চুল পড়া বন্ধের উপায়: কারণ চিনে ঘরোয়া যত্ন ও সঠিক খাবার
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ:
চিরুনিতে বা বালিশে কয়েকটা চুল দেখলেই ভয় পাওয়ার কিছু নেই। একজন মানুষের মাথা থেকে প্রতিদিন মোটামুটি ৫০ থেকে ১০০টি চুল ঝরে যাওয়া স্বাভাবিক, কারণ পুরোনো চুল ঝরে তার জায়গায় নতুন চুল গজায়। দুশ্চিন্তার বিষয় তখন, যখন হঠাৎ মুঠো মুঠো চুল উঠছে, সিঁথি চওড়া হচ্ছে, বা মাথার কোনো অংশ ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
চুল পড়া বন্ধের উপায় খুঁজতে হলে আগে কারণ খুঁজতে হয়। আয়রনের ঘাটতি, থাইরয়েডের সমস্যা, বড় অসুখ বা প্রসবের পরের ধাক্কা, খুশকি, টাইট করে চুল বাঁধা কিংবা বংশগত টাক, প্রতিটির সমাধান আলাদা। একটি তেল বা একটি প্যাক সব ধরনের চুল পড়া থামাতে পারে না।
অতিরিক্ত চুল পড়ার সাধারণ কারণ
১. শরীরের ধাক্কা: টাইফয়েড, ডেঙ্গু বা কোভিডের মতো জ্বর, অস্ত্রোপচার, সন্তান প্রসব, হঠাৎ ওজন কমানো বা তীব্র মানসিক চাপের দুই-তিন মাস পর হঠাৎ অনেক চুল পড়তে শুরু করে। চিকিৎসার ভাষায় একে টেলোজেন এফ্লুভিয়াম বলে। এটি সাধারণত সাময়িক; কারণ দূর হলে ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে চুল ফিরে আসে।
২. পুষ্টির ঘাটতি: আয়রন, প্রোটিন, ভিটামিন ডি বা জিঙ্কের অভাবে চুল পাতলা হতে পারে। আমাদের দেশে নারীদের মধ্যে রক্তস্বল্পতা বেশ প্রচলিত, তাই চুল পড়ার পেছনে এটি প্রায়ই থাকে।
বিজ্ঞাপন
৩. হরমোন: থাইরয়েডের সমস্যা, পিসিওএস এবং মেনোপজের সময় চুল পড়া বাড়ে।
৪. বংশগত টাক: ছেলেদের কপালের দুই পাশ ও মাথার তালু থেকে ধীরে ধীরে চুল কমে; মেয়েদের সিঁথির জায়গা চওড়া হয়। এটি ঘরোয়া উপায়ে থামে না, চিকিৎসা লাগে।
৫. চুলের ওপর অত্যাচার: খুব টাইট খোঁপা বা বেণি, নিয়মিত স্ট্রেটনার-কার্লারের তাপ, রিবন্ডিং, ঘন ঘন রং করা চুলের গোড়া দুর্বল করে বা চুল ভেঙে ফেলে।
৬. মাথার ত্বকের সমস্যা: খুশকি, ছত্রাক সংক্রমণ বা সোরিয়াসিস থাকলে চুলকানি ও চুল পড়া বাড়ে।
বিজ্ঞাপন
চুল পড়া বন্ধের ঘরোয়া উপায়
ঘরোয়া যত্ন চুলের ভাঙন কমায় এবং মাথার ত্বক সুস্থ রাখে। তবে পুষ্টির ঘাটতি বা হরমোনের সমস্যা থাকলে শুধু তেল আর প্যাকে চুল পড়া থামবে না।
১. কোমলভাবে চুল ধোয়া: সপ্তাহে দুই-তিন দিন মৃদু শ্যাম্পু দিয়ে মাথার ত্বক পরিষ্কার করুন, আঙুলের ডগায় আলতো ঘষুন। কন্ডিশনার শুধু চুলের দৈর্ঘ্যে লাগান। খুব গরম পানি এড়িয়ে চলুন।
