কক্সবাজারের দর্শনীয় স্থান: সৈকত ছাড়াও যেসব জায়গা ঘুরবেন
ট্রাভেল ডেস্ক · কক্সবাজার
প্রকাশ:
কক্সবাজারে গিয়ে অনেকেই তিন দিন শুধু সুগন্ধা আর লাবণী পয়েন্টে কাটিয়ে ফেরেন। অথচ শহর থেকে এক-দেড় ঘণ্টার দূরত্বে আছে পাহাড়ি ঝরনা, পাথুরে সৈকত, শত বছরের পুরোনো বৌদ্ধ বিহার, পাহাড়ের চূড়ায় মন্দিরসহ একটি দ্বীপ আর বন্য প্রাণীর সাফারি পার্ক। কক্সবাজার কি কি দেখার আছে, এই প্রশ্নের উত্তর তাই শুধু সমুদ্র নয়।
বিজ্ঞাপন
কক্সবাজার কিসের জন্য বিখ্যাত, তার তালিকায় দীর্ঘ সৈকতের পাশাপাশি আছে সামুদ্রিক মাছ ও শুঁটকি, বার্মিজ পণ্যের বাজার, রাখাইন ও বৌদ্ধ ঐতিহ্য আর মহেশখালীর পান। এই লেখায় শহরকে কেন্দ্র করে চার দিকের দর্শনীয় স্থানগুলো ভাগ করে দেওয়া হলো, যাতে এক-একটি দিন একেক দিকে পরিকল্পনা করা যায়।
ঘোরার জন্য সিএনজি অটোরিকশা, ইজিবাইক বা পুরো দিনের জন্য জিপ ও মাইক্রোবাস ভাড়া করা যায়। দলে গেলে গাড়ি ভাড়া করাই সাশ্রয়ী।
শহরের ভেতরে ও কাছে
১. বার্মিজ মার্কেট: শহরের কেন্দ্রে রাখাইন ও বার্মিজ পণ্যের দোকান। আচার, শুঁটকি, কাঠের জিনিস, চপ্পল, শাল আর নানা প্রসাধনী পাওয়া যায়। দর-কষাকষি এখানে স্বাভাবিক।
বিজ্ঞাপন
২. বৌদ্ধ ক্যাং: শহরে রাখাইন সম্প্রদায়ের পুরোনো বৌদ্ধ বিহার আছে, স্থানীয়ভাবে যেগুলো ক্যাং নামে পরিচিত। কাঠের কারুকাজ করা স্থাপনা আর শান্ত পরিবেশ ভালো লাগবে। উপাসনার সময় নীরবতা বজায় রাখুন।
৩. কলাতলী ও দরিয়ানগর: শহরের দক্ষিণ প্রান্ত থেকেই মেরিন ড্রাইভ শুরু। কাছেই দরিয়ানগর এলাকায় পাহাড় আর সৈকত পাশাপাশি, অপেক্ষাকৃত নিরিবিলি।
দক্ষিণে মেরিন ড্রাইভ ধরে
শহর থেকে টেকনাফ পর্যন্ত প্রায় ৮০ কিলোমিটার লম্বা মেরিন ড্রাইভ সড়কের একপাশে সাগর, অন্যপাশে পাহাড়। পুরো পথটাই দর্শনীয়, যেকোনো জায়গায় থেমে ছবি তোলা যায়।
বিজ্ঞাপন
১. হিমছড়ি: শহর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার। পাহাড়ের ওপরে ওঠার সিঁড়ি আছে, চূড়া থেকে দীর্ঘ সৈকতের দৃশ্য অসাধারণ। বর্ষায় এখানকার ছোট ঝরনায় পানি থাকে। হিমছড়ি জাতীয় উদ্যান এলাকায় প্রবেশমূল্য দিতে হয়।
২. ইনানী সৈকত: শহর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার। ভাটার সময় সৈকতে জেগে ওঠে কালো পাথরের সারি, পানি থাকে স্বচ্ছ। সকালের দিকে বা ভাটার সময় গেলে সবচেয়ে ভালো লাগে। পাথর পিচ্ছিল, হাঁটার সময় সাবধান।
৩. পাটুয়ারটেক ও আশপাশ: ইনানীর পরে মেরিন ড্রাইভের ধারে আরও কয়েকটি পাথুরে ও নিরিবিলি সৈকত আছে। পর্যটক কম বলে এগুলো শান্ত।
