সুন্দরবন ভ্রমণ: যাওয়ার উপায়, প্যাকেজ ট্যুর, খরচ ও সেরা সময়
ট্রাভেল ডেস্ক · খুলনা
প্রকাশ:
সুন্দরবন ঘোরার ধরনটা অন্য যেকোনো ভ্রমণের চেয়ে আলাদা। এখানে হোটেলে উঠে নিজের মতো ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ নেই। বনের ভেতরে থাকতে হয় জাহাজ বা লঞ্চে, ঘুরতে হয় বন বিভাগের অনুমতি নিয়ে, সশস্ত্র প্রহরী সঙ্গে রেখে। এ কারণেই বেশির ভাগ মানুষ খুলনা থেকে ছাড়া দুই রাত তিন দিনের প্যাকেজ ট্যুরে সুন্দরবন ভ্রমণ করেন।
বিজ্ঞাপন
সময় বা বাজেট কম হলে ভিন্ন পথও আছে। বাগেরহাটের মোংলা থেকে ট্রলার ভাড়া করে করমজল ঘুরে আসা যায় এক দিনেই। সাতক্ষীরার শ্যামনগর দিয়েও বনের পশ্চিম অংশে দিনে দিনে ঘোরার ব্যবস্থা আছে। তবে বনের গভীরের কটকা, কচিখালী বা জামতলা সৈকত দেখতে চাইলে প্যাকেজ ট্যুরই বাস্তবসম্মত।
সুন্দরবন কিসের জন্য বিখ্যাত, তা প্রায় সবারই জানা: বিশ্বের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন, রয়েল বেঙ্গল টাইগারের আবাস আর ইউনেসকো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্য। বনের বাংলাদেশ অংশ খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলাজুড়ে বিস্তৃত।
ঢাকা থেকে সুন্দরবন যাওয়ার উপায়
১. খুলনা পর্যন্ত বাসে: পদ্মা সেতু চালুর পর ঢাকা থেকে খুলনায় বাসে সময় অনেক কমেছে, সাধারণত পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা লাগে। সায়েদাবাদ, যাত্রাবাড়ী ও গাবতলী এলাকা থেকে খুলনার বাস ছাড়ে। ভাড়া আনুমানিক ৭০০ থেকে ১৫০০ টাকা।
বিজ্ঞাপন
২. ট্রেনে: কমলাপুর থেকে খুলনাগামী কয়েকটি আন্তঃনগর ট্রেন চলে। সময়সূচি ও রুট বদলাতে পারে, তাই টিকিট কাটার সময় দেখে নিন।
৩. উড়োজাহাজে: ঢাকা থেকে যশোর বিমানবন্দর পর্যন্ত ফ্লাইট আছে। সেখান থেকে সড়কপথে খুলনা যেতে দেড় ঘণ্টার মতো লাগে।
৪. মোংলা হয়ে: খুলনা থেকে মোংলা সড়কপথে এক ঘণ্টার মতো। মোংলা ঘাট থেকে ট্রলারে করমজল পৌঁছাতে আরও প্রায় এক ঘণ্টা।
প্যাকেজ ট্যুরে গেলে সাধারণত খুলনা শহরের নির্দিষ্ট ঘাট থেকে সকালে জাহাজ ছাড়ে। তাই আগের রাতে ঢাকা থেকে রওনা দিলে সময়মতো পৌঁছানো যায়।
বিজ্ঞাপন
প্যাকেজ ট্যুরে কী থাকে
খুলনা ও মোংলার অনেক ট্যুর অপারেটর শীত মৌসুমে নিয়মিত সুন্দরবনে জাহাজ পাঠায়। সাধারণ একটি প্যাকেজে থাকে জাহাজে দুই রাত থাকার কেবিন বা বার্থ, প্রতিদিনের সব খাবার, বন বিভাগের প্রবেশ ফি ও অনুমতি, সশস্ত্র বনপ্রহরী, গাইড আর বনের ছোট খালে ঢোকার জন্য ছোট নৌকা।
