বিমান টিকিট কাটার নিয়ম: অনলাইনে বুকিং থেকে পেমেন্ট পর্যন্ত
ট্রাভেল ডেস্ক
প্রকাশ:
বিমানের টিকিট কাটতে এখন আর এয়ারলাইনের কাউন্টারে লাইন দিতে হয় না। মোবাইল বা কম্পিউটার থেকে এয়ারলাইনের নিজস্ব ওয়েবসাইট, অ্যাপ অথবা অনলাইন ট্রাভেল এজেন্সিতে ঢুকে রুট আর তারিখ বেছে নিলেই ভাড়ার তালিকা চলে আসে। যাত্রীর তথ্য দিয়ে কার্ড বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ে টাকা পরিশোধ করলেই কয়েক মিনিটের মধ্যে ইমেইলে চলে আসে ই-টিকিট।
বিজ্ঞাপন
তবু অনেকে প্রথমবার টিকিট কাটতে গিয়ে ছোটখাটো ভুল করেন, যার মাশুল পরে বড় হয়ে দাঁড়ায়। নামের বানানে একটি অক্ষরের ভুলে বোর্ডিংয়ে ঝামেলা, ফেরতযোগ্য নয় এমন টিকিট কিনে পরে তারিখ বদলাতে না পারা, কিংবা ভুয়া এজেন্টের হাতে টাকা খোয়ানো, এগুলো খুবই সাধারণ ঘটনা।
এই লেখায় দেশের ভেতরের ও আন্তর্জাতিক, দুই ধরনের টিকিট কাটার ধাপ, কী কী তথ্য লাগে, পেমেন্টের উপায় আর টিকিট কেনার পরের করণীয় তুলে ধরা হলো।
বিমান টিকিট কাটতে কী কী লাগে
১. যাত্রীর নাম: অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটে জাতীয় পরিচয়পত্র বা পাসপোর্টে যেভাবে লেখা, আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে পাসপোর্টে যেভাবে লেখা, ঠিক সেভাবে। নামের প্রথম ও শেষ অংশ আলাদা ঘরে দিতে হয়।
বিজ্ঞাপন
২. যোগাযোগের তথ্য: সচল মোবাইল নম্বর আর ইমেইল ঠিকানা। ফ্লাইটের সময় বদলালে এয়ারলাইন এগুলোতেই জানায়।
৩. পরিচয়পত্র: অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটে জাতীয় পরিচয়পত্র বা পাসপোর্ট, শিশুদের ক্ষেত্রে জন্মনিবন্ধন সনদ। আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে পাসপোর্টের নম্বর ও মেয়াদ দিতে হয়, অনেক দেশ যাত্রার সময় পাসপোর্টের মেয়াদ অন্তত ছয় মাস থাকা চায়।
৪. ভিসা: যে দেশে যাচ্ছেন সেখানে ভিসা লাগলে তা আগে নিশ্চিত করুন। ভিসা ছাড়া টিকিট কাটা যায়, কিন্তু বোর্ডিংয়ের সময় ভিসা না থাকলে যাত্রা করতে দেওয়া হবে না।
৫. পেমেন্টের মাধ্যম: ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ড, মোবাইল ব্যাংকিং অথবা ইন্টারনেট ব্যাংকিং। আন্তর্জাতিক কার্ড দিয়ে বিদেশি ওয়েবসাইটে কিনতে হলে কার্ডে ডলার এনডোর্সমেন্ট বা আন্তর্জাতিক লেনদেনের সুবিধা লাগে।
বিজ্ঞাপন
অনলাইনে বিমান টিকিট বুকিংয়ের ধাপ
১. রুট ও তারিখ বাছাই: কোথা থেকে কোথায়, একমুখী না যাওয়া-আসা, কোন তারিখে আর কতজন যাত্রী, তা দিয়ে খোঁজ করুন। প্রাপ্তবয়স্ক, শিশু ও কোলের শিশুর সংখ্যা আলাদাভাবে দিতে হয়।