২. ভেজা চুলে সাবধানতা: ভেজা চুল সবচেয়ে দুর্বল। তোয়ালে দিয়ে জোরে ঘষবেন না, চেপে পানি শুষে নিন। মোটা দাঁতের চিরুনি দিয়ে নিচ থেকে ওপরের দিকে জট ছাড়ান।
বিজ্ঞাপন
৩. তেল মালিশ: নারকেল তেল চুলের প্রোটিন ক্ষয় কিছুটা কমায় বলে গবেষণায় দেখা গেছে। সপ্তাহে এক-দুই দিন হালকা গরম তেল দিয়ে আঙুলের ডগায় পাঁচ মিনিট মাথার ত্বক মালিশ করুন, এক-দুই ঘণ্টা পর ধুয়ে ফেলুন। খুশকি থাকলে মাথার ত্বকে তেল কম দিন।
৪. পেঁয়াজের রস: অনেকে ব্যবহার করেন; ছোট পরিসরের কিছু গবেষণায় নির্দিষ্ট ধরনের চুল পড়ায় উপকারের ইঙ্গিত মিলেছে। ব্যবহার করতে চাইলে সপ্তাহে একবার ১৫-২০ মিনিট রেখে ধুয়ে নিন; জ্বালা করলে বন্ধ করুন।
৫. অ্যালোভেরা ও মেথি: অ্যালোভেরা জেল মাথার ত্বকের চুলকানিতে আরাম দেয়। ভেজানো মেথি বেটে প্যাক বানিয়ে লাগানো প্রচলিত; এতে চুল নরম হয়, তবে চুল পড়া থামানোর জোরালো প্রমাণ নেই।
৬. চুল ঢিলে করে বাঁধুন: রাতে ঢিলে বেণি করে বা খোলা চুলে ঘুমান। মসৃণ কাপড়ের বালিশের কভার ঘর্ষণ কমায়।
বিজ্ঞাপন
খাবারে যা রাখবেন
চুল মূলত কেরাটিন নামের প্রোটিনে তৈরি। প্রতিদিনের খাবারে ডিম, মাছ, মুরগি, ডাল, দুধ বা দই রাখুন। আয়রনের জন্য কলিজা, অল্প পরিমাণে লাল মাংস, কচুশাক, লালশাক, পালংশাক, ডাল ও ছোলা খেতে পারেন। আয়রন ভালোভাবে শোষণের জন্য সঙ্গে আমলকী, পেয়ারা বা লেবুর মতো ভিটামিন সি-যুক্ত খাবার খান, আর খাবারের ঠিক পরপর চা খাওয়া কমান।
বাদাম, কুমড়ার বিচি ও তিলে জিঙ্ক আছে। সকালের রোদে কিছুক্ষণ থাকলে শরীর ভিটামিন ডি তৈরি করে। বায়োটিনসহ চুলের ভিটামিন বড়ি বাজারে অনেক, কিন্তু ঘাটতি না থাকলে এগুলো বাড়তি সুবিধা দেয় না। পরীক্ষা করে ঘাটতি পাওয়া গেলে চিকিৎসক যে সাপ্লিমেন্ট দেবেন, সেটিই খান।
ঘুম, মানসিক চাপ ও দৈনন্দিন অভ্যাস
বিজ্ঞাপন
দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ, অনিয়মিত ঘুম আর ধূমপান চুলের গোড়ায় রক্ত ও পুষ্টি সরবরাহে প্রভাব ফেলে বলে মনে করা হয়। প্রতিদিন সাত-আট ঘণ্টা ঘুম, নিয়মিত হাঁটা এবং চাপ কমানোর কোনো একটি অভ্যাস, যেমন শ্বাসের ব্যায়াম বা প্রিয় কাজে সময় দেওয়া, শরীরের অন্য অংশের মতো চুলের জন্যও ভালো।
অনেকে দুশ্চিন্তায় অজান্তে চুল টানেন বা আঙুলে পেঁচান। এই অভ্যাস থাকলে খেয়াল করে বন্ধ করার চেষ্টা করুন; না পারলে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়া যায়। সাঁতারের পুলের ক্লোরিনযুক্ত পানি বা খুব খারাপ মানের পানি চুল রুক্ষ করে, সে ক্ষেত্রে গোসলের পর পরিষ্কার পানিতে চুল ধুয়ে নিন। নিজের চিরুনি, তোয়ালে ও টুপি অন্যের সঙ্গে ভাগাভাগি না করলে ছত্রাক সংক্রমণের ঝুঁকি কমে।
