ভিসা চেক করার নিয়ম: পাসপোর্ট নম্বর দিয়ে অনলাইনে যাচাই
ট্রাভেল ডেস্ক
প্রকাশ:
হাতে একটি ভিসার কপি পেয়েছেন, কিন্তু নিশ্চিত হতে পারছেন না এটি আসল কি না? যে দেশের ভিসা, সেই দেশের সরকারি ওয়েবসাইট বা অ্যাপে গিয়ে পাসপোর্ট নম্বর অথবা ভিসা নম্বর দিয়ে যাচাই করাই ভিসা চেক করার একমাত্র নির্ভরযোগ্য উপায়। সেখানে আপনার নাম, পাসপোর্ট নম্বর, ভিসার ধরন ও মেয়াদ মিলে গেলে তবেই ধরে নেওয়া যায় ভিসাটি বৈধ।
বিজ্ঞাপন
প্রতিবছর বহু মানুষ ভুয়া ভিসার ফাঁদে পড়ে জমি বিক্রির টাকা, ধারদেনার টাকা হারান। অনেক ক্ষেত্রে দালাল একটি ঝকঝকে পিডিএফ ধরিয়ে দেন, যা দেখতে আসলের মতোই। আবার কখনো আসল ভিসা থাকলেও তাতে লেখা পেশা বা নিয়োগকর্তা দালালের প্রতিশ্রুতির সঙ্গে মেলে না। এই দুই বিপদ এড়াতেই টাকা দেওয়ার আগে নিজে ভিসা যাচাই করা জরুরি।
সব দেশের যাচাই পদ্ধতি এক নয়। তবে মূল নীতি একই: শুধু সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারি ওয়েবসাইট বা অ্যাপ ব্যবহার করবেন, দালালের পাঠানো লিংকে নয়।
ভিসা চেক করার সাধারণ ধাপ
১. কাগজ হাতে নিন: পাসপোর্ট, ভিসার কপি আর ভিসা নম্বর বা আবেদন নম্বর পাশে রাখুন। অনেক দেশের ভিসায় একটি নির্দিষ্ট নম্বর থাকে, যেটি যাচাইয়ে লাগে।
বিজ্ঞাপন
২. সরকারি ওয়েবসাইট খুঁজে নিন: সংশ্লিষ্ট দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা ইমিগ্রেশন বিভাগের ওয়েবসাইটে ভিসা যাচাইয়ের অপশন থাকে। সাধারণত এসব ঠিকানায় সরকারি ডোমেইন থাকে, যেমন দেশের সংক্ষিপ্ত নামের আগে gov লেখা।
৩. তথ্য দিন: পাসপোর্ট নম্বর, জাতীয়তা হিসেবে বাংলাদেশ, ভিসা নম্বর বা আবেদন নম্বর আর নিরাপত্তা কোড পূরণ করে অনুসন্ধান করুন।
৪. ফল মিলিয়ে দেখুন: পর্দায় যে তথ্য আসবে, সেখানে আপনার নামের বানান, পাসপোর্ট নম্বর, জন্মতারিখ, ভিসার ধরন, নিয়োগকর্তার নাম ও মেয়াদ ভিসার কপির সঙ্গে হুবহু মিলিয়ে নিন।
৫. প্রমাণ রাখুন: যাচাইয়ের ফলের স্ক্রিনশট বা প্রিন্ট সংরক্ষণ করুন। পরে কোনো বিরোধ হলে কাজে লাগবে।
বিজ্ঞাপন
দেশভেদে কোথায় যাচাই করবেন
সৌদি আরব: সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভিসা সেবার ওয়েবসাইট visa.mofa.gov.sa-তে ভিসা অনুসন্ধানের অপশন আছে। পাসপোর্ট নম্বর ও জাতীয়তা দিয়ে ভিসার তথ্য দেখা যায়।
সংযুক্ত আরব আমিরাত: দেশটির পরিচয়, নাগরিকত্ব, শুল্ক ও বন্দর নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষের (আইসিপি) স্মার্ট সেবার ওয়েবসাইট ও অ্যাপে ভিসা বা প্রবেশ অনুমতির বৈধতা যাচাই করা যায়। দুবাইয়ের ভিসার ক্ষেত্রে দুবাইয়ের রেসিডেন্সি ও বিদেশিবিষয়ক কর্তৃপক্ষের সেবাও ব্যবহার হয়।
