রাঙামাটির দর্শনীয় স্থান: কাপ্তাই লেক, ঝুলন্ত সেতু ও শুভলং ঝরনা
ট্রাভেল ডেস্ক
প্রকাশ:
রাঙামাটি শহরে নামলে প্রথমেই চোখে পড়ে পানি। শহরটা যেন কাপ্তাই লেকের বুকে ছড়িয়ে থাকা কয়েকটি টিলার ওপর বসানো। লেকের নীল-সবুজ জলে পাহাড়ের ছায়া, ছোট ছোট দ্বীপ আর তার ফাঁকে ফাঁকে চলা ইঞ্জিনচালিত নৌকা, রাঙামাটি কিসের জন্য বিখ্যাত, এই দৃশ্যই তার সবচেয়ে বড় উত্তর।
বিজ্ঞাপন
রাঙামাটির দর্শনীয় স্থানগুলোর বেশির ভাগই লেককে ঘিরে। শহরের পর্যটন এলাকার ঝুলন্ত সেতু, নৌকায় ঘণ্টাখানেকের দূরত্বে শুভলং ঝরনা, লেকের পাড়ে রাজবন বিহার আর চাকমা রাজবাড়ি, সবই একটি দিনের নৌভ্রমণে দেখে ফেলা যায়। এর সঙ্গে আছে কাপ্তাই উপজেলার জাতীয় উদ্যান আর কর্ণফুলী নদী।
চাকমা, মারমা, তঞ্চঙ্গ্যাসহ নানা জাতিগোষ্ঠীর বসবাস এই জেলায়। তাঁদের তাঁতের কাপড়, খাবার আর উৎসব রাঙামাটি ভ্রমণকে আরও রঙিন করে তোলে।
রাঙামাটি যাওয়ার উপায়
১. ঢাকা থেকে সরাসরি বাসে: সায়েদাবাদ, ফকিরাপুল-আরামবাগ ও কলাবাগান এলাকা থেকে রাঙামাটির বাস ছাড়ে, বেশির ভাগই রাতে। চট্টগ্রাম হয়ে যেতে সময় লাগে সাত থেকে আট ঘণ্টা। নন-এসি বাসের ভাড়া আনুমানিক ৭০০ থেকে ৯০০ টাকা, এসি বাসে আরও বেশি।
বিজ্ঞাপন
২. চট্টগ্রাম হয়ে: ট্রেন বা উড়োজাহাজে চট্টগ্রাম পৌঁছে শহরের অক্সিজেন মোড় এলাকা থেকে রাঙামাটির বাস ধরা যায়। পাহাড়ি পথে আড়াই ঘণ্টার মতো লাগে। ট্রেনযাত্রা যাঁদের পছন্দ, তাঁদের জন্য এটি আরামদায়ক বিকল্প।
৩. কাপ্তাই হয়ে: চট্টগ্রাম থেকে কাপ্তাই গিয়ে সেখান থেকে লেকপথে নৌকায় রাঙামাটি যাওয়ার সুযোগও আছে। এতে যাত্রাপথেই লেকের সৌন্দর্য দেখা হয়ে যায়।
পার্বত্য এলাকায় ঢোকার সময় তল্লাশিচৌকিতে পরিচয়পত্র দেখাতে হতে পারে, তাই জাতীয় পরিচয়পত্র বা তার কপি সঙ্গে রাখুন।
কাপ্তাই লেক ও নৌভ্রমণ
বিজ্ঞাপন
ষাটের দশকে কর্ণফুলী নদীতে কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের ফলে এই বিশাল লেকের সৃষ্টি, যা দেশের সবচেয়ে বড় কৃত্রিম হ্রদ হিসেবে পরিচিত। বাঁধের কারণে বহু মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছিলেন, পুরোনো রাঙামাটি শহর আর চাকমা রাজবাড়ির আদি অবস্থান তলিয়ে গিয়েছিল পানির নিচে। লেকের সৌন্দর্যের পেছনে এই ইতিহাসটুকু জেনে গেলে ভ্রমণ আরও অর্থবহ হয়।
শহরের রিজার্ভ বাজার, পর্যটন ঘাট আর তবলছড়ি এলাকা থেকে ইঞ্জিনচালিত নৌকা ভাড়া পাওয়া যায়। সারা দিনের জন্য নৌকা নিলে শুভলং ঝরনা, রাজবন বিহার, চাকমা রাজবাড়ি আর লেকের মাঝের দ্বীপগুলোতে থাকা রেস্তোরাঁ ঘুরে আসা যায়। নৌকার আকার ও সময়ভেদে ভাড়া আনুমানিক ১৫০০ থেকে ৩৫০০ টাকা, দর-কষাকষি করে আগে ঠিক করে নিন। কোথায় কোথায় থামবে আর কতক্ষণ, সেটিও আগে বলে নিন।
