গ্যাস্ট্রিক দূর করার উপায়: খাওয়ার নিয়ম আর ঘরোয়া প্রতিকার
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ:
বুকজ্বালা, টক ঢেকুর, পেট ফাঁপা, খাওয়ার পর ভার ভার লাগা, পেটের ওপরের দিকে জ্বলুনি, এসব উপসর্গকে আমাদের দেশে এক কথায় গ্যাস্ট্রিক বলা হয়। চিকিৎসার ভাষায় এর পেছনে থাকতে পারে অ্যাসিড রিফ্লাক্স, বদহজম, পাকস্থলীর প্রদাহ বা আলসার। বেশির ভাগ মানুষের ক্ষেত্রে সমস্যাটা খাওয়ার অনিয়ম আর জীবনযাপনের কিছু অভ্যাস থেকে আসে, তাই সেখানে বদল আনলেই উপসর্গ অনেকটা কমে যায়।
বিজ্ঞাপন
গ্যাস্ট্রিক দূর করার উপায় তাই ওষুধের পাতা নয়, প্লেট আর ঘড়ি থেকে শুরু করতে হয়: কখন খাচ্ছেন, কতটা খাচ্ছেন, খাওয়ার পর কী করছেন। তবে কিছু লক্ষণ আছে যেগুলো দেখা দিলে ঘরোয়া প্রতিকারে সময় নষ্ট করা ঠিক নয়; সেগুলো শেষের দিকে আলাদা করে বলা হলো।
সমস্যাটা কোন ধরনের
উপসর্গ বুঝলে প্রতিকার বেছে নেওয়া সহজ হয়।
১. অ্যাসিড রিফ্লাক্স: বুক বা গলা জ্বালা, মুখে টক পানি উঠে আসা, শুয়ে থাকলে বা ভরপেট খাওয়ার পর বাড়ে। পাকস্থলীর অ্যাসিড খাদ্যনালিতে উঠে আসার কারণে এমন হয়।
বিজ্ঞাপন
২. বদহজম: খাওয়ার পর পেটের ওপরের দিকে ভার, অল্প খেয়েই পেট ভরা লাগা, বমি বমি ভাব, ঢেকুর।
৩. পেট ফাঁপা বা বায়ু: পেট ফুলে থাকা, বায়ু বের হওয়া, মোচড়ানো অস্বস্তি। ডাল, ছোলা, বাঁধাকপি, কোমল পানীয় বা দুধ সহ্য না হলে এটি বাড়ে।
৪. আলসারজাতীয় ব্যথা: খালি পেটে বা রাতে পেটের ওপরের দিকে জ্বলুনি ব্যথা, খেলে সাময়িক কমে। হেলিকোব্যাক্টর পাইলোরি নামের ব্যাকটেরিয়া এবং ব্যথানাশক ওষুধের অতিরিক্ত ব্যবহার এর বড় কারণ। এ ধরনের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরীক্ষা ও চিকিৎসা লাগে।
খাওয়ার নিয়ম: সবচেয়ে কার্যকর প্রতিকার
বিজ্ঞাপন
১. নির্দিষ্ট সময়ে খান: সকালের নাস্তা বাদ দিয়ে দুপুরে একবারে বেশি খাওয়া, বা দীর্ঘ সময় খালি পেটে থাকা গ্যাস্ট্রিকের অন্যতম কারণ। তিন বেলা মূল খাবার আর মাঝে হালকা নাশতা নির্দিষ্ট সময়ে খাওয়ার চেষ্টা করুন।
২. পরিমাণ কম, বারবার: একবারে পেট ভরে না খেয়ে প্লেটের পরিমাণ একটু কমিয়ে দিন। ভরপেট খেলে পাকস্থলীর ওপর চাপ বাড়ে, রিফ্লাক্স বেশি হয়।
৩. ধীরে চিবিয়ে খান: তাড়াহুড়ো করে খেলে বাতাস গিলে ফেলা হয়, পেট ফাঁপে। প্রতিটি লোকমা ভালো করে চিবিয়ে খান।
৪. খাওয়ার পর শোবেন না: রাতের খাবার ঘুমানোর অন্তত দুই-তিন ঘণ্টা আগে খান। দুপুরে খেয়েই বিছানায় গা এলিয়ে দেওয়ার অভ্যাসও বদলান, বরং ১০-১৫ মিনিট হালকা হাঁটুন।
বিজ্ঞাপন