২. ফ্লাইট ও ভাড়ার ধরন বেছে নিন: একই ফ্লাইটে একাধিক ভাড়ার শ্রেণি থাকে। সবচেয়ে কম ভাড়ার টিকিটে প্রায়ই ব্যাগেজ কম থাকে আর তারিখ বদল বা ফেরতের সুযোগ সীমিত থাকে। ভাড়ার নিয়মাবলি পড়ে তবেই বাছাই করুন।
৩. যাত্রীর তথ্য পূরণ: নাম, জন্মতারিখ, লিঙ্গ, প্রয়োজনে পাসপোর্টের তথ্য দিন। জমা দেওয়ার আগে আরেকবার মিলিয়ে নিন।
বিজ্ঞাপন
৪. আসন ও বাড়তি সেবা: অনেক এয়ারলাইন নির্দিষ্ট আসন বা বাড়তি ব্যাগেজের জন্য আলাদা মূল্য নেয়। প্রয়োজন না হলে এগুলো এড়িয়ে যেতে পারেন।
৫. পেমেন্ট: পছন্দের মাধ্যমে টাকা পরিশোধ করুন। পেমেন্টের সময় পাতা রিফ্রেশ বা বন্ধ করবেন না, এতে দুবার টাকা কাটার ঝুঁকি থাকে।
৬. ই-টিকিট সংগ্রহ: সফল পেমেন্টের পর ইমেইলে ই-টিকিট আসে, তাতে ছয় অক্ষরের একটি বুকিং রেফারেন্স বা পিএনআর থাকে। ই-টিকিটের পিডিএফ মোবাইলে রাখুন, সম্ভব হলে প্রিন্টও করে নিন।
কোথা থেকে কিনবেন
বিজ্ঞাপন
দেশের ভেতরে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস, ইউএস-বাংলা, নভোএয়ার ও এয়ার অ্যাস্ট্রা নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনা করে। এদের নিজস্ব ওয়েবসাইট বা অ্যাপ থেকে সরাসরি কিনলে পরে তারিখ বদল বা ফেরতের কাজ সহজ হয়। অনলাইন ট্রাভেল এজেন্সিগুলোতে একসঙ্গে অনেক এয়ারলাইনের ভাড়া তুলনা করা যায়, মাঝে মাঝে ছাড়ও মেলে।
দেশের ভেতরে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, সিলেট, যশোর, রাজশাহী, সৈয়দপুর ও বরিশাল রুটে নিয়মিত ফ্লাইট চলে। সব এয়ারলাইন সব রুটে ফ্লাইট চালায় না, আর এক রুটে দিনে কয়টি ফ্লাইট থাকবে তা মৌসুমভেদে বদলায়। তাই যাত্রার তারিখ ঠিক করার আগে কোন এয়ারলাইনের কোন সময়ে ফ্লাইট আছে, তা দেখে নিন।
পরিচিত ট্রাভেল এজেন্টের মাধ্যমে কিনলে টাকা দেওয়ার পর পিএনআর নম্বরটি নিন এবং এয়ারলাইনের ওয়েবসাইটে বুকিং দেখার অপশনে গিয়ে নিজে মিলিয়ে দেখুন টিকিট সত্যিই ইস্যু হয়েছে কি না। শুধু বুকিং করে রাখা আর টিকিট ইস্যু হওয়া এক জিনিস নয়।
টিকিট কেনার পর করণীয়
বিজ্ঞাপন
অনলাইন চেক-ইন: অনেক এয়ারলাইন ফ্লাইটের নির্দিষ্ট সময় আগে অনলাইনে চেক-ইনের সুযোগ দেয়। এতে বিমানবন্দরে লাইনে কম সময় লাগে।
বিমানবন্দরে পৌঁছানো: অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটে অন্তত এক ঘণ্টা আগে আর আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে অন্তত তিন ঘণ্টা আগে পৌঁছানো নিরাপদ। ছুটির মৌসুমে আরও আগে যান।
ব্যাগেজের নিয়ম: অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটে সাধারণত ২০ কেজির মতো চেকড ব্যাগেজ আর ছোট একটি হাতব্যাগ নেওয়া যায়, তবে ভাড়ার শ্রেণিভেদে তা কম-বেশি হয়। ই-টিকিটে লেখা পরিমাণই চূড়ান্ত। পাওয়ার ব্যাংক ও লিথিয়াম ব্যাটারি চেকড ব্যাগে দেওয়া যায় না, হাতব্যাগে রাখতে হয়। আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে হাতব্যাগে তরল পদার্থ বহনে সীমা থাকে।
