চোখের নিচে কালো দাগ দূর করার উপায়: কেন হয়, কীভাবে কমাবেন
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ:
আয়নায় চোখের নিচে কালচে ছায়া দেখে বেশির ভাগ মানুষ ভাবেন, ঘুম কম হচ্ছে বলেই এমন। কথাটা আংশিক সত্য। রাত জাগলে দাগ গাঢ় দেখায় ঠিকই, কিন্তু অনেকের ক্ষেত্রে আসল কারণ বংশগত গঠন, চোখের নিচের পাতলা ত্বক, অ্যালার্জি বা বারবার চোখ ঘষার অভ্যাস। তাই কারও দাগ দুই রাত ভালো ঘুমেই হালকা হয়, কারও মাসের পর মাস যত্নেও পুরোপুরি যায় না।
বিজ্ঞাপন
চোখের নিচে কালো দাগ দূর করার উপায় তাই কারণের ওপর নির্ভর করে। সুখবর হলো, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এটি কোনো রোগ নয়, এবং ঠান্ডা সেঁক, পর্যাপ্ত ঘুম, রোদ থেকে সুরক্ষা আর কিছু সহজ অভ্যাসে দাগ অনেকটা কমিয়ে আনা যায়।
চোখের নিচে কালো দাগ কেন হয়
চোখের নিচের ত্বক শরীরের সবচেয়ে পাতলা ত্বকগুলোর একটি। এর নিচের রক্তনালি আর পেশির রং সহজেই বাইরে থেকে দেখা যায়। এর সঙ্গে নিচের কারণগুলো যোগ হলে দাগ গাঢ় হয়:
১. বংশগত কারণ: অনেক পরিবারে মা-বাবা, ভাইবোন সবারই চোখের নিচে কালচে ভাব থাকে। দক্ষিণ এশীয়দের মধ্যে চোখের চারপাশে বাড়তি মেলানিন জমার প্রবণতা বেশি দেখা যায়।
বিজ্ঞাপন
২. ঘুমের অভাব ও ক্লান্তি: রাত জাগলে ত্বক ফ্যাকাশে দেখায়, ফলে নিচের রক্তনালির নীলচে-কালচে রং বেশি চোখে পড়ে। চোখের নিচে তরল জমে ফোলাভাবও তৈরি হয়।
৩. অ্যালার্জি ও চোখ ঘষা: ধুলা, পরাগরেণু বা ঠান্ডার অ্যালার্জিতে নাক বন্ধ থাকলে চোখের চারপাশের রক্তনালি ফুলে যায়। চুলকানিতে চোখ ঘষলে ত্বকে প্রদাহ হয়ে কালো দাগ পড়ে।
৪. বয়স: বয়স বাড়লে ত্বক পাতলা হয়, চর্বির স্তর কমে, চোখের নিচে গর্তের মতো ছায়া তৈরি হয়।
৫. রোদ: চোখের চারপাশে সানস্ক্রিন লাগানো হয় না বলে রোদে মেলানিন বেড়ে দাগ গাঢ় হয়।
বিজ্ঞাপন
৬. স্ক্রিনে দীর্ঘ সময়: একটানা মোবাইল বা কম্পিউটারের দিকে তাকিয়ে থাকলে চোখে চাপ পড়ে, চোখ ক্লান্ত দেখায়, আর অনেকে অজান্তে চোখ ডলেন।
৭. পানিশূন্যতা, ধূমপান ও বেশি লবণ: এগুলো ত্বক নিষ্প্রভ করে এবং চোখের নিচে ফোলাভাব বাড়ায়।
চোখের নিচে কালো দাগ কিসের লক্ষণ
বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এটি শুধু চেহারার বিষয়, কোনো রোগের লক্ষণ নয়। তবে কিছু পরিস্থিতিতে এটি শরীরের অন্য সমস্যার দিকে ইঙ্গিত দিতে পারে। রক্তস্বল্পতায় ত্বক ফ্যাকাশে হয়ে চোখের নিচের কালচে ভাব বেশি দেখা যায়; সঙ্গে দুর্বলতা, অল্পতেই হাঁপিয়ে যাওয়া বা মাথা ঘোরা থাকলে রক্ত পরীক্ষা করানো উচিত। দীর্ঘদিনের অ্যালার্জি বা সাইনাসের সমস্যাও দাগের কারণ হতে পারে।
