ব্রণ দূর করার উপায়: কারণ, ঘরোয়া যত্ন ও কখন ডাক্তার দেখাবেন
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ:
ব্রণ ত্বকের সবচেয়ে সাধারণ সমস্যাগুলোর একটি, বিশেষ করে বয়ঃসন্ধি থেকে শুরু করে বিশ-পঁচিশ বছর বয়স পর্যন্ত। ভালো খবর হলো, হালকা থেকে মাঝারি ব্রণের বেশির ভাগই নিয়মিত সঠিক যত্নে নিয়ন্ত্রণে আসে। ব্রণ দূর করার উপায় তিনটি কাজের ওপর দাঁড়িয়ে: মুখ পরিষ্কার রাখা কিন্তু ঘষাঘষি না করা, লোমকূপ বন্ধ হতে না দেওয়া, আর ব্রণ খোঁটা পুরোপুরি বন্ধ করা।
বিজ্ঞাপন
তবে মুখজুড়ে বড়, ব্যথাযুক্ত, পুঁজভরা ব্রণ হলে বা ব্রণ সেরে গিয়ে গর্ত বা দাগ থেকে গেলে ঘরোয়া পদ্ধতির ওপর ভরসা না করে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ দেখানো জরুরি। দেরি করলে স্থায়ী দাগ থেকে যেতে পারে।
ব্রণ কেন হয়
আমাদের ত্বকের লোমকূপে সেবাম নামের তেল তৈরি হয়। হরমোনের প্রভাবে এই তেল বেশি তৈরি হলে তা মরা কোষের সঙ্গে মিশে লোমকূপের মুখ বন্ধ করে দেয়। সেখানে ব্যাকটেরিয়া জন্মায়, প্রদাহ হয়, আর তৈরি হয় ব্রণ। প্রথমে ছোট সাদা বা কালো মাথা, যাকে হোয়াইটহেড ও ব্ল্যাকহেড বলে; পরে লাল দানা, পুঁজভরা ফুসকুড়ি, আর গুরুতর ক্ষেত্রে ত্বকের গভীরে শক্ত, ব্যথাযুক্ত গোটা।
কয়েকটি বিষয় ব্রণ বাড়িয়ে দেয়:
বিজ্ঞাপন
১. হরমোনের ওঠানামা: বয়ঃসন্ধি, মাসিকের আগে, গর্ভাবস্থায় বা পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোমে (পিসিওএস) ব্রণ বাড়তে পারে।
২. তৈলাক্ত প্রসাধনী: ভারী ক্রিম, তেলযুক্ত মেকআপ বা চুলের তেল কপালে লেগে থাকলে লোমকূপ বন্ধ হয়।
৩. ঘর্ষণ ও চাপ: মোবাইল ফোন গালে চেপে কথা বলা, হেলমেট বা মাস্কের ঘষা, বারবার মুখে হাত দেওয়া।
৪. খাবার: সবার ক্ষেত্রে এক নয়, তবে কিছু গবেষণায় বেশি চিনিযুক্ত খাবার ও অতিরিক্ত দুধের সঙ্গে ব্রণ বাড়ার সম্পর্ক দেখা গেছে।
বিজ্ঞাপন
৫. কিছু ওষুধ: স্টেরয়েডসহ কয়েক ধরনের ওষুধ ব্রণ বাড়াতে পারে।
চকলেট বা তেলে ভাজা খেলেই ব্রণ হবে, কিংবা মুখ নোংরা বলেই ব্রণ হয়, এই ধারণাগুলো পুরোপুরি সত্য নয়। বেশি ধোয়া বা ঘষাঘষি বরং প্রদাহ বাড়ায়।
মুখের ব্রণ দূর করার উপায়: প্রতিদিনের রুটিন
১. দিনে দুবার মুখ ধোয়া: সকালে ও রাতে মৃদু, সুগন্ধিহীন ফেসওয়াশ দিয়ে কুসুম গরম পানিতে মুখ ধুয়ে নিন। ব্যায়াম বা প্রচুর ঘামের পর আরেকবার ধোয়া যায়, এর বেশি নয়।
বিজ্ঞাপন
২. ঘষবেন না: আঙুলের ডগা দিয়ে আলতো করে ফেসওয়াশ লাগান, নরম তোয়ালে চেপে চেপে মুখ মুছুন।