আন্তর্জাতিক টিকিটে বাড়তি সতর্কতা
বিজ্ঞাপন
সরাসরি ফ্লাইট না থাকলে মাঝপথে অন্য দেশে বিমান বদলাতে হয়। কিছু দেশ বিমানবন্দরের ভেতরে থেকেও ট্রানজিট ভিসা চায়। টিকিট কাটার আগে ট্রানজিট দেশের নিয়ম জেনে নিন। দুই ফ্লাইটের মাঝে যথেষ্ট সময় আছে কি না, সেটিও দেখুন। আলাদা আলাদা টিকিটে দুই ফ্লাইট কিনলে প্রথমটি দেরি করলে দ্বিতীয়টি হারানোর দায় আপনার, তাই সম্ভব হলে একটি টিকিটেই পুরো যাত্রা কিনুন।
অনেক দেশের ইমিগ্রেশন ভ্রমণ ভিসায় যাওয়া যাত্রীর কাছে ফিরতি বা পরের গন্তব্যের টিকিট দেখতে চায়। একমুখী টিকিটে গেলে বোর্ডিংয়ে প্রশ্নের মুখে পড়তে পারেন। বিদেশে খরচের জন্য পাসপোর্টে ডলার এনডোর্সমেন্ট করিয়ে নিন। দেশ ছাড়ার সময়ের ভ্রমণ কর সাধারণত টিকিটের দামের সঙ্গেই যুক্ত থাকে, ই-টিকিটে করের ঘরে তা দেখা যায়।
টাকা বাঁচানোর কিছু কৌশল
যত আগে কিনবেন, ভাড়া সাধারণত তত কম। ঈদ, পূজা আর শীতের ছুটির আগে ভাড়া দ্রুত বাড়ে। সপ্তাহের মাঝের দিনগুলোতে ভাড়া প্রায়ই কম থাকে। যাত্রার তারিখ নমনীয় হলে আশপাশের কয়েকটি দিনের ভাড়া মিলিয়ে দেখুন। এয়ারলাইনগুলোর অ্যাপে মাঝে মাঝে বিশেষ ছাড় ঘোষণা করা হয়, নোটিফিকেশন চালু রাখলে খবর পাবেন।
বিজ্ঞাপন
সবচেয়ে কম দামের টিকিটই সব সময় সাশ্রয়ী নয়। ব্যাগেজ আলাদা কিনতে হলে বা তারিখ বদলের ফি দিতে হলে শেষ পর্যন্ত মোট খরচ বেড়ে যায়। তাই ভাড়ার পাশাপাশি ব্যাগেজ, ফেরতের নিয়ম আর যাত্রার মোট সময়ও তুলনা করুন। কার্ডে পেমেন্টের সময় ব্যাংকের বাড়তি চার্জ আছে কি না, সেটিও জেনে নিন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
টিকিটে নামের বানান ভুল হলে কী করব?
যত দ্রুত সম্ভব এয়ারলাইন বা যে এজেন্সি থেকে কিনেছেন তাদের জানান। ছোট সংশোধন অনেক সময় করা যায়, তবে নিয়ম ও ফি এয়ারলাইনভেদে আলাদা।
বিজ্ঞাপন
টিকিট বাতিল করলে কি টাকা ফেরত পাওয়া যায়?
ফেরতযোগ্য টিকিটে নির্দিষ্ট চার্জ কেটে টাকা ফেরত পাওয়া যায়। ফেরতযোগ্য নয় এমন টিকিটে সাধারণত শুধু কিছু কর ফেরত মেলে।
শিশুর জন্য কি আলাদা টিকিট লাগে?
হ্যাঁ, কোলের শিশুর জন্যও টিকিট লাগে, যদিও ভাড়া অনেক কম। দুই বছরের বেশি বয়সী শিশুর জন্য আলাদা আসনসহ শিশুভাড়ার টিকিট কাটতে হয়।
বিজ্ঞাপন
বিমানবন্দরে কি প্রিন্ট করা টিকিট দেখাতে হয়?
মোবাইলে ই-টিকিট দেখালেই সাধারণত চলে। তবে বিমানবন্দরে ঢোকার সময় কেউ কেউ প্রিন্ট চাইতে পারেন, তাই একটি প্রিন্ট কপি সঙ্গে রাখা নিরাপদ।