বিজ্ঞাপন
শুধু একটি চোখের নিচে হঠাৎ কালো দাগ বা ফোলা, চোখে আঘাতের পর কালশিটে, সকালে মুখ ও পা একসঙ্গে ফুলে থাকা, চোখের চারপাশে চুলকানিযুক্ত লাল চাকা কিংবা দাগের সঙ্গে দৃষ্টিতে সমস্যা হলে দেরি না করে চিকিৎসকের কাছে যান। মুখ ও পা ফোলা কিডনি বা থাইরয়েডের সমস্যারও লক্ষণ হতে পারে।
চোখের নিচে কালো দাগ কমানোর ঘরোয়া উপায়
ঘরোয়া পদ্ধতিগুলো মূলত ফোলাভাব কমায়, ত্বক আর্দ্র রাখে এবং রক্তনালি সংকুচিত করে দাগ সাময়িক হালকা দেখায়। নিয়মিত করলে উপকার পাওয়া যায়, তবে বংশগত দাগ পুরোপুরি মুছে যায় না।
১. ঠান্ডা সেঁক: পরিষ্কার পাতলা কাপড়ে কয়েক টুকরা বরফ মুড়ে, বা ফ্রিজে রাখা ঠান্ডা চামচ চোখের নিচে পাঁচ থেকে দশ মিনিট আলতো করে ধরে রাখুন। সকালে ফোলাভাব কমাতে এটি সবচেয়ে কার্যকর। সরাসরি বরফ ত্বকে চেপে ধরবেন না।
বিজ্ঞাপন
২. টি ব্যাগ: ব্যবহার করা গ্রিন টি বা সাধারণ চায়ের ব্যাগ ফ্রিজে ঠান্ডা করে দশ মিনিট চোখের ওপর রাখতে পারেন। চায়ের ক্যাফেইন ও ঠান্ডা ভাব মিলে ফোলা কিছুটা কমায়।
৩. শসার টুকরা: ঠান্ডা শসার পাতলা টুকরা চোখে রাখলে আরাম লাগে ও ফোলা কমে। এর বাড়তি কোনো জাদুকরী গুণ নেই, মূল কাজটা ঠান্ডা ভাবের।
৪. অ্যালোভেরা জেল বা ময়েশ্চারাইজার: রাতে আঙুলের ডগায় অল্প পরিমাণ সুগন্ধিহীন ময়েশ্চারাইজার বা খাঁটি অ্যালোভেরা জেল চোখের নিচের হাড় বরাবর আলতো চাপ দিয়ে লাগান। চোখের ভেতরে যেন না যায়।
৫. মাথা একটু উঁচু করে ঘুম: একটি বাড়তি বালিশ দিয়ে মাথা সামান্য উঁচুতে রেখে ঘুমালে চোখের নিচে তরল কম জমে, সকালে ফোলাভাব কম থাকে।
বিজ্ঞাপন
আলুর রস, ঠান্ডা দুধে ভেজানো তুলা বা গোলাপজলও অনেকে ব্যবহার করেন; এগুলো নিরাপদ, তবে উপকারের মূল কারণ মূলত ঠান্ডা ও আর্দ্রতা। লেবুর রস, টুথপেস্ট বা কড়া কোনো প্যাক চোখের নাজুক ত্বকে কখনো লাগাবেন না।
অভ্যাসে যে বদল দরকার
প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়ার চেষ্টা করুন এবং প্রাপ্তবয়স্ক হলে সাত থেকে নয় ঘণ্টা ঘুমান। ঘুমানোর আগে অন্তত আধা ঘণ্টা মোবাইল দূরে রাখুন। কম্পিউটারে কাজ করলে প্রতি ২০ মিনিট পর ২০ সেকেন্ডের জন্য প্রায় ২০ ফুট দূরের কোনো কিছুর দিকে তাকান, এতে চোখের ক্লান্তি কমে।
রোদে বের হওয়ার আগে চোখের চারপাশেও আলতো করে সানস্ক্রিন লাগান, কিংবা চোখের জন্য তৈরি মৃদু সানস্ক্রিন বেছে নিন। সানগ্লাস শুধু রোদ নয়, চোখ কুঁচকে তাকানোর অভ্যাসও কমায়। রাতে কাজল, মাসকারা বা আইলাইনার ভালোভাবে তুলে ঘুমান; জোরে ঘষে নয়, তেল বা মেকআপ রিমুভারে তুলা ভিজিয়ে আলতো চেপে।