৩. তেলমুক্ত ময়েশ্চারাইজার: তৈলাক্ত ত্বকেও ময়েশ্চারাইজার লাগে। নন-কমেডোজেনিক বা তেলমুক্ত লেখা হালকা জেল বেছে নিন।
৪. সানস্ক্রিন: ব্রণের জায়গায় রোদ লাগলে কালো দাগ গাঢ় হয়। জেল ধরনের হালকা সানস্ক্রিন ব্যবহার করুন।
৫. বালিশের কভার বদলান: সপ্তাহে অন্তত একবার বালিশের কভার ধুয়ে নিন। মোবাইলের স্ক্রিন মাঝেমধ্যে পরিষ্কার করুন।
বিজ্ঞাপন
৬. চুল পরিষ্কার রাখুন: খুশকি ও তেলযুক্ত চুল কপালে পড়লে সেখানে ব্রণ বাড়ে।
ব্রণ দূর করার ঘরোয়া উপায়: কোনটা কাজের, কোনটা নয়
প্রাকৃতিক উপায়ে ব্রণ দূর করা নিয়ে অনেক টোটকা প্রচলিত। এর কিছু মৃদু উপকার দিতে পারে, কিছু উল্টো ক্ষতি করে।
যেগুলো চেষ্টা করা যায়: তাজা অ্যালোভেরা জেল প্রদাহ ও লালচে ভাব কিছুটা কমাতে পারে। মধু অল্প সময় ব্রণের ওপর লাগিয়ে রাখলে আরাম দেয়। টি ট্রি অয়েল নিয়ে কিছু গবেষণায় হালকা ব্রণে উপকার দেখা গেছে, তবে এটি কখনো খাঁটি অবস্থায় সরাসরি মুখে লাগাবেন না; কম ঘনত্বের তৈরি জেল ব্যবহার করুন এবং আগে অল্প জায়গায় পরীক্ষা করে নিন। মুলতানি মাটির প্যাক সপ্তাহে একবার তৈলাক্ত ত্বকের বাড়তি তেল শুষে নিতে পারে।
বিজ্ঞাপন
যেগুলো এড়িয়ে চলবেন: টুথপেস্ট, লেবুর রস, বেকিং সোডা বা রসুন বাটা সরাসরি ব্রণে লাগালে ত্বক পুড়ে যেতে পারে, দাগ আরও গাঢ় হয়। নারকেল তেলসহ ভারী তেল তৈলাক্ত মুখে মাখলে অনেকের ব্রণ বাড়ে।
বাজারের কোন উপাদান কাজ করে
ফার্মেসিতে পাওয়া কিছু উপাদান ব্রণের বিরুদ্ধে প্রমাণিত। স্যালিসাইলিক অ্যাসিডযুক্ত ফেসওয়াশ বা জেল লোমকূপ পরিষ্কার রাখে, ব্ল্যাকহেড-হোয়াইটহেডে বিশেষ কাজের। বেনজয়েল পারক্সাইড ব্যাকটেরিয়া কমায় ও লাল ফুসকুড়িতে কাজ করে। অ্যাডাপালিনের মতো রেটিনয়েড জেল লোমকূপ বন্ধ হওয়া ঠেকায়, তবে শুরুতে শুষ্কতা ও জ্বালা হতে পারে।
এগুলো কম ঘনত্বে, অল্প পরিমাণে শুরু করুন এবং মোড়কের নির্দেশনা মেনে চলুন। ফল দেখতে সাধারণত ছয় থেকে আট সপ্তাহ লাগে। একসঙ্গে অনেক পণ্য মাখলে ত্বক খসখসে ও লাল হয়ে যায়। গর্ভবতী নারীরা ব্রণের কোনো ওষুধ ব্যবহারের আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন। অ্যান্টিবায়োটিক বা হরমোনের ওষুধ নিজে নিজে খাওয়া যাবে না।
বিজ্ঞাপন
খাবার, ঘুম আর মানসিক চাপ
ব্রণের সঙ্গে খাবারের সম্পর্ক সবার ক্ষেত্রে সমান নয়, তবে কিছু পরিবর্তন অনেককে উপকার দেয়। কোমল পানীয়, মিষ্টি, সাদা পাউরুটি আর প্যাকেটজাত নাশতা কমিয়ে দেখুন। শাকসবজি, ফল, ডাল, মাছ ও লাল আটার মতো খাবার বাড়ান। যাঁদের দুধ খেলে ব্রণ বাড়ে বলে মনে হয়, তাঁরা কয়েক সপ্তাহ দুধ কমিয়ে দই খেয়ে পার্থক্য খেয়াল করতে পারেন। জিমে যাঁরা প্রোটিন পাউডার খান, তাঁদের কারও কারও ক্ষেত্রেও ব্রণ বাড়তে দেখা যায়।