প্যাকেজ বেছে নেওয়ার সময় কয়েকটি বিষয় দেখে নিন। জাহাজে কেবিন কয়জনের, শৌচাগার সংযুক্ত কি না, এসি আছে কি না, লাইফ জ্যাকেট ও প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা কেমন। কোন কোন জায়গায় নামানো হবে, তালিকাটি লিখিতভাবে নিন। অপারেটরের আগের ভ্রমণকারীদের অভিজ্ঞতা জানতে পারলে আরও ভালো।
সুন্দরবনে কী কী দেখার আছে
বিজ্ঞাপন
১. করমজল: মোংলার কাছে বন বিভাগের বন্যপ্রাণী ও কুমির প্রজনন কেন্দ্র। কাঠের তৈরি হাঁটাপথে বনের ভেতর দিয়ে হাঁটা যায়, চিত্রা হরিণ ও বানর চোখে পড়ে। দিনে দিনে ঘোরার জন্য সবচেয়ে সহজ জায়গা।
২. হারবাড়িয়া: বনের ভেতরে কাঠের হাঁটাপথ আর পুকুরসহ একটি ইকোট্যুরিজম কেন্দ্র।
৩. কটকা: বন বিভাগের অফিস, পর্যবেক্ষণ টাওয়ার আর হরিণের পালের জন্য পরিচিত। কাছেই জামতলা সৈকত, যেখানে বনের ভেতর দিয়ে হেঁটে সমুদ্রের তীরে পৌঁছাতে হয়।
৪. কচিখালী: খোলা ঘাসবন, যেখানে হরিণ দেখার সম্ভাবনা বেশি। ভাগ্য ভালো হলে নরম মাটিতে বাঘের পায়ের ছাপও দেখা যায়।
বিজ্ঞাপন
৫. দুবলার চর: বঙ্গোপসাগরের কাছে জেলেদের মৌসুমি বসতি, শীতে এখানে শুঁটকি তৈরির কর্মযজ্ঞ চলে। প্রতিবছর এখানে রাসমেলা নামে একটি উৎসব হয়।
বনের পশ্চিম অংশ দেখতে চাইলে সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার মুন্সীগঞ্জ এলাকা থেকে নৌকায় কলাগাছিয়া ইকোট্যুরিজম কেন্দ্র ঘুরে আসা যায়। কাঠের হাঁটাপথ আর ওয়াচটাওয়ারসহ এই কেন্দ্রটি দিনে দিনে ঘোরার উপযোগী। এদিকের পথ তুলনামূলক কম ভিড়ের।
প্যাকেজ ট্যুরের দিনগুলো সাধারণত এভাবে কাটে: ভোরে ছোট নৌকায় খালের ভেতরে পাখি ও হরিণ দেখা, নাশতার পর কোনো একটি কেন্দ্রে নেমে হাঁটা, দুপুরে জাহাজ এগিয়ে চলে পরের গন্তব্যে, বিকেলে আবার নামা। সন্ধ্যার পর জাহাজ নিরাপদ জায়গায় নোঙর করে, রাতে ডেকে বসে বনের শব্দ শোনাও এই ভ্রমণের অংশ।
পথে নদী আর খালে কুমির, ডলফিন, মাছরাঙা, বক আর নানা প্রজাতির পাখি দেখা যায়। সুন্দরী, গেওয়া, গরান, কেওড়া আর গোলপাতার বন চিনিয়ে দেন গাইডেরা। বাঘ দেখা খুবই ভাগ্যের ব্যাপার, প্যাকেজ নেওয়ার সময় বাঘ দেখানোর নিশ্চয়তা কেউ দিলে বুঝবেন তা বাড়িয়ে বলা।
বিজ্ঞাপন
কখন যাবেন
নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি সুন্দরবন ভ্রমণের সবচেয়ে ভালো সময়। এ সময় নদী শান্ত থাকে, বৃষ্টি হয় না, মশাও তুলনামূলক কম। অক্টোবর ও মার্চেও যাওয়া যায়। এপ্রিল থেকে গরম ও সাগরে ঝড়ের আশঙ্কা বাড়ে।
মাছ ও বন্যপ্রাণীর প্রজনন মৌসুমে বন বিভাগ প্রতিবছর বনে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত তিন মাস পর্যটকদের প্রবেশও বন্ধ রাখা হয়েছে। এই সময়ে কোনো ট্যুর অপারেটর নিয়ে যেতে চাইলে বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে নিন।