বিজ্ঞাপন
খাবারে পর্যাপ্ত পানি, ফল ও সবজি রাখুন। আয়রনের জন্য শাক, ডাল, কলিজা ও মাছ খান। রাতে খুব লবণাক্ত খাবার, চানাচুর বা প্রক্রিয়াজাত নাশতা কম খেলে সকালে চোখের নিচে ফোলা কম হয়। ধূমপান ছাড়লে ত্বকের রং ও টানটান ভাব দুটোরই উন্নতি হয়। অ্যালার্জির সমস্যা থাকলে ধুলাবালু এড়িয়ে চলুন এবং চিকিৎসকের পরামর্শে অ্যালার্জির চিকিৎসা নিন; চুলকানি কমলে চোখ ঘষাও কমবে।
বাজারের আই ক্রিম কতটা কাজ করে
আই ক্রিমের দাম বেশি হলেই কাজ বেশি, এমন নয়। উপাদান দেখে কিনুন। ক্যাফেইনযুক্ত ক্রিম ফোলাভাব সাময়িক কমায়। ভিটামিন সি, নিয়াসিনামাইড বা ভিটামিন কে-যুক্ত ক্রিম রঞ্জক বা রক্তনালির কারণে হওয়া দাগ কিছুটা হালকা করতে পারে। মৃদু রেটিনলযুক্ত ক্রিম দীর্ঘ মেয়াদে ত্বক একটু পুরু ও মসৃণ করে, তবে চোখের চারপাশে জ্বালা হতে পারে, তাই চিকিৎসকের পরামর্শে শুরু করাই ভালো।
যেকোনো ক্রিম কমপক্ষে ছয় থেকে আট সপ্তাহ নিয়মিত ব্যবহার করে তবেই ফল বিচার করুন। জ্বালা, লালচে ভাব বা চোখ দিয়ে পানি পড়লে ব্যবহার বন্ধ করুন। দ্রুত সমাধান চাইলে কনসিলার দিয়ে দাগ ঢাকা যায়; কমলা বা পিচ রঙের কারেক্টর কালচে-নীল দাগ ঢাকতে ভালো কাজ করে।
বিজ্ঞাপন
যাঁদের দাগ খুব গাঢ় বা চোখের নিচে গর্তের মতো ছায়া, তাঁদের জন্য চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে কেমিক্যাল পিল, লেজার বা ফিলারের মতো চিকিৎসা আছে। এগুলো ব্যয়বহুল এবং ঝুঁকিমুক্ত নয়, তাই অভিজ্ঞ ও নিবন্ধিত চিকিৎসকের কাছেই করাতে হয়।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
কত দিনে চোখের নিচের কালো দাগ কমে?
ঘুম ও ক্লান্তিজনিত দাগ কয়েক দিনেই হালকা হয়। রঞ্জকজনিত দাগে নিয়মিত যত্ন ও সানস্ক্রিনে দুই-তিন মাস লাগে। বংশগত দাগ পুরোপুরি যায় না, তবে অনেকটা কমানো যায়।
বিজ্ঞাপন
আলমন্ড অয়েল বা নারকেল তেল কি লাগানো যায়?
শুষ্ক ত্বকে রাতে অল্প পরিমাণ লাগানো যায়, এতে ত্বক আর্দ্র থাকে। তবে তৈলাক্ত ত্বকে বা চোখের পাতার কাছে বেশি লাগালে ছোট সাদা দানা বা মিলিয়া হতে পারে।
শিশুদের চোখের নিচে কালো দাগ হলে কী করব?
শিশুদের ক্ষেত্রে প্রায়ই অ্যালার্জি, নাক বন্ধ থাকা বা বড় টনসিল-অ্যাডিনয়েডের কারণে এমন হয়। নাক ডাকা বা মুখ খুলে ঘুমানোর অভ্যাস থাকলে শিশু বিশেষজ্ঞকে দেখান।
বিজ্ঞাপন
বেশি পানি খেলে কি দাগ চলে যায়?
পানিশূন্যতা থাকলে ত্বক নিষ্প্রভ দেখায়, তাই পর্যাপ্ত পানি পান উপকারী। তবে শুধু বেশি পানি খেয়ে বংশগত বা রঞ্জকজনিত দাগ দূর হয় না।