সিলেটের দর্শনীয় স্থান: জাফলং, রাতারগুল, সাদা পাথর ও আরও যা দেখবেন
ট্রাভেল ডেস্ক · সিলেট
প্রকাশ:
সিলেটে ঘুরতে গেলে প্রথম দিনেই একটা জিনিস বোঝা যায়: এখানকার সৌন্দর্যের বড় অংশ পানিকে ঘিরে। মেঘালয়ের পাহাড় থেকে নেমে আসা নদীগুলো কোথাও স্বচ্ছ সবুজ, কোথাও পাথরে ঢাকা। জাফলং, ভোলাগঞ্জের সাদা পাথর, বিছনাকান্দি, লালাখাল আর রাতারগুল জলাবন, সিলেটের সবচেয়ে পরিচিত পাঁচটি জায়গাই নদী বা জলের সঙ্গে জড়িত।
বিজ্ঞাপন
এর সঙ্গে আছে টিলার ঢালে ছড়িয়ে থাকা চা-বাগান আর শহরের ভেতরে হজরত শাহজালাল (রহ.) ও হজরত শাহপরান (রহ.)-এর মাজার। সিলেট কিসের জন্য বিখ্যাত, জানতে চাইলে স্থানীয়রা সাধারণত এই তিনটির কথাই বলেন: চা, মাজার আর পাহাড়ি নদী। সাতকরা দিয়ে রান্না মাংস আর প্রবাসী অধ্যুষিত জনপদ হিসেবেও সিলেটের আলাদা পরিচিতি আছে।
তিন দিন হাতে থাকলে শহর আর আশপাশের প্রধান জায়গাগুলো মোটামুটি দেখে ফেলা যায়। নিচে প্রতিটি জায়গার বিবরণ, যাওয়ার পথ, সেরা মৌসুম আর সতর্কতা দেওয়া হলো।
সিলেট যাওয়ার উপায়
১. বাসে: ঢাকার সায়েদাবাদ, ফকিরাপুল ও মহাখালী থেকে সারা দিন সিলেটের বাস ছাড়ে। সময় লাগে পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা, রাস্তার অবস্থা ও যানজটের ওপর নির্ভর করে আরও বেশি। নন-এসি বাসে ভাড়া আনুমানিক ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা, এসি বাসে আনুমানিক ১২০০ থেকে ১৮০০ টাকা।
বিজ্ঞাপন
২. ট্রেনে: কমলাপুর ও বিমানবন্দর স্টেশন থেকে পারাবত, জয়ন্তিকা, কালনী ও উপবন এক্সপ্রেসসহ কয়েকটি আন্তঃনগর ট্রেন সিলেটে যায়। সাত থেকে আট ঘণ্টা লাগলেও পথে চা-বাগান আর হাওরের দৃশ্য এই যাত্রাকে উপভোগ্য করে তোলে। রাতের ট্রেনে গেলে হোটেলের এক রাতের খরচও বাঁচে।
৩. উড়োজাহাজে: ঢাকা থেকে সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দেশি এয়ারলাইনসগুলোর নিয়মিত ফ্লাইট আছে। আকাশপথে সময় লাগে পৌনে এক ঘণ্টার মতো।
শহরের ভেতরে যা দেখবেন
হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার সিলেট শহরের প্রাণকেন্দ্রে। দেশের নানা প্রান্ত থেকে মানুষ এখানে আসেন। মাজার প্রাঙ্গণের জালালি কবুতর আর পুকুরের গজার মাছ দেখতে ভিড় লেগেই থাকে। শহর থেকে কিছুটা দূরে হজরত শাহপরান (রহ.)-এর মাজার। দুই জায়গাতেই শালীন পোশাক পরে যান এবং নামাজের সময়ের প্রতি খেয়াল রাখুন।
বিজ্ঞাপন
সুরমা নদীর ওপর লোহার তৈরি কিন ব্রিজ শহরের পুরোনো প্রতীক, এর পাশেই আলী আমজাদের ঘড়ি। সন্ধ্যায় সুরমার পাড়ে হাঁটতে ভালো লাগে। বিমানবন্দর সড়কের পাশে মালনীছড়া চা-বাগান, যাকে উপমহাদেশের প্রথম বাণিজ্যিক চা-বাগান হিসেবে ধরা হয়। এর কাছেই লাক্কাতুরা চা-বাগান। শহরের এত কাছে টিলাভরা চা-বাগানে হাঁটার সুযোগ খুব কম শহরেই মেলে।
