সেন্টমার্টিন যাওয়ার উপায়: জাহাজ, থাকা, নিয়মকানুন ও সেরা সময়
ট্রাভেল ডেস্ক · কক্সবাজার
প্রকাশ:
সেন্টমার্টিন এখন আর ইচ্ছামতো যেকোনো সময় ঘুরে আসার জায়গা নয়। দেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপটির পরিবেশ রক্ষায় সরকার পর্যটনে কড়াকড়ি আরোপ করেছে। সাম্প্রতিক মৌসুমগুলোতে পর্যটকেরা যেতে পেরেছেন কেবল নভেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত। এর মধ্যে নভেম্বরে শুধু দিনে গিয়ে দিনেই ফেরার অনুমতি ছিল, রাতে থাকা যেত ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে। ফেব্রুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত পর্যটক যাওয়া বন্ধ থাকে।
বিজ্ঞাপন
যাওয়ার একমাত্র ব্যবহারিক উপায় সরকার অনুমোদিত পর্যটকবাহী জাহাজ। দিনে কতজন পর্যটক যেতে পারবেন, তা-ও নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়, আর জাহাজের টিকিটের সঙ্গে অনলাইনে নিবন্ধন করতে হয়। অর্থাৎ পরিকল্পনা শুরু করতে হবে টিকিট নিশ্চিত করা দিয়ে, হোটেল দিয়ে নয়।
নিয়মগুলো প্রতি মৌসুমের আগে নতুন করে ঘোষণা করা হয়, কখনো কখনো বদলায়ও। তাই নিচের তথ্যগুলো ধারণা নেওয়ার জন্য, যাত্রার আগে পরিবেশ মন্ত্রণালয় ও কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের সর্বশেষ নির্দেশনা অবশ্যই মিলিয়ে নেবেন।
দ্বীপটি কোথায় এবং কেন আলাদা
সেন্টমার্টিন দ্বীপ কক্সবাজার জেলার টেকনাফ উপজেলার অংশ। টেকনাফের মূল ভূখণ্ডের দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের মধ্যে এর অবস্থান। স্থানীয়ভাবে একে নারিকেল জিঞ্জিরা নামেও ডাকা হয়, কারণ একসময় দ্বীপজুড়ে ছিল নারকেলগাছের সারি। আয়তনে ছোট এই দ্বীপ পায়ে হেঁটে বা সাইকেলে কয়েক ঘণ্টাতেই ঘুরে ফেলা যায়।
বিজ্ঞাপন
দ্বীপের চারপাশের পানিতে প্রবাল, শৈবাল, নানা প্রজাতির মাছ আর সামুদ্রিক কচ্ছপের বাস। অতিরিক্ত পর্যটক, অপরিকল্পিত স্থাপনা আর প্লাস্টিক বর্জ্যে এই পরিবেশ মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়েছিল। সেই কারণেই বিধিনিষেধগুলো এসেছে, এবং পর্যটক হিসেবে সেগুলো মানা আমাদের দায়িত্ব।
সেন্টমার্টিন যাওয়ার উপায়
১. ঢাকা থেকে কক্সবাজার: প্রথমে বাস, ট্রেন বা উড়োজাহাজে কক্সবাজার পৌঁছাতে হবে। জাহাজ ছাড়ে সাধারণত সকালে, তাই আগের রাতে কক্সবাজারে পৌঁছে থাকা বা রাতের বাসে ভোরে পৌঁছানো সবচেয়ে নিরাপদ পরিকল্পনা।
২. কক্সবাজার থেকে জাহাজে: আগে বেশির ভাগ জাহাজ টেকনাফ থেকে ছাড়ত। নাফ নদীর নাব্যতা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে সাম্প্রতিক মৌসুমগুলোতে জাহাজ ছাড়ছে কক্সবাজার শহরের নুনিয়াছড়া এলাকার বিআইডব্লিউটিএ ঘাট থেকে। এ পথে একদিকে ছয়-সাত ঘণ্টার মতো সময় লাগে। কোন ঘাট থেকে জাহাজ ছাড়বে, টিকিট কাটার সময় তা নিশ্চিত হয়ে নিন।
বিজ্ঞাপন