যেসব ভুল চুল পড়া বাড়ায়
ঘন ঘন শ্যাম্পু বদলানো, প্রতিদিন হেয়ার ড্রায়ার বা স্ট্রেটনার ব্যবহার, ভেজা চুল বেঁধে রাখা, চুল টেনে আঁচড়ানো আর বিজ্ঞাপন দেখে একসঙ্গে অনেক পণ্য ব্যবহার চুলের ক্ষতি করে। তাপ ব্যবহার করলে আগে হিট প্রোটেক্ট্যান্ট লাগান এবং সবচেয়ে কম তাপমাত্রায় রাখুন। হঠাৎ কঠোর ডায়েট করলেও কয়েক মাস পর চুল পড়া বাড়তে পারে।
বিজ্ঞাপন
কখন ডাক্তার দেখাবেন
নিচের কোনো একটি হলে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যান:
১. মাথায় গোল গোল ফাঁকা জায়গা, বা হঠাৎ এক জায়গা থেকে সব চুল উঠে যাওয়া।
২. তিন মাসের বেশি সময় ধরে অস্বাভাবিক বেশি চুল পড়া।
বিজ্ঞাপন
৩. চুল পড়ার সঙ্গে ক্লান্তি, ওজন বেড়ে যাওয়া বা কমে যাওয়া, অনিয়মিত মাসিক বা মুখে অতিরিক্ত লোম।
৪. মাথার ত্বকে লাল চাকা, পুঁজ, আঁশ বা তীব্র চুলকানি।
৫. অল্প বয়সে দ্রুত টাক পড়তে থাকা।
চিকিৎসক প্রয়োজনে রক্তে হিমোগ্লোবিন, ফেরিটিন, থাইরয়েড হরমোন ইত্যাদি পরীক্ষা করবেন। বংশগত টাকের জন্য কার্যকর ওষুধ আছে, তবে তা চিকিৎসকের পরামর্শেই শুরু করতে হয়, কারণ এগুলো দীর্ঘদিন নিয়মিত ব্যবহার করতে হয় এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকতে পারে।
বিজ্ঞাপন
সাধারণ জিজ্ঞাসা
চুলে প্রতিদিন তেল দেওয়া কি ভালো?
প্রয়োজন নেই। সপ্তাহে এক-দুই দিন যথেষ্ট। প্রতিদিন তেল দিলে ধুলা জমে, খুশকি বাড়তে পারে।
ন্যাড়া করলে কি চুল ঘন হয়?
বিজ্ঞাপন
না। চুল কাটলে বা ন্যাড়া করলে চুলের গোড়ার সংখ্যা বা ঘনত্ব বদলায় না। নতুন চুল সমান আগা নিয়ে গজায় বলে ঘন মনে হয়।
প্রসবের পর চুল পড়া কত দিন থাকে?
সাধারণত প্রসবের দুই থেকে চার মাস পর শুরু হয় এবং ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে স্বাভাবিক হয়ে আসে। খুব বেশি পড়লে রক্তস্বল্পতা ও থাইরয়েড পরীক্ষা করিয়ে নিন।
হেলমেট বা টুপি পরলে কি চুল পড়ে?
বিজ্ঞাপন
সাধারণত না। তবে খুব টাইট হেলমেট দীর্ঘ সময় পরলে ঘর্ষণে চুল ভাঙতে পারে; পরিষ্কার ও মাপমতো হেলমেট পরুন।
কত দিনে চুল পড়া কমতে দেখা যায়?
কারণ ঠিক করে যত্ন বা চিকিৎসা শুরু করার পর সাধারণত দুই থেকে তিন মাসে চুল পড়া কমতে থাকে, আর নতুন চুল চোখে পড়তে আরও কয়েক মাস লাগে। তাই প্রতি সপ্তাহে তেল বা শ্যাম্পু বদলাবেন না।