সকাল আটটা-নয়টার মধ্যে নৌকায় উঠলে প্রথমে শুভলং পর্যন্ত চলে যাওয়া ভালো, তখন রোদ কম থাকে। ফেরার পথে দ্বীপের কোনো রেস্তোরাঁয় দুপুরের খাবার সেরে বিকেলে রাজবন বিহার ও রাজবাড়ি দেখে সূর্যাস্তের আগে ঘাটে ফেরা যায়। পথে জেলেদের ছোট নৌকা, লেকের পাড়ের পাহাড়ি গ্রাম আর পানিতে ডুবে থাকা গাছের মাথা চোখে পড়বে। রোদ থেকে বাঁচতে টুপি, সানগ্লাস আর পানি সঙ্গে রাখুন, কারণ নৌকায় ছাউনি থাকলেও লেকের খোলা আকাশে রোদের তাপ বেশি লাগে।
রাঙামাটির প্রধান দর্শনীয় স্থান
বিজ্ঞাপন
১. ঝুলন্ত সেতু: পর্যটন করপোরেশনের মোটেল এলাকায় লেকের দুই পাড় জুড়ে দেওয়া এই সেতু রাঙামাটির প্রতীক হয়ে উঠেছে। সামান্য প্রবেশমূল্য দিয়ে সেতুতে হাঁটা যায়। বর্ষায় লেকের পানি অনেক বেড়ে গেলে সেতুর পাটাতন ডুবে যাওয়ার ঘটনাও ঘটে, তখন চলাচল বন্ধ থাকে।
২. শুভলং ঝরনা: শহর থেকে নৌকায় ঘণ্টাখানেকের বেশি পথ, বরকল উপজেলায়। দুই পাশে খাড়া পাহাড়ের মাঝ দিয়ে লেকপথে যাওয়াটাই বড় অভিজ্ঞতা। বর্ষা ও তার পরপর ঝরনায় পানি থাকে প্রচুর, শীতের শেষ দিকে তা প্রায় শুকিয়ে যায়।
৩. রাজবন বিহার: বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের গুরুত্বপূর্ণ উপাসনালয়, লেকের পাড়ে বিশাল এলাকাজুড়ে। প্রতিবছর এখানে কঠিন চীবর দান উৎসবে বহু মানুষের সমাগম হয়। ঢোকার সময় জুতা খুলতে হয় এবং শালীন পোশাক পরতে হয়।
৪. চাকমা রাজবাড়ি: রাজবন বিহারের কাছেই, নৌকায় অল্প পথ। রাজপরিবারের ঐতিহ্যবাহী এই বাড়ির আশপাশ ঘুরে দেখা যায়, তবে ব্যক্তিগত এলাকায় প্রবেশের নিয়ম মেনে চলতে হয়।
বিজ্ঞাপন
৫. কাপ্তাই: রাঙামাটি শহর থেকে সড়ক বা লেকপথে যাওয়া যায়। কাপ্তাই জাতীয় উদ্যান, কর্ণফুলী নদীর পাড় আর পাহাড়ি পথ মিলিয়ে কাপ্তাইয়ে আলাদা একটি দিন কাটানো যায়।
৬. শহরের অন্যান্য জায়গা: পুলিশ লাইনস এলাকার পলওয়েল পার্ক, উপজাতীয় সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটের জাদুঘর আর বনরূপা বাজার ঘুরে দেখতে পারেন। জাদুঘরে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর পোশাক, গয়না আর ব্যবহার্য জিনিস সংরক্ষিত আছে।
কখন যাবেন
লেক ও ঝরনার পূর্ণ রূপ দেখতে চাইলে বর্ষা ও শরৎ, অর্থাৎ জুলাই থেকে অক্টোবর সবচেয়ে ভালো। তখন লেক কানায় কানায় ভরা, পাহাড় সবুজ, শুভলংয়ে পানির ধারা প্রবল। তবে বর্ষায় পাহাড়ধসের ঝুঁকি থাকে, ভারী বৃষ্টির সময় লেকে নৌভ্রমণ এড়িয়ে চলুন।
বিজ্ঞাপন
নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি আবহাওয়া আরামদায়ক, নৌভ্রমণও নিরাপদ। এ সময় ঝরনায় পানি কম থাকলেও লেকের সৌন্দর্য কমে না। গ্রীষ্মে লেকের পানি অনেক নেমে যায়, গরমও বেশি থাকে।
থাকা, খাওয়া ও কেনাকাটা
শহরের রিজার্ভ বাজার, বনরূপা ও তবলছড়ি এলাকায় সাধারণ ও মাঝারি মানের হোটেল আছে, প্রতি রাতের ভাড়া আনুমানিক ১০০০ থেকে ৪০০০ টাকা। পর্যটন করপোরেশনের মোটেলসহ লেকের পাড়ে কিছু রিসোর্টও আছে, সেখান থেকে লেকের দৃশ্য দেখা যায়, ভাড়াও বেশি।
খাবারের তালিকায় রাখুন বাঁশের চোঙে রান্না করা ব্যাম্বু চিকেন, কলাপাতায় মুড়ে রান্নার পাহাড়ি পদ্ধতি হেবাং আর কাপ্তাই লেকের তাজা মাছ। লেকের দ্বীপে থাকা রেস্তোরাঁগুলোতে খেতে চাইলে আগে থেকে অর্ডার দিয়ে রাখা ভালো। কেনাকাটার জন্য বনরূপা ও তবলছড়ির দোকানগুলোতে পাহাড়ি নারীদের হাতে বোনা কাপড়, শাল আর ব্যাগ পাওয়া যায়।
বিজ্ঞাপন
সন্ধ্যার দিকে পর্যটন এলাকার ঘাট বা লেকের পাড়ে বসে সূর্যাস্ত দেখা রাঙামাটির সহজ কিন্তু মনে রাখার মতো অভিজ্ঞতা। শহরে রিকশা কম, চলাফেরার জন্য সিএনজি অটোরিকশাই প্রধান বাহন, ভাড়া আগে ঠিক করে নিন। শহরের বাজারে সকালের দিকে গেলে পাহাড়ি নারীদের নিয়ে আসা সবজি, ফল আর নানা স্থানীয় পণ্য দেখা যায়।
দুই রাত তিন দিনের সাধারণ ভ্রমণে, কয়েকজন মিলে নৌকা ভাগ করলে, ঢাকা থেকে জনপ্রতি আনুমানিক পাঁচ থেকে আট হাজার টাকা খরচ ধরা যায়।
সতর্কতা
লেকে নৌকায় ওঠার আগে লাইফ জ্যাকেট নিশ্চিত করুন, শিশুদের তা পরিয়ে রাখুন। নৌকার কিনারে বসে হাত-পা পানিতে ঝুলিয়ে রাখবেন না। ঝরনার পাথর পিচ্ছিল, ওপরে উঠে ছবি তোলার ঝুঁকি নেবেন না। পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মানুষের ছবি তোলার আগে অনুমতি নিন। নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে কখনো কখনো কিছু এলাকায় পর্যটক চলাচল সীমিত করা হয়, জেলা প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে চলুন।
বিজ্ঞাপন
সাধারণ জিজ্ঞাসা
রাঙামাটি থেকে কি সাজেক যাওয়া যায়?
সাজেক রাঙামাটি জেলায় হলেও রাঙামাটি শহর থেকে সরাসরি সহজ সড়ক নেই। পর্যটকেরা সাধারণত খাগড়াছড়ি হয়ে সাজেক যান।
শীতকালে শুভলং ঝরনায় কি পানি থাকে?
বিজ্ঞাপন
শীতের শুরুতে কিছু পানি থাকে, শেষ দিকে প্রায় শুকিয়ে যায়। ঝরনার পূর্ণ রূপ দেখতে বর্ষা বা শরতে যান।
রাঙামাটি ঘুরতে কয়দিন লাগে?
লেকের নৌভ্রমণ আর শহর ঘুরতে দুই দিন যথেষ্ট। কাপ্তাই যোগ করলে আরও এক দিন রাখুন।
ঝুলন্ত সেতুতে কি সারা বছর হাঁটা যায়?
বিজ্ঞাপন
সাধারণত যায়, তবে বর্ষায় লেকের পানি খুব বেড়ে গেলে সেতু ডুবে যেতে পারে। তখন চলাচল বন্ধ রাখা হয়।