শহরের বাইরের জনপ্রিয় গন্তব্য
১. জাফলং: শহর থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরে গোয়াইনঘাট উপজেলায়। পিয়াইন নদীর স্বচ্ছ পানি, নদীর বুকে ছড়িয়ে থাকা পাথর আর ওপারে ভারতের মেঘালয়ের পাহাড়, এই তিনে মিলে জাফলং। নদীর ওপারে খাসিয়া পল্লি আর পানের বরজও ঘুরে দেখা যায়।
২. রাতারগুল জলাবন: গোয়াইনঘাটেই, শহর থেকে ঘণ্টাখানেকের পথ। এটি মিঠাপানির জলাবন, বর্ষায় গাছগুলোর কাণ্ড অনেকখানি পানিতে ডুবে থাকে। ছোট ডিঙি নৌকায় চড়ে বনের ভেতরে ঘুরতে হয়। বনের মধ্যে একটি পর্যবেক্ষণ টাওয়ার আছে।
বিজ্ঞাপন
৩. ভোলাগঞ্জের সাদা পাথর: কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় ধলাই নদীর উৎসমুখে সাদা পাথরের বিস্তৃত চর, তার ওপর দিয়ে বয়ে যায় স্বচ্ছ ঠান্ডা পানি। ভোলাগঞ্জ ঘাট থেকে নৌকায় যেতে হয়।
৪. বিছনাকান্দি: গোয়াইনঘাটের সীমান্তঘেঁষা এলাকা, পাহাড় থেকে নামা পানির ধারা পাথরের বিছানার ওপর দিয়ে বয়ে যায়। বর্ষায় এর রূপ সবচেয়ে সুন্দর।
৫. লালাখাল: জৈন্তাপুর উপজেলায় সারি নদীর নীলচে-সবুজ পানি এর বিশেষত্ব। নৌকায় নদী ধরে উজানে গেলে দুই পাশে চা-বাগান আর পাহাড় দেখা যায়। জাফলং যাওয়ার পথেই পড়ে বলে একই দিনে দুটো দেখা সম্ভব।
হাতে আরও সময় থাকলে পাশের মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গলে চলে যেতে পারেন। দেশের চায়ের রাজধানী বলে পরিচিত শ্রীমঙ্গলে আছে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান আর অসংখ্য চা-বাগান। সিলেট থেকে সড়কপথে সেখানে যেতে ঘণ্টা তিনেক লাগে।
বিজ্ঞাপন
কখন যাবেন
সিলেটের নদী ও জলাবন দেখার সবচেয়ে ভালো সময় বর্ষা, অর্থাৎ জুন থেকে সেপ্টেম্বর। তখন রাতারগুল ডুবে থাকে, বিছনাকান্দি ও সাদা পাথরে পানির প্রবাহ বাড়ে, চারপাশ সবুজে ভরে যায়। তবে অতিবৃষ্টি বা পাহাড়ি ঢলের সময় নদীর পানি হঠাৎ বেড়ে যায়, কখনো কখনো প্রশাসন পর্যটক যাওয়া বন্ধও রাখে।
বর্ষায় ঘোরার সময় হাতে একটু বাড়তি সময় রাখুন। বৃষ্টি নামলে নৌকা ছাড়তে দেরি হয়, পাহাড়ি পথে গাড়িও ধীরে চলে। জুতা হিসেবে স্যান্ডেল বা দ্রুত শুকায় এমন জুতা সুবিধাজনক, মোবাইল ও ক্যামেরা রাখার জন্য পানিরোধী ব্যাগ নিন। শহরে ফেরার শেষ গাড়ির সময় আগে জেনে নিন, সন্ধ্যার পর অনেক রুটে যানবাহন কমে যায়।
শীতে, অর্থাৎ নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারিতে রাতারগুলে পানি প্রায় থাকে না, অনেক নদীতেও পানি কমে যায়। কিন্তু এ সময় আবহাওয়া আরামদায়ক, চা-বাগান আর শহরের জায়গাগুলো ঘোরার জন্য ভালো। অক্টোবর মাসটা দুই দিকের সুবিধাই খানিকটা দেয়।