৩. টিকিট ও নিবন্ধন: জাহাজের টিকিট অনলাইনে কাটার সময় যাত্রীর নাম, জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্মনিবন্ধনের তথ্য দিতে হয়। টিকিটের সঙ্গে একটি কিউআর কোড বা ট্রাভেল পাস দেওয়া হয়, যা ঘাটে ও দ্বীপে দেখাতে হতে পারে। অননুমোদিত ট্রলার বা স্পিডবোটে যাওয়া বেআইনি ও ঝুঁকিপূর্ণ, তাই এর প্রস্তাবে কখনো রাজি হবেন না।
৪. ফেরার টিকিট: রাত্রিযাপনের মৌসুমে গেলে যাওয়া-আসার টিকিট একসঙ্গে নিশ্চিত করুন। ফেরার তারিখ ঠিক না থাকলে দ্বীপে আটকে পড়ার ঝুঁকি থাকে।
যাওয়ার সেরা সময় এবং কী কী নিয়ম মানতে হয়
যেহেতু ভ্রমণ এখন তিন মাসে সীমাবদ্ধ, সেরা সময় বলতে ওই সময়টুকুই। ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে সাগর সবচেয়ে শান্ত থাকে, জাহাজযাত্রাও আরামদায়ক হয়। নভেম্বরে গেলে মনে রাখবেন, দিনের মধ্যেই ফিরতে হবে, ফলে দ্বীপে হাতে সময় থাকবে মাত্র কয়েক ঘণ্টা।
বিজ্ঞাপন
সাম্প্রতিক মৌসুমে ঘোষিত নিয়মগুলোর মধ্যে ছিল এগুলো।
১. রাতে আলো ও শব্দ নিষেধ: সৈকতে রাতে আলো জ্বালানো, উচ্চ শব্দে গান বাজানো ও বারবিকিউ পার্টি করা যাবে না। এতে কচ্ছপের ডিম পাড়া ব্যাহত হয়।
২. প্লাস্টিক বহনে নিষেধাজ্ঞা: একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক, যেমন পানির বোতল, চিপসের প্যাকেট, প্লাস্টিকের প্লেট নিয়ে যাওয়া নিরুৎসাহিত বা নিষিদ্ধ। নিজের পুনর্ব্যবহারযোগ্য পানির বোতল সঙ্গে নিন।
৩. প্রবাল ও প্রাণী রক্ষা: প্রবাল, শামুক-ঝিনুক, কচ্ছপ, কাঁকড়া বা অন্য কোনো প্রাণী ধরা, তোলা বা কেনাবেচা নিষিদ্ধ।
বিজ্ঞাপন
৪. যানবাহন নিয়ন্ত্রণ: সৈকতে মোটরসাইকেল বা সি-বাইকের মতো যান চালানো সীমিত বা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
৫. ছেঁড়াদ্বীপে বিধিনিষেধ: দ্বীপের দক্ষিণের ছোট্ট অংশ ছেঁড়াদ্বীপ পরিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন এলাকা। সেখানে যাওয়ার ব্যাপারে বিধিনিষেধ থাকতে পারে, স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে চলুন।
দ্বীপে কী দেখবেন
জাহাজ ভেড়ে দ্বীপের উত্তর দিকের জেটিতে। সেখান থেকে হেঁটে বা ভ্যানে দ্বীপের যেকোনো প্রান্তে যাওয়া যায়। পশ্চিম সৈকত সূর্যাস্ত দেখার সবচেয়ে ভালো জায়গা, সারি সারি নারকেলগাছ আর পাথুরে তীর মিলে দৃশ্যটি অন্য রকম লাগে। উত্তর সৈকত তুলনামূলক বেশি জমজমাট, জেটির কাছেই হওয়ায় দিনে দিনে ঘুরতে আসা পর্যটকেরা সাধারণত এদিকটাই দেখেন।
বিজ্ঞাপন
ভাটার সময় দ্বীপের চারপাশে পানির নিচ থেকে প্রবাল আর পাথর জেগে ওঠে। স্বচ্ছ পানিতে ছোট মাছ আর শৈবাল দেখা যায়। অনেকে সাইকেল ভাড়া নিয়ে দ্বীপের ভেতরের গ্রামগুলো ঘুরে দেখেন। জেলেদের নৌকা, শুঁটকি শুকানোর মাচা আর দ্বীপবাসীর সাদামাটা জীবন কাছ থেকে দেখাও এই ভ্রমণের বড় পাওয়া। রাতে থাকার সুযোগ পেলে অন্ধকার আকাশে তারার মেলা দেখতে ভুলবেন না, আলো নিষেধাজ্ঞার কারণে এখানে আকাশ সত্যিই পরিষ্কার দেখা যায়।
সেন্টমার্টিনে থাকা ও খাওয়া
