বান্দরবানের দর্শনীয় স্থান: নীলগিরি থেকে নাফাখুম, যাওয়ার উপায়সহ
ট্রাভেল ডেস্ক · বান্দরবান
প্রকাশ:
বান্দরবান কিসের জন্য বিখ্যাত, এক কথায় বলতে গেলে পাহাড়, মেঘ আর ঝরনা। দেশের সবচেয়ে উঁচু কয়েকটি পাহাড়চূড়া এই জেলায়, আছে সাঙ্গু নদী আর মারমা, ম্রো, বম, ত্রিপুরাসহ নানা জাতিগোষ্ঠীর বৈচিত্র্যময় জীবন। শহর থেকে ঘণ্টাখানেকের দূরত্বেই এমন সব জায়গা আছে, যেখান থেকে মেঘ পায়ের নিচে দেখা যায়।
বিজ্ঞাপন
বান্দরবানের দর্শনীয় স্থানগুলোকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথম ভাগে নীলাচল, মেঘলা, স্বর্ণমন্দির, চিম্বুক, শৈলপ্রপাত ও নীলগিরি, যেগুলো শহর থেকে সড়কপথে দিনে দিনে ঘুরে আসা যায়। দ্বিতীয় ভাগে বগা লেক, কেওক্রাডং, নাফাখুম, আমিয়াখুমের মতো দুর্গম জায়গা, যেখানে যেতে নিবন্ধিত গাইড আর প্রশাসনের অনুমতি লাগে।
দুর্গম এলাকাগুলোতে নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে গত কয়েক বছরে একাধিকবার পর্যটক যাওয়া বন্ধ রাখা হয়েছে। তাই পরিকল্পনা করার আগে বান্দরবান জেলা প্রশাসনের সর্বশেষ নির্দেশনা দেখে নেওয়া জরুরি।
বান্দরবান যাওয়ার উপায়
ঢাকার সায়েদাবাদ, আরামবাগ, কলাবাগানসহ কয়েকটি জায়গা থেকে সরাসরি বান্দরবানের বাস ছাড়ে, বেশির ভাগই রাতে। সময় লাগে আট থেকে দশ ঘণ্টা। নন-এসি বাসে ভাড়া আনুমানিক ৮০০ থেকে ১০০০ টাকা, এসি বাসে আরও বেশি।
বিজ্ঞাপন
ট্রেনে বা উড়োজাহাজে চট্টগ্রাম গিয়েও যাওয়া যায়। চট্টগ্রাম শহরের বহদ্দারহাট এলাকা থেকে বান্দরবানের বাস নিয়মিত ছাড়ে, পৌঁছাতে আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা লাগে। কক্সবাজার থেকেও সড়কপথে বান্দরবান যাওয়া যায়, তাই দুই জায়গা মিলিয়ে একটি ভ্রমণ পরিকল্পনা করা সম্ভব।
শহরের কাছের দর্শনীয় স্থান
১. মেঘলা পর্যটন কমপ্লেক্স: শহরে ঢোকার মুখেই লেক, ঝুলন্ত সেতু আর পাহাড়ি হাঁটাপথ। পরিবার নিয়ে ঘোরার জন্য সহজ জায়গা।
২. নীলাচল: শহর থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরের একটি পাহাড়চূড়া। বিকেলে গেলে সূর্যাস্ত আর নিচে শহরের আলো জ্বলে ওঠা দুটোই দেখা যায়।
বিজ্ঞাপন
৩. স্বর্ণমন্দির: বালাঘাটা এলাকার পাহাড়ের ওপর বৌদ্ধ ধাতু জাদি, যা স্বর্ণমন্দির নামে পরিচিত। এটি উপাসনালয়, তাই শালীন পোশাক পরে যান, নির্দিষ্ট জায়গায় জুতা খুলুন আর প্রবেশের সময়সূচি মেনে চলুন।
৪. শৈলপ্রপাত: থানচি সড়কে শহর থেকে অল্প দূরে একটি ছোট ঝরনা। পাশেই বম জনগোষ্ঠীর মানুষ হাতে বোনা কাপড় বিক্রি করেন।
৫. চিম্বুক পাহাড়: শহর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে। আঁকাবাঁকা সড়ক আর চারদিকের পাহাড়সারি দেখতে অনেকে এখানে থামেন।