বিজ্ঞাপন
থাকা, খাওয়া ও খরচ
শহরের দরগা গেট, জিন্দাবাজার ও আম্বরখানা এলাকায় সব মানের হোটেল আছে। সাধারণ মানের হোটেলে প্রতি রাত আনুমানিক ১০০০ থেকে ২৫০০ টাকা, মাঝারি মানের হোটেলে আনুমানিক ৩০০০ থেকে ৬০০০ টাকা। শহরের বাইরে চা-বাগান ও টিলার আশপাশে কিছু রিসোর্টও গড়ে উঠেছে, সেগুলোর ভাড়া বেশি।
খাবারের মধ্যে সাতকরা দিয়ে রান্না গরু বা খাসির মাংস, হাওরের মাছ আর শীতে চুঙ্গা পিঠা চেখে দেখতে পারেন। শ্রীমঙ্গলে গেলে কয়েক স্তরের রঙিন চা অনেকের কাছে আকর্ষণীয়।
শহর থেকে জাফলং বা সাদা পাথরে যেতে সিএনজি অটোরিকশা বা মাইক্রোবাস রিজার্ভ করা সুবিধাজনক। সারা দিনের জন্য সিএনজির ভাড়া আনুমানিক ২৫০০ থেকে ৩৫০০ টাকা, মাইক্রোবাসে বেশি। লোকাল বাস ও লেগুনাতেও যাওয়া যায়, খরচ অনেক কম পড়ে। রাতারগুল, বিছনাকান্দি বা সাদা পাথরে নৌকাভাড়া জায়গা ও মৌসুমভেদে আনুমানিক ৮০০ থেকে ২০০০ টাকা। সব মিলিয়ে ঢাকা থেকে বাসে গিয়ে তিন দিনের সাধারণ ভ্রমণে জনপ্রতি আনুমানিক ছয় থেকে নয় হাজার টাকা খরচ হতে পারে।
বিজ্ঞাপন
সতর্কতা
জাফলং ও সাদা পাথরে প্রতিবছর পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। ওপরে পানি শান্ত দেখালেও নিচে পাথরের ফাঁকে তীব্র স্রোত আর হঠাৎ গভীরতা থাকে। সাঁতার জানলেও গভীর পানিতে যাবেন না, শিশুদের হাত ধরে রাখুন। বর্ষায় পাহাড়ি ঢলের সতর্কবার্তা থাকলে নদীতে নামবেন না।
এসব জায়গার অনেকগুলো সীমান্তের একেবারে কাছে। সীমানা চিহ্নিত খুঁটি বা শূন্যরেখা পার হওয়ার চেষ্টা করবেন না, বিজিবির নির্দেশনা মেনে চলুন। নৌকায় ওঠার আগে লাইফ জ্যাকেট চেয়ে নিন। আর নদী বা বনে প্লাস্টিকের বোতল-প্যাকেট ফেলে আসবেন না, রাতারগুলের মতো সংবেদনশীল জায়গায় উচ্চ শব্দে গান বাজানোও উচিত নয়।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
বিজ্ঞাপন
এক দিনে জাফলং আর সাদা পাথর দুটোই ঘোরা যায়?
দুটো দুই দিকে, তাই এক দিনে দুটো দেখলে তাড়াহুড়া হয়। এক দিনে জাফলং ও লালাখাল, আরেক দিনে সাদা পাথর ও রাতারগুল ঘোরাই সুবিধাজনক।
শীতকালে রাতারগুল গেলে কী দেখা যাবে?
শীতে বনের পানি প্রায় শুকিয়ে যায়, নৌকায় ঘোরার সুযোগ থাকে না। জলাবনের আসল রূপ দেখতে বর্ষায় যান।
বিজ্ঞাপন
সিলেট ঘুরতে কয়দিন লাগে?
শহর আর প্রধান তিন-চারটি জায়গা দেখতে তিন দিন যথেষ্ট। শ্রীমঙ্গল যোগ করলে আরও এক দিন রাখুন।
পরিবার নিয়ে সিলেটে কোন জায়গাগুলো সুবিধাজনক?
মাজার, কিন ব্রিজ, মালনীছড়া চা-বাগান আর লালাখাল পরিবার নিয়ে ঘোরার জন্য সহজ। নদীতে নামার জায়গাগুলোতে শিশুদের নিয়ে বাড়তি সতর্ক থাকুন।