কাতার, কুয়েত ও ওমান: এসব দেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা পুলিশের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট ও অ্যাপে ভিসা অনুসন্ধানের ব্যবস্থা আছে। ওমানের ক্ষেত্রে রয়্যাল ওমান পুলিশের ই-ভিসা ব্যবস্থায় আবেদনের অবস্থা দেখা যায়।
বিজ্ঞাপন
মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর: মালয়েশিয়ার ইমিগ্রেশন বিভাগ আর সিঙ্গাপুরের জনশক্তি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে কর্মী ভিসা বা ওয়ার্ক পাসের অবস্থা যাচাইয়ের সুযোগ আছে।
এসব ওয়েবসাইটের মেনুর নাম মাঝে মাঝে বদলায়। কোথায় অপশনটি আছে খুঁজে না পেলে সংশ্লিষ্ট দেশের ঢাকার দূতাবাসের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে দেওয়া নির্দেশনা দেখুন। ভ্রমণ ভিসা বা ই-ভিসার ক্ষেত্রে যে ওয়েবসাইট থেকে আবেদন করা হয়েছিল, সেখানেই আবেদন নম্বর দিয়ে অবস্থা দেখা যায়।
আসল ভিসা চেনার উপায়
১. সরকারি ওয়েবসাইটে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে কি না: এটিই প্রথম ও প্রধান শর্ত। কপি যত সুন্দরই হোক, সরকারি ব্যবস্থায় তথ্য না মিললে সেটি সন্দেহজনক।
বিজ্ঞাপন
২. নাম ও পাসপোর্ট নম্বর হুবহু মিলছে কি না: একটি অক্ষরের অমিলও বিমানবন্দরে আটকে যাওয়ার কারণ হতে পারে।
৩. ভিসার ধরন ঠিক আছে কি না: চাকরির জন্য যাচ্ছেন অথচ ভিসা ভ্রমণ বা ভিজিট ধরনের, এমন হলে বিপদ। ভিজিট ভিসায় গিয়ে পরে কাজের অনুমতি করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি অনেক প্রতারণার শুরু।
৪. পেশা ও নিয়োগকর্তার নাম: ভিসায় লেখা পেশা আর যে কাজের কথা বলা হয়েছে, তা মেলে কি না দেখুন। নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের নাম লিখে খোঁজ নিন, প্রতিষ্ঠানটির অস্তিত্ব আছে কি না।
৫. মেয়াদ: অনেক ভিসা ইস্যুর পর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ব্যবহার করতে হয়। মেয়াদ পেরিয়ে গেলে সেটি দিয়ে আর প্রবেশ করা যাবে না।
বিজ্ঞাপন
বিদেশে চাকরির ক্ষেত্রে বাড়তি যাচাই
শুধু ভিসা যাচাই করলেই হবে না। যে রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে যাচ্ছেন, সেটি সরকারি লাইসেন্সপ্রাপ্ত কি না, তা জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) ওয়েবসাইট bmet.gov.bd-তে দেখে নিন। বৈধভাবে বিদেশে চাকরিতে যেতে বিএমইটির নিবন্ধন, বহির্গমন ছাড়পত্র ও স্মার্ট কার্ড লাগে। এগুলো ছাড়া বিমানবন্দরে আটকে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
চাকরির চুক্তিপত্র নিজে পড়ুন বা বিশ্বস্ত কাউকে দিয়ে পড়িয়ে নিন। বেতন, কাজের ধরন, থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা আর চুক্তির মেয়াদ লেখা আছে কি না দেখুন। এজেন্সিকে টাকা দিলে অবশ্যই রসিদ নিন। নগদ টাকার বদলে ব্যাংকের মাধ্যমে লেনদেন করলে প্রমাণ থাকে।