৫. খাবারের সঙ্গে বেশি পানি নয়: খাওয়ার সময় অল্প পানি খান; বেশি পানি খেতে হলে খাওয়ার আধা ঘণ্টা আগে বা পরে খান।
৬. রাতে মাথা উঁচু রাখুন: রাতে বুকজ্বালা হলে খাটের মাথার দিকের পায়া কয়েক ইঞ্চি উঁচু করে দিন, বা কোমর থেকে মাথা পর্যন্ত ঢালু বালিশ ব্যবহার করুন। শুধু বালিশের সংখ্যা বাড়ালে ঘাড় বেঁকে উল্টো চাপ পড়ে।
কী খেলে গ্যাস কমে, কী খেলে বাড়ে
সবার শরীর একভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায় না। দুই সপ্তাহ একটা খাতায় লিখে রাখুন কোন খাবারের পর সমস্যা বাড়ছে, তাহলে নিজের ট্রিগার খাবারগুলো চেনা যাবে।
বিজ্ঞাপন
সাধারণত যেগুলো আরাম দেয়: ভাত, রুটি, চিড়া, ওটস, সেদ্ধ বা কম তেলে রান্না সবজি, লাউ, পেঁপে, কাঁচকলা, পাকা কলা, মাছ, চামড়া ছাড়া মুরগি, ডিম সেদ্ধ, টক দই। পাকা পেঁপে ও কলা হজমে সহায়ক বলে অনেকে উপকার পান। দই অন্ত্রের উপকারী জীবাণু বাড়াতে সাহায্য করে।
সাধারণত যেগুলো সমস্যা বাড়ায়: তেলে ভাজা ও চর্বিযুক্ত খাবার, বিরিয়ানি-তেহারির মতো ভারী খাবার, অতিরিক্ত ঝাল ও মসলা, টকজাতীয় খাবার খালি পেটে, চা-কফি বেশি, কোমল পানীয়, চকলেট, পুদিনা-জাতীয় মিন্ট, পেঁয়াজ ও রসুন অনেকের ক্ষেত্রে। ডাল, ছোলা, শিম, বাঁধাকপি, ফুলকপি পেট ফাঁপাতে পারে; এগুলো বাদ না দিয়ে পরিমাণ কমিয়ে দেখুন।
দুধ খেয়ে কারও কারও সাময়িক আরাম লাগলেও দুধের চর্বি ও প্রোটিন পরে অ্যাসিড তৈরি বাড়াতে পারে। দুধে পেট ফাঁপলে ল্যাকটোজ সহ্য না হওয়ার সমস্যা থাকতে পারে; সে ক্ষেত্রে দই ভালো বিকল্প।
গ্যাস্ট্রিক দূর করার ঘরোয়া উপায়
বিজ্ঞাপন
হালকা উপসর্গে কিছু ঘরোয়া পদ্ধতি আরাম দিতে পারে, তবে এগুলো চিকিৎসার বিকল্প নয়।
১. জিরা বা মৌরি পানি: এক চা-চামচ জিরা বা মৌরি এক কাপ পানিতে ফুটিয়ে কুসুম গরম অবস্থায় খেলে পেট ফাঁপা ও বায়ুর অস্বস্তি অনেকের কমে। খাবারের পর এক চিমটি মৌরি চিবানোর অভ্যাসও প্রচলিত।
২. আদা: পাতলা করে কাটা আদা গরম পানিতে কয়েক মিনিট ভিজিয়ে চায়ের মতো খেলে বমি বমি ভাব ও বদহজমে আরাম মেলে। খুব বেশি আদা খেলে উল্টো বুকজ্বালা হতে পারে, তাই পরিমিত।
৩. কুসুম গরম পানি: সকালে খালি পেটে এক গ্লাস কুসুম গরম পানি অনেকের হজম স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে।
বিজ্ঞাপন
৪. হালকা হাঁটা: খাওয়ার পর ১০-১৫ মিনিট ধীরে হাঁটলে পাকস্থলী দ্রুত খালি হয়, পেট ফাঁপা কমে।
ইসবগুলের ভুসি কোষ্ঠকাঠিন্যে উপকারী, কিন্তু অনেকের পেট ফাঁপা বাড়ায়; অল্প দিয়ে শুরু করুন এবং পর্যাপ্ত পানি খান। খালি পেটে লেবু-পানি বা আপেল সিডার ভিনেগার খাওয়ার পরামর্শ প্রচলিত হলেও এগুলো অম্লীয়, বুকজ্বালার রোগীদের সমস্যা বাড়াতে পারে।