সুন্দরবন ভ্রমণের খরচ
বিজ্ঞাপন
খরচ সবচেয়ে বেশি নির্ভর করে জাহাজের মানের ওপর। সাধারণ মানের লঞ্চে দুই রাত তিন দিনের প্যাকেজ জনপ্রতি আনুমানিক ৮ থেকে ১২ হাজার টাকা, মাঝারি মানের জাহাজে আনুমানিক ১২ থেকে ২০ হাজার টাকা, আর বিলাসবহুল জাহাজে এর বেশি। এর সঙ্গে ঢাকা-খুলনা যাওয়া-আসার খরচ যোগ হবে। বিদেশি পর্যটকদের প্রবেশ ফি দেশি পর্যটকদের চেয়ে বেশি।
এক দিনের করমজল ভ্রমণে খরচ অনেক কম। মোংলা থেকে ট্রলার ভাড়া দলের আকার ও দর-কষাকষি অনুযায়ী আনুমানিক ১৫০০ থেকে ৩০০০ টাকা, সঙ্গে জনপ্রতি প্রবেশ ফি।
সতর্কতা ও প্রস্তুতি
বনপ্রহরী বা গাইডের অনুমতি ছাড়া কখনো জাহাজ থেকে নামবেন না, দল ছেড়ে একা বনের ভেতরে যাবেন না। নদী বা খালে নামা বিপজ্জনক, কুমির ও তীব্র স্রোত দুটোই আছে। উচ্চ শব্দে গান বাজানো, পশুপাখিকে খাবার দেওয়া বা বিরক্ত করা নিষেধ। বনে প্লাস্টিক ফেলবেন না।
বিজ্ঞাপন
সঙ্গে নিন হালকা গরম কাপড়, কারণ শীতের রাতে নদীতে ঠান্ডা বেশি লাগে। মশা তাড়ানোর ক্রিম, টর্চ, পাওয়ার ব্যাংক, আরামদায়ক জুতা আর প্রয়োজনীয় ওষুধও নিন। বনের গভীরে মোবাইল নেটওয়ার্ক প্রায় থাকে না, পরিবারকে আগে থেকে জানিয়ে রাখুন। দূরবিন থাকলে পাখি ও হরিণ দেখার আনন্দ বাড়বে।
কটকা বা দুবলার চরের মতো সাগরের কাছের এলাকায় জাহাজ চলার সময় দুলুনি বেশি হয়, যাঁদের সমুদ্রপীড়ার প্রবণতা আছে তাঁরা চিকিৎসকের পরামর্শমতো ওষুধ সঙ্গে রাখুন। বনের ভেতরে জেলে, মৌয়াল আর বাওয়ালিদের দেখা পেলে তাঁদের কাজের প্রতি সম্মান দেখান, ছবি তোলার আগে অনুমতি নিন। জাহাজের ডেকে রাতে হাঁটার সময় রেলিংয়ের কাছে সাবধান থাকুন, বিশেষ করে শিশুদের নিয়ে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
এক দিনে কি সুন্দরবন ঘোরা যায়?
বিজ্ঞাপন
মোংলা থেকে করমজল বা সাতক্ষীরার দিক থেকে বনের কাছের অংশ এক দিনে ঘোরা যায়। বনের গভীরের জায়গাগুলো দেখতে অন্তত দুই রাত লাগে।
সুন্দরবনে কি বাঘ দেখা যায়?
বাঘ আছে, কিন্তু পর্যটকদের চোখে পড়া খুবই বিরল। হরিণ, বানর, কুমির ও নানা পাখি দেখার সম্ভাবনা অনেক বেশি।
শিশুদের নিয়ে সুন্দরবন যাওয়া কি নিরাপদ?
বিজ্ঞাপন
নির্ভরযোগ্য অপারেটরের ভালো জাহাজে গেলে যাওয়া যায়। জাহাজের ডেকে ও নৌকায় শিশুদের সারাক্ষণ লাইফ জ্যাকেট পরিয়ে রাখুন।
নিজে নিজে কি সুন্দরবনে ঢোকা যায়?
বন বিভাগের অনুমতি ও নির্ধারিত ফি দিয়ে যাওয়া সম্ভব, তবে নৌযান, প্রহরী ও গাইডের ব্যবস্থা নিজেকেই করতে হয়। প্রথমবার যাঁরা যাচ্ছেন, তাঁদের জন্য প্যাকেজ ট্যুরই সহজ।