয়ার অর্থ রাজনৈতিক প্রভাবে প্লট বরাদ্দের সুযোগ সৃষ্টি করা।
জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, লটারি প্রক্রিয়া শুরুর উদ্যোগ নেওয়া হলেও হবিগঞ্জ-৩ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য ও হুইপ জি কে গউছের অনুরোধে তা স্থগিত করা হয়। তিনি নতুন করে আবেদন নেওয়ার জন্য গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রীকে অনুরোধ করেছিলেন। এখন কর্তৃপক্ষ শিগগিরই নতুন করে আবেদন গ্রহণের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
এ বিষয়ে সংসদ সদস্য জি কে গউছ মুঠোফোনে বলেন, ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে আবেদনগুলো জমা নেওয়া হয়। অনেকেই এ আবেদনের বিষয়ে জানতেন না। এ কারণে আমি মনে করি নতুন করে আবেদন নেওয়া হলে মানুষের অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়বে। তাই আমি চাই বেশি আবেদন জমা পড়ুক। তবে এখানে দেখার বিষয় নিরপেক্ষভাবে অর্থাৎ লটারির মাধ্যমে এ প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয় কি না? সেটা খেয়াল রাখার দায়িত্ব সবার।’
বিজ্ঞাপন
গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ সিলেট বিভাগীয় কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের শুরুতে প্লট বরাদ্দের জন্য জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। আড়াই থেকে পাঁচ কাঠা ও তদূর্ধ্ব আয়তনের ১৩২টি প্লটের বিপরীতে প্রায় ১১০০টি আবেদনপত্র বিক্রি হয়। ফেব্রুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহের মধ্যে জামানতসহ মোট ৬৯৬টি আবেদন জমা পড়ে। চার কাঠা ও তদূর্ধ্ব আয়তনের প্লটের জন্য দুই লাখ টাকা এবং চার কাঠার নিচের প্লটের জন্য দেড় লাখ টাকা করে জামানত নেওয়া হয়েছে। কর্তৃপক্ষের হিসাবে, চেয়ারম্যানের অনুকূলে জমা হওয়া এই জামানতের পরিমাণ প্রায় পাঁচ কোটি টাকা।
প্রকল্পের বিবরণপত্র অনুযায়ী, কাঠাপ্রতি জমির আনুমানিক দাম ধরা হয়েছে পাঁচ লাখ ১৩ হাজার টাকা। বরাদ্দপ্রাপ্তরা কিস্তিতে বা এককালীন এই অর্থ পরিশোধ করতে পারবেন। যারা বরাদ্দ পাবেন না, তাদের জামানতের টাকা ফেরত দেওয়া হবে। বরাদ্দপত্র জারির পাঁচ বছরের মধ্যে অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী বাড়ি নির্মাণ করতে হবে, অন্যথায় বরাদ্দ বাতিল করে জমা দেওয়া অর্থের পাঁচ শতাংশ বাজেয়াপ্ত করে অবশিষ্ট অর্থ ফেরত দেওয়া হবে।
জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের সিলেট বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী (সিভিল) নেজামুল হক মজুমদার বলেন, স্থানীয় সংসদ সদস্যের অনুরোধে মন্ত্রণালয় থেকে নতুন করে আবেদন নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। আগের আবেদনগুলোর সঙ্গে নতুন আবেদন লটারির মাধ্যমে বরাদ্দ দেওয়া হবে। হঠাৎ এই সিদ্ধান্তের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমি চেষ্টা করেছি মানুষ যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের আদেশ অনুযায়ী আবার আবেদন নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।’
সুজন হবিগঞ্জের সাধারণ সম্পাদক মিছবাহুল বারী বলেন, ‘স্বল্প ও মধ্যম আয়ের মানুষ নিজেদের শেষ সম্বল দিয়ে জামানতের টাকা জমা দিয়েছেন। দীর্ঘদিন কর্তৃপক্ষের কাছে পড়ে থাকায় অনেকেই অসহায়ত্ব বোধ করছেন। এখন যদি রাজস্ব আদায়ের নামে আরও আবেদন নেওয়া হয় বা বিলম্ব হয়, তাতে মানুষ আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। কর্তৃপক্ষের উচিত জমাকৃত আবেদন থেকে প্লট বরাদ্দ দেওয়া।’
বিজ্ঞাপন
নতুন করে আবেদন গ্রহণের খবরে প্লটপ্রত্যাশীদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। তাদের দাবি, নিয়ম মেনে আবেদন করার পর লটারির ঠিক আগমুহূর্তে বিধি ভেঙে নতুন আবেদন নেওয়ার অর্থ দুর্নীতির সুযোগ তৈরি করা। হবিগঞ্জের ব্যবসায়ী কামাল আহমেদ বলেন, ‘এত আবেদন জমা হওয়ার পরও পুনরায় আবেদনের সুযোগ করে দেওয়া মানেই দলীয় নেতা-কর্মীদের এ প্রক্রিয়ায় ঢোকানো এবং নিজেদের মধ্যে ভাগ-বাঁটোয়ারা করা। আমরা যে আশা নিয়ে আবেদন করেছিলাম, আমাদের সেই স্বপ্নের জায়গায় অনিয়ম–দুর্নীতির সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে।’ মো. হাবিবুর রহমান নামের এক ব্যাংক কর্মকর্তা বলেন, ‘আমি সীমিত আয়ের মানুষ।’