জীবনযাপনে যে বদল দরকার
ধূমপান খাদ্যনালির নিচের মুখের পেশিকে দুর্বল করে, ফলে অ্যাসিড সহজে উঠে আসে। জর্দা-পান ও তামাক পাতাও ক্ষতিকর। বাড়তি ওজন, বিশেষ করে পেটের মেদ, পাকস্থলীর ওপর চাপ বাড়ায়; কয়েক কেজি ওজন কমালেও রিফ্লাক্স কমে যায়। কোমরে খুব টাইট বেল্ট বা পোশাক পরলেও একই চাপ পড়ে।
বিজ্ঞাপন
মানসিক চাপ আর অনিয়মিত ঘুম হজমের সমস্যাকে বাড়িয়ে দেয়। রোজার মাসে ইফতারে একসঙ্গে অনেক ভাজাপোড়া খাওয়ার বদলে খেজুর, পানি, শরবত দিয়ে শুরু করে ধীরে খান এবং সাহরিতে খেয়েই শুয়ে না পড়ার চেষ্টা করুন।
ওষুধ নিয়ে সতর্কতা ও কখন ডাক্তার দেখাবেন
গ্যাসের ওষুধ ফার্মেসিতে সহজে পাওয়া যায় বলে অনেকে বছরের পর বছর নিজে নিজে খেয়ে যান। দীর্ঘদিন নিজের ইচ্ছায় অ্যাসিড কমানোর ওষুধ খাওয়া ঠিক নয়; এতে আসল রোগ ঢাকা পড়ে যেতে পারে এবং কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও থাকে। ব্যথানাশক ওষুধ খালি পেটে বা ঘন ঘন খেলে পাকস্থলীতে ক্ষত হতে পারে; চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এগুলো নিয়মিত খাবেন না।
নিচের যেকোনো লক্ষণে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যান: আলকাতরার মতো কালো পায়খানা, রক্তবমি বা কফির দানার মতো বমি, চেষ্টা ছাড়াই ওজন কমে যাওয়া, খাবার গিলতে কষ্ট বা আটকে যাওয়া, বারবার বমি, রক্তস্বল্পতা, তীব্র পেটব্যথা, কিংবা চল্লিশোর্ধ্ব বয়সে নতুন করে উপসর্গ শুরু হওয়া। বুকে চাপ ধরা ব্যথা, ঘাম, শ্বাসকষ্ট বা ব্যথা বাম হাতে ছড়ালে সেটিকে গ্যাস্ট্রিক ভেবে বসে থাকবেন না; এটি হৃদ্রোগের লক্ষণ হতে পারে, তাই সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে যান।
বিজ্ঞাপন
সাধারণ জিজ্ঞাসা
গ্যাস্ট্রিক কি পুরোপুরি ভালো হয়?
খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনের কারণে হওয়া সমস্যা নিয়ম মানলে অনেকটা বা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসে। আলসার বা ব্যাকটেরিয়াজনিত সমস্যায় সঠিক চিকিৎসা নিলে সেরে যায়।
খালি পেটে চা খেলে কি গ্যাস হয়?
বিজ্ঞাপন
অনেকের ক্ষেত্রে হয়। সকালে প্রথমে পানি খেয়ে, হালকা কিছু খাওয়ার পর চা খেলে অস্বস্তি কম হয়।
ঠান্ডা দুধ খেলে কি বুকজ্বালা কমে?
সাময়িক আরাম লাগতে পারে, কিন্তু কিছুক্ষণ পর অ্যাসিড আবার বাড়তে পারে। নিয়মিত প্রতিকার হিসেবে এর ওপর ভরসা না করাই ভালো।
ডাবের পানি কি গ্যাস্ট্রিকে উপকারী?
বিজ্ঞাপন
ডাবের পানি হালকা ও সহজপাচ্য, অনেকের আরাম লাগে। তবে কিডনির রোগীরা পটাশিয়ামের কারণে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিয়মিত খাবেন না।