৬. নীলগিরি: শহর থেকে প্রায় ৪৫ কিলোমিটার দূরে থানচি সড়কে, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে দুই হাজার ফুটের বেশি উঁচুতে। বর্ষা ও শরতের ভোরে এখানে মেঘ হাতের নাগালে চলে আসে। নীলগিরির রিসোর্টটি সেনাবাহিনী পরিচালিত, থাকতে চাইলে অনেক আগে বুক করতে হয়।
বিজ্ঞাপন
শহরের বাসস্ট্যান্ড থেকে চাঁদের গাড়ি বা সিএনজি অটোরিকশা রিজার্ভ করে একদিনে নীলগিরি, চিম্বুক ও শৈলপ্রপাত ঘোরা যায়। চাঁদের গাড়ির ভাড়া আনুমানিক চার থেকে ছয় হাজার টাকা, দর-কষাকষি করে ঠিক করে নিন।
দুর্গম এলাকার দর্শনীয় স্থান
১. বগা লেক: রুমা উপজেলায় পাহাড়ের চূড়ায় প্রাকৃতিক লেক। রুমা বাজার থেকে গাড়িতে ও কিছুটা হেঁটে পৌঁছাতে হয়। লেকের পাড়ে বম পাড়ায় স্থানীয়দের কটেজে থাকার ব্যবস্থা আছে।
২. কেওক্রাডং: বগা লেক থেকে কয়েক ঘণ্টার হাঁটাপথে দেশের পরিচিত উঁচু পাহাড়চূড়াগুলোর একটি। চূড়া থেকে চারপাশের দৃশ্য অসাধারণ।
বিজ্ঞাপন
৩. নাফাখুম ও আমিয়াখুম: থানচি থেকে সাঙ্গু নদী ধরে নৌকায় রেমাক্রি, সেখান থেকে হেঁটে নাফাখুম জলপ্রপাত। আমিয়াখুম আরও দুর্গম, কয়েক দিনের ট্রেকিং লাগে, অভিজ্ঞতা না থাকলে না যাওয়াই ভালো।
৪. দেবতাখুম: রোয়াংছড়ি উপজেলায় পাহাড়ের মাঝখানে গভীর জলের খুম, ভেলায় চড়ে ভেতরে যেতে হয়।
এসব জায়গায় যেতে থানচি বা রুমায় নিবন্ধিত গাইড নিতে হয়, জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি জমা দিতে হয় এবং পথে সেনা ক্যাম্প ও থানায় নাম লেখাতে হয়। কোন রুট খোলা আছে আর কোনটি বন্ধ, তা স্থানীয় প্রশাসনই ঠিক করে।
তিন দিনের নমুনা পরিকল্পনা
বিজ্ঞাপন
১. প্রথম দিন: রাতের বাসে ভোরে বান্দরবান পৌঁছে হোটেলে উঠুন। দুপুরের আগে মেঘলা পর্যটন কমপ্লেক্স ঘুরে দেখুন। বিকেলে স্বর্ণমন্দির দেখে সূর্যাস্তের আগে নীলাচলে পৌঁছান। সন্ধ্যায় সাঙ্গু নদীর পাড় আর শহরের বাজারে হাঁটুন।
২. দ্বিতীয় দিন: সকালে চাঁদের গাড়ি নিয়ে থানচি সড়ক ধরে রওনা দিন। পথে শৈলপ্রপাত আর চিম্বুকে থেমে দুপুরের মধ্যে নীলগিরি পৌঁছান। মেঘ আর পাহাড়ের দৃশ্য দেখে বিকেলে শহরে ফিরুন।
৩. তৃতীয় দিন: হাতে সময় থাকলে প্রশাসনের অনুমতি সাপেক্ষে রোয়াংছড়ির দেবতাখুম ঘুরে আসতে পারেন। নয়তো সকালে শহরের আশপাশে কেনাকাটা সেরে দুপুরের বাসে চট্টগ্রাম বা সরাসরি ঢাকার পথে রওনা দিন।
এই সূচি পরিবার, শিশু ও বয়স্কদের জন্যও উপযোগী, কারণ এতে কঠিন হাঁটাপথ নেই। ট্রেকিংয়ের পরিকল্পনা থাকলে আলাদা করে আরও দুই-তিন দিন যোগ করতে হবে, আর তা নির্ভর করবে কোন রুট খোলা আছে তার ওপর।
বিজ্ঞাপন
কখন যাবেন: উৎসব ও আবহাওয়া