৪. টেকনাফ: মেরিন ড্রাইভের শেষ মাথায় নাফ নদীর তীরে দেশের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তের উপজেলা। টেকনাফ থানা প্রাঙ্গণের মাথিনের কূপ এক রাখাইন তরুণী আর এক পুলিশ কর্মকর্তার বিয়োগান্ত প্রেমের প্রচলিত গল্পের জন্য পরিচিত। আরও দক্ষিণে শাহপরীর দ্বীপ, দেশের মূল ভূখণ্ডের দক্ষিণ প্রান্তের কাছের এলাকা।
বিজ্ঞাপন
পুরো মেরিন ড্রাইভ এক দিনে ঘুরতে হলে সকালে বেরিয়ে সন্ধ্যার আগে ফেরার পরিকল্পনা করুন। সিএনজি অটোরিকশায় ইনানী পর্যন্ত যাওয়া-আসা আনুমানিক ১৫০০ থেকে ২৫০০ টাকা, টেকনাফ পর্যন্ত গেলে খরচ ও সময় দুটোই বেশি। টেকনাফ সীমান্তবর্তী এলাকা, সেখানে নিরাপত্তা বাহিনীর নির্দেশনা মেনে চলুন।
পশ্চিমে সাগরের দ্বীপ: মহেশখালী
মহেশখালী দেশের একমাত্র পাহাড়ি দ্বীপ হিসেবে পরিচিত। শহরের ৬ নম্বর ঘাট থেকে স্পিডবোটে ২০ থেকে ৩০ মিনিটে, ট্রলারে আরও বেশি সময়ে পৌঁছানো যায়। দ্বীপে পাহাড়ের চূড়ায় আদিনাথ মন্দির, হিন্দুধর্মাবলম্বীদের গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থান। এর কাছেই বৌদ্ধ বিহার আর রাখাইন পাড়া। মহেশখালীর মিষ্টি পান দেশজুড়ে পরিচিত, পানের বরজও দেখা যায়।
দ্বীপে ঘোরার জন্য রিকশা বা ইজিবাইক পাওয়া যায়। অর্ধেক দিন হাতে রাখলেই মহেশখালী আরামে দেখা যায়। ঘাট থেকে মন্দিরে যাওয়ার পথে লবণের মাঠ আর চিংড়ির ঘের চোখে পড়ে, শুকনো মৌসুমে মাঠে লবণ তৈরির কাজ দেখা যায়। মহেশখালীর কাছেই সোনাদিয়া দ্বীপ, নির্জন সৈকত আর পাখির জন্য পরিচিত। সেখানে যাওয়ার ব্যবস্থা সীমিত, তাই স্থানীয়ভাবে খোঁজ নিয়ে তবেই পরিকল্পনা করুন। স্পিডবোটে ওঠার আগে লাইফ জ্যাকেট নিন, আবহাওয়া খারাপ থাকলে পারাপার এড়িয়ে চলুন।
বিজ্ঞাপন
উত্তর-পূর্বে: রামু ও ডুলাহাজারা
১. রামু: শহর থেকে প্রায় ১৫ থেকে ২০ কিলোমিটার। শত বছরের পুরোনো বৌদ্ধ বিহার আর কাঠের ক্যাংয়ের জন্য রামু বিখ্যাত। এখানে একটি বিশাল শায়িত বুদ্ধমূর্তি আছে, যা দেখতে অনেকে আসেন। রামুর রাবারবাগানও ঘুরে দেখা যায়। প্রবারণা পূর্ণিমার সময় রামুতে আকাশে ফানুস ওড়ানো আর বাঁকখালী নদীতে সাজানো নৌকা ভাসানোর উৎসব হয়, যা দেখতে বহু মানুষের সমাগম ঘটে। শহর থেকে সিএনজি অটোরিকশায় সহজেই রামু যাওয়া-আসা করা যায়, অর্ধেক দিনই যথেষ্ট।
২. ডুলাহাজারা সাফারি পার্ক: চকরিয়া উপজেলায়, শহর থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার উত্তরে, ঢাকা-কক্সবাজার মহাসড়কের পাশে। বিশাল বনাঞ্চলের ভেতরে বাঘ, সিংহ, হরিণ, হাতি, কুমিরসহ নানা প্রাণী খোলামেলা পরিবেশে রাখা আছে। পার্কের নিজস্ব বাসে ঘুরে দেখার ব্যবস্থা থাকে। কক্সবাজারে যাওয়া বা ফেরার পথে এখানে থামলে আলাদা দিন খরচ হয় না।