যাত্রার আগে বিএমইটির নির্ধারিত প্রশিক্ষণ ও প্রাক-বহির্গমন ব্রিফিংয়ে অংশ নিন। সেখানে গন্তব্য দেশের আইন, কাজের পরিবেশ আর বিপদে কোথায় যোগাযোগ করবেন তা জানানো হয়। ঢাকার বিমানবন্দরে প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কেও প্রয়োজনীয় তথ্য ও সহায়তা পাওয়া যায়।
বিজ্ঞাপন
ভ্রমণ ভিসা ও ই-ভিসার ক্ষেত্রে
এখন অনেক দেশ ভ্রমণ ভিসা দেয় অনলাইনে, ই-ভিসা আকারে। আবেদনকারীর ইমেইলে একটি পিডিএফ আসে, যা প্রিন্ট করে বিমানবন্দরে দেখাতে হয়। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি দেখতে প্রায় একই রকম বেসরকারি ওয়েবসাইট। এসব সাইট সরকারি ফির কয়েক গুণ টাকা নেয়, কখনো কখনো ভিসাই দেয় না। আবেদনের আগে সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাসের ওয়েবসাইট থেকে সরকারি পোর্টালের ঠিকানা নিশ্চিত হয়ে নিন।
ই-ভিসা হাতে পাওয়ার পর আবেদন নম্বর দিয়ে একই পোর্টালে তার অবস্থা যাচাই করুন। নাম, পাসপোর্ট নম্বর, প্রবেশের ধরন (একবার না একাধিকবার) আর থাকার মেয়াদ মিলিয়ে নিন। ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে আবেদন করালেও যাচাইয়ের কাজটি নিজে করুন। বিমানবন্দরে এয়ারলাইনের কর্মীরাও অনেক সময় ভিসা যাচাই করেন, তাই প্রিন্ট কপির সঙ্গে মোবাইলেও একটি কপি রাখুন।
প্রতারণার সাধারণ লক্ষণ
বিজ্ঞাপন
দালাল যদি ভিসার কপি শুধু মেসেজিং অ্যাপে পাঠান কিন্তু যাচাইয়ের নম্বর দিতে গড়িমসি করেন, তাহলে সাবধান হোন। কেউ যদি নিজের তৈরি লিংকে ঢুকে যাচাই করতে বলেন, সেটিও বিপদসংকেত, কারণ ভুয়া ওয়েবসাইটেও আসল তথ্যের মতো ফল দেখানো সম্ভব। পুরো টাকা আগে চাওয়া, খুব অল্প সময়ে উড়িয়ে নেওয়ার চাপ দেওয়া, বা লিখিত চুক্তি দিতে না চাওয়াও সন্দেহের কারণ।
প্রতারণার শিকার হলে দেরি না করে নিকটস্থ থানায় অভিযোগ করুন এবং বিএমইটি বা প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অভিযোগ সেবায় জানান। লেনদেনের রসিদ, মেসেজ আর কাগজপত্র সংরক্ষণ করে রাখুন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
শুধু পাসপোর্ট নম্বর দিয়ে কি ভিসা চেক করা যায়?
বিজ্ঞাপন
অনেক দেশের ওয়েবসাইটে পাসপোর্ট নম্বর আর জাতীয়তা দিয়েই খোঁজা যায়। কিছু ক্ষেত্রে ভিসা নম্বর বা আবেদন নম্বরও লাগে।
ভিসা চেক করতে কি টাকা লাগে?
সরকারি ওয়েবসাইটে যাচাই সাধারণত বিনা মূল্যে করা যায়। যাচাইয়ের নামে কেউ টাকা চাইলে সতর্ক হোন।
সরকারি ওয়েবসাইটে ভিসার তথ্য না এলে কী করব?
বিজ্ঞাপন
তথ্য ঠিকভাবে লিখেছেন কি না আবার দেখুন। তারপরও না এলে টাকা লেনদেন বন্ধ রাখুন, এজেন্সির কাছে ব্যাখ্যা চান এবং প্রয়োজনে দূতাবাসে খোঁজ নিন।
ভিসা আসল হলেই কি নিরাপদ?
না। ভিসার ধরন, পেশা, নিয়োগকর্তা ও চুক্তির শর্ত প্রতিশ্রুতির সঙ্গে মিলছে কি না এবং বিএমইটির ছাড়পত্র আছে কি না, সেটিও নিশ্চিত হতে হবে।