বান্দরবান শহরে বোমাং সার্কেলের রাজবাড়ি আর রাজার মাঠ আছে। প্রতিবছর এখানে রাজপুণ্যাহ নামে একটি ঐতিহ্যবাহী উৎসব হয়, যা দেখতে দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসেন। মারমা জনগোষ্ঠীর সাংগ্রাই উৎসবে বছরের শুরুতে পানি ছিটানোর আয়োজন হয়। এসব উৎসবের সময়ে গেলে স্থানীয় সংস্কৃতি কাছ থেকে দেখার সুযোগ মেলে, তবে তখন হোটেলে ভিড়ও বেশি থাকে।
অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি বান্দরবান ভ্রমণের আরামদায়ক সময়। পথ শুকনো থাকে, ট্রেকিং সহজ হয়। ঝরনা দেখতে চাইলে বর্ষা বা বর্ষার পরপর যেতে হয়, তবে তখন পাহাড়ি পথ পিচ্ছিল থাকে, পাহাড়ধস ও ঝিরিতে হঠাৎ পানি বাড়ার ঝুঁকি থাকে। বর্ষায় দুর্গম এলাকায় যাওয়ার আগে স্থানীয় গাইডের পরামর্শ অবশ্যই নিন।
থাকা, খাওয়া ও সতর্কতা
বিজ্ঞাপন
বান্দরবান শহরে সাধারণ মানের আবাসিক হোটেল থেকে মাঝারি মানের হোটেল, সবই আছে। সাধারণ হোটেলে প্রতি রাত আনুমানিক ১০০০ থেকে ২৫০০ টাকা, ভালো মানের হোটেলে বেশি। শহরের বাইরে পাহাড়ের ওপর কিছু রিসোর্ট ও কটেজ আছে। রুমা, থানচি বা বগা লেকে থাকার ব্যবস্থা খুবই সাধারণ, বেশির ভাগই স্থানীয়দের কটেজ।
খাবারের মধ্যে পাহাড়ি রান্না, বাঁশকোড়লের তরকারি, ব্যাম্বু চিকেন আর স্থানীয় ফলমূল চেখে দেখতে পারেন। ট্রেকিংয়ে গেলে শুকনো খাবার, স্যালাইন ও পর্যাপ্ত পানি সঙ্গে রাখুন।
ঝিরিপথ ও খুমে সাঁতার না জানলে নামবেন না, লাইফ জ্যাকেট ছাড়া ভেলায় উঠবেন না। এসব জায়গায় প্রতিবছরই দুর্ঘটনা ঘটে। স্থানীয়দের ধর্মীয় স্থান ও পাড়ার নিয়ম মেনে চলুন, অনুমতি ছাড়া ছবি তুলবেন না। প্রশাসনের নিষেধ থাকা এলাকায় কোনোভাবেই যাওয়ার চেষ্টা করবেন না।
থানচি, রুমা বা বগা লেকের দিকে গেলে মোবাইল নেটওয়ার্ক অনেক জায়গায় থাকে না, এটিএম বুথও নেই। তাই শহর থেকেই পুরো ভ্রমণের নগদ টাকা তুলে নিন এবং পরিবারকে আগে জানিয়ে রাখুন কবে কোথায় থাকবেন। পাহাড়ি পথে হাঁটার জন্য ভালো গ্রিপের জুতা, হালকা ব্যাগ আর বৃষ্টির জন্য রেইনকোট সঙ্গে রাখুন।
বিজ্ঞাপন
সাধারণ জিজ্ঞাসা
বান্দরবান ঘুরতে কত দিন লাগে?
শহরের আশপাশ আর নীলগিরি দেখতে দুই দিন যথেষ্ট। বগা লেক, কেওক্রাডং বা নাফাখুম যোগ করলে চার-পাঁচ দিন হাতে রাখুন।
নাফাখুম যেতে কি গাইড লাগে?
বিজ্ঞাপন
হ্যাঁ, থানচি থেকে নিবন্ধিত গাইড নেওয়া বাধ্যতামূলক। গাইড ছাড়া প্রশাসন যাওয়ার অনুমতি দেয় না।
শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে বান্দরবানে কোথায় যাওয়া যায়?
মেঘলা, নীলাচল, স্বর্ণমন্দির আর গাড়িতে নীলগিরি তাঁদের জন্য উপযুক্ত। দুর্গম ট্রেকিং রুট তাঁদের জন্য নয়।
বান্দরবানে কি এখন সব জায়গায় যাওয়া যায়?
বিজ্ঞাপন
শহরের আশপাশ সাধারণত খোলা থাকে। রুমা, থানচি ও রোয়াংছড়ির কিছু এলাকায় সময়ে সময়ে নিষেধাজ্ঞা থাকে, তাই যাওয়ার আগে খোঁজ নিন।