খাওয়া, কেনাকাটা ও ঘোরার খরচ
বিজ্ঞাপন
দূরের জায়গাগুলোতে যাওয়ার সময় দুপুরের খাবারের পরিকল্পনা আগে করে রাখুন। মেরিন ড্রাইভের ধারে ইনানী ও হিমছড়ির কাছে কিছু খাবারের দোকান আছে, টেকনাফ ও মহেশখালীতেও সাধারণ মানের রেস্তোরাঁ পাওয়া যায়। তবে শহরের মতো বিকল্প নেই, তাই পানি আর হালকা খাবার সঙ্গে রাখা ভালো।
কেনাকাটার জন্য শহরের বার্মিজ মার্কেট আর শুঁটকির দোকানগুলোই প্রধান। মহেশখালী থেকে পান আর রামু থেকে স্থানীয় হাতের কাজ কিনতে পারেন। দরদাম করুন, তবে কারিগরদের ন্যায্য দাম দিতে কার্পণ্য করবেন না।
খরচের আনুমানিক ধারণা: মেরিন ড্রাইভে সারা দিনের জন্য জিপ বা মাইক্রোবাস ভাড়া আনুমানিক চার থেকে সাত হাজার টাকা, দলে গেলে ভাগ হয়ে যায়। মহেশখালীর স্পিডবোটে জনপ্রতি আনুমানিক ১০০ থেকে ২০০ টাকা। হিমছড়ি ও সাফারি পার্কের প্রবেশমূল্য সামান্য, শিশুদের জন্য আরও কম।
কোন দিন কোথায়: সাজানো পরিকল্পনা
বিজ্ঞাপন
চার দিন হাতে থাকলে প্রথম দিন শহরের সৈকত ও বার্মিজ মার্কেট, দ্বিতীয় দিন মেরিন ড্রাইভ ধরে হিমছড়ি ও ইনানী, তৃতীয় দিন সকালে মহেশখালী আর বিকেলে রামু, চতুর্থ দিন ফেরার পথে ডুলাহাজারা সাফারি পার্ক। টেকনাফ যোগ করতে চাইলে আরেকটি দিন রাখুন। সেন্টমার্টিনের ভ্রমণ এখন মৌসুম ও সরকারি নিয়মে সীমাবদ্ধ, তাই সেটি আলাদাভাবে পরিকল্পনা করতে হয়।
মৌসুমভেদে জায়গাগুলোর রূপও বদলায়। বর্ষায় হিমছড়ির ঝরনায় পানি থাকে, পাহাড় সবুজ হয়ে ওঠে, তবে মেরিন ড্রাইভের কোথাও কোথাও পাহাড়ধসের ঝুঁকি থাকে। শীতে ইনানীর পানি স্বচ্ছ থাকে, মহেশখালী পারাপারও নিরাপদ হয়। গরমের দিনে দুপুরে খোলা সৈকতে না ঘুরে সকাল আর বিকেল বেছে নিন, দুপুরটা রাখুন বিহার বা সাফারি পার্কের ছায়াঘেরা পথের জন্য।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
হিমছড়ি আর ইনানী কি এক দিনে ঘোরা যায়?
বিজ্ঞাপন
হ্যাঁ, দুটোই মেরিন ড্রাইভের একই পথে। সকালে বেরোলে দুপুরের মধ্যে দুটো দেখে বিকেলে শহরে ফেরা যায়।
মহেশখালী যেতে কত সময় লাগে?
শহরের ঘাট থেকে স্পিডবোটে ২০ থেকে ৩০ মিনিট, ট্রলারে এক ঘণ্টার মতো লাগে। আবহাওয়া ও জোয়ার-ভাটার ওপর সময় কিছুটা নির্ভর করে।
শিশুদের নিয়ে কক্সবাজারে সৈকত ছাড়া কোথায় যাওয়া যায়?
বিজ্ঞাপন
ডুলাহাজারা সাফারি পার্ক, হিমছড়ি আর রামুর বৌদ্ধ বিহার শিশুদের জন্য ভালো। সাফারি পার্ক তাদের কাছে সবচেয়ে উপভোগ্য হয়।
ইনানী যাওয়ার সেরা সময় কোনটি?
ভাটার সময় পাথরগুলো সবচেয়ে ভালো দেখা যায়। জোয়ার-ভাটার সময়সূচি জেনে সকালের দিকে যাওয়াই ভালো।