দ্বীপে থাকার ব্যবস্থা বলতে মূলত ছোট রিসোর্ট, কটেজ আর স্থানীয়দের গেস্টহাউস। বেশির ভাগই সাধারণ মানের, অনেক জায়গায় বিদ্যুৎ আসে সৌরবিদ্যুৎ বা জেনারেটর থেকে, তাও নির্দিষ্ট সময়ে। পর্যটকের সংখ্যা সীমিত বলে রাতে থাকতে চাইলে জাহাজের টিকিট নিশ্চিত হওয়ার পরই কক্ষ বুক করুন। মৌসুমে সাধারণ কটেজের ভাড়া আনুমানিক দুই থেকে পাঁচ হাজার টাকা, সমুদ্রের কাছের ভালো রিসোর্টে এর বেশি।
খাবারের মধ্যে সামুদ্রিক মাছই প্রধান। কোরাল, সুন্দরী পোয়া, রূপচাঁদা, চিংড়ি আর ডাব এখানকার পরিচিত স্বাদ। দ্বীপে সবকিছু মূল ভূখণ্ড থেকে আনতে হয় বলে দাম শহরের চেয়ে কিছুটা বেশি। খাওয়ার আগে দাম জেনে নেওয়ার অভ্যাস এখানেও কাজে দেবে।
বিজ্ঞাপন
খরচ ও প্রস্তুতি
খরচ সবচেয়ে বেশি নির্ভর করে জাহাজের শ্রেণির ওপর। কক্সবাজার থেকে যাওয়া-আসার জাহাজভাড়া শ্রেণিভেদে আনুমানিক তিন থেকে আট হাজার টাকা বা তার বেশি হতে পারে। এর সঙ্গে ঢাকা-কক্সবাজার যাতায়াত, কক্সবাজারে এক রাত থাকা আর দ্বীপে থাকা-খাওয়া যোগ করতে হবে। সব মিলিয়ে ঢাকা থেকে তিন-চার দিনের একটি ভ্রমণে জনপ্রতি আনুমানিক ১২ থেকে ২০ হাজার টাকা ধরে রাখা বাস্তবসম্মত।
সঙ্গে নগদ টাকা রাখুন। দ্বীপে মোবাইল নেটওয়ার্ক থাকে, তবে এটিএম বা কার্ডে লেনদেনের সুযোগ খুবই সীমিত।
জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্মনিবন্ধনের কপি, জাহাজের টিকিট ও নিবন্ধনের প্রমাণ, পুনর্ব্যবহারযোগ্য পানির বোতল, সানস্ক্রিন, টুপি, হালকা সুতির কাপড় আর প্রয়োজনীয় ওষুধ সঙ্গে নিন। পাওয়ার ব্যাংক রাখা ভালো, কারণ কটেজে সব সময় চার্জ দেওয়ার সুযোগ না-ও পেতে পারেন।
বিজ্ঞাপন
দ্বীপের সৈকতে পাথর ও প্রবালের টুকরো ছড়িয়ে থাকে, খালি পায়ে হাঁটলে পা কাটতে পারে। ভাটার সময় পাথুরে এলাকায় হাঁটার সময় সাবধানে পা ফেলুন। জোয়ারের সময় অচেনা জায়গায় সাঁতার কাটতে যাবেন না।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
সেন্টমার্টিনে কি এখন রাতে থাকা যায়?
সাম্প্রতিক নিয়মে ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে রাতে থাকা গেছে, নভেম্বরে যাওয়া গেছে শুধু দিনে দিনে। প্রতি মৌসুমের আগে নতুন ঘোষণা আসে, তাই যাওয়ার আগে তা দেখে নিন।
বিজ্ঞাপন
টেকনাফ থেকে কি এখন জাহাজ ছাড়ে?
সাম্প্রতিক মৌসুমগুলোতে নিরাপত্তা ও নাব্যতার কারণে জাহাজ মূলত কক্সবাজার শহর থেকে ছেড়েছে। পরিস্থিতি বদলালে টেকনাফ থেকে আবার চালু হতে পারে, টিকিট কাটার সময় ঘাটের নাম নিশ্চিত হোন।
শিশু নিয়ে সেন্টমার্টিন যাওয়া কি ঠিক হবে?
শান্ত মৌসুমে যাওয়া যায়, তবে লম্বা জাহাজযাত্রায় সমুদ্রপীড়া হতে পারে। শিশুর জন্য প্রয়োজনীয় খাবার, ওষুধ ও লাইফ জ্যাকেট নিশ্চিত করুন, আর পানিতে নামার সময় সারাক্ষণ পাশে থাকুন।
বিজ্ঞাপন
ফেব্রুয়ারিতে কি সেন্টমার্টিন যাওয়া যাবে?
সাম্প্রতিক নিয়মে ফেব্রুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত পর্যটক যাওয়া বন্ধ ছিল। এই সময়ে কেউ গোপনে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দিলে তা এড়িয়ে চলুন।