রাত জাগা আর পরীক্ষা বা কাজের চাপের সময় অনেকের ব্রণ বেড়ে যায়। চাপ হরমোনের ভারসাম্যে প্রভাব ফেলে, আর ক্লান্ত শরীরে মুখে হাত দেওয়ার প্রবণতাও বাড়ে। প্রতিদিন সাত-আট ঘণ্টা ঘুম, নিয়মিত হাঁটা বা ব্যায়াম এবং পর্যাপ্ত পানি পান ত্বকের জন্যও ভালো। ব্যায়ামের পর ঘামে ভেজা কাপড় বেশিক্ষণ পরে থাকবেন না; পিঠ ও বুকের ব্রণ এতে বাড়ে।
ব্রণ খুঁটবেন না: ব্রণ চেপে পুঁজ বের করলে তাৎক্ষণিক স্বস্তি মিললেও সংক্রমণ গভীরে ঢুকে যায়, প্রদাহ বাড়ে এবং কালো দাগ বা গর্ত থেকে যায়। নাক ও ঠোঁটের ওপরের অংশের ব্রণ চাপাচাপি করা বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। পাকা ব্রণে কুসুম গরম পানিতে ভেজানো পরিষ্কার কাপড় কয়েক মিনিট চেপে রাখলে তা অনেক সময় নিজে থেকেই ফেটে শুকিয়ে যায়।
বিজ্ঞাপন
কখন ডাক্তার দেখাবেন
তিন মাস নিয়ম মেনে ঘরোয়া যত্ন ও ফার্মেসির পণ্য ব্যবহারের পরও উন্নতি না হলে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যান। এ ছাড়া ত্বকের গভীরে শক্ত, ব্যথাযুক্ত গোটা হলে, ব্রণ সেরে গর্ত বা উঁচু দাগ থাকলে, মেয়েদের অনিয়মিত মাসিক, মুখে অতিরিক্ত লোম ও ব্রণ একসঙ্গে থাকলে, কিংবা প্রাপ্তবয়সে হঠাৎ নতুন করে অনেক ব্রণ উঠলে দেরি করবেন না। ব্রণের কারণে মন ভেঙে পড়লেও চিকিৎসা নেওয়া জরুরি; ব্রণ একটি চিকিৎসাযোগ্য রোগ।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
দিনে কতবার মুখ ধোয়া উচিত?
বিজ্ঞাপন
দুবারই যথেষ্ট। বারবার ধুলে ত্বক শুষ্ক হয় এবং অনেক সময় শরীর আরও বেশি তেল তৈরি করে।
ব্রণ হলে কি মেকআপ বাদ দিতে হবে?
পুরোপুরি বাদ দিতে হবে না। তেলমুক্ত, নন-কমেডোজেনিক পণ্য ব্যবহার করুন এবং রাতে অবশ্যই ভালো করে তুলে ফেলুন।
বরফ ঘষলে কি ব্রণ কমে?
বিজ্ঞাপন
পাতলা কাপড়ে মুড়ে অল্প সময় বরফ ধরলে ফোলা ও ব্যথা সাময়িক কমে। সরাসরি বরফ দীর্ঘক্ষণ চেপে রাখবেন না।
এক রাতে কি ব্রণ সারানো সম্ভব?
না। কিছু উপায়ে ফোলা কমতে পারে, কিন্তু ব্রণ পুরোপুরি সারতে কয়েক দিন থেকে কয়েক সপ্তাহ লাগে।
বয়স বাড়লে কি ব্রণ নিজে থেকে চলে যায়?
বিজ্ঞাপন
অনেকের ক্ষেত্রে বিশের কোঠার মাঝামাঝি এসে ব্রণ কমে আসে, তবে কারও কারও, বিশেষ করে নারীদের, ত্রিশ-চল্লিশেও ব্রণ থাকে। অপেক্ষা না করে শুরু থেকেই যত্ন নিলে দাগ কম পড়ে।