মোটা হওয়ার উপায়: স্বাস্থ্যকর খাবারে ওজন বাড়ানোর সঠিক নিয়ম
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ:
কেউ ওজন কমাতে হিমশিম খান, কেউ আবার যত খান, গায়ে লাগে না। শীর্ণ শরীর নিয়ে আত্মীয়-বন্ধুর মন্তব্য শুনতে শুনতে অনেকে মোটা হওয়ার উপায় খুঁজতে গিয়ে ফাস্ট ফুড, মিষ্টি বা ফার্মেসির রুচি বাড়ানোর বড়ির দিকে ঝোঁকেন। এতে ওজন হয়তো বাড়ে, কিন্তু বাড়ে পেটে চর্বি, স্বাস্থ্য নয়। লক্ষ্য হওয়া উচিত পেশি আর সুস্থ ওজন বাড়ানো, যাতে শরীরে শক্তি আসে।
বিজ্ঞাপন
এর মূল নিয়মটা সোজা: শরীর প্রতিদিন যত শক্তি খরচ করে, তার চেয়ে নিয়মিত কিছুটা বেশি খাওয়া, সেই বাড়তি খাবার আসা পুষ্টিকর উৎস থেকে, আর সঙ্গে পেশির ব্যায়াম। সাধারণত দৈনিক চাহিদার চেয়ে ৩০০ থেকে ৫০০ ক্যালরি বেশি খেলে সপ্তাহে প্রায় এক-চতুর্থাংশ থেকে আধা কেজি ওজন বাড়তে পারে, যা স্বাস্থ্যকর গতি।
শুরুতে দুটি যাচাই: ওজন আর অসুখ
উচ্চতা ও ওজন দিয়ে বিএমআই হিসাব করুন: ওজন (কেজি) ভাগ উচ্চতার (মিটার) বর্গ। বিএমআই ১৮.৫-এর নিচে হলে ওজন কম ধরা হয়। যেমন, পাঁচ ফুট ছয় ইঞ্চি বা প্রায় ১.৬৮ মিটার উচ্চতার কারও ওজন ৫২ কেজির নিচে হলে তিনি কম ওজনের তালিকায় পড়েন। এর ওপরে থাকলে আপনি হয়তো স্বাভাবিক ওজনেরই, শুধু গড়ন হালকা; সে ক্ষেত্রে ওজনের চেয়ে পেশি বাড়ানোয় মন দিন।
লুকানো কারণ খুঁজুন: আগে স্বাভাবিক ওজন ছিল, এখন চেষ্টা ছাড়াই কমে যাচ্ছে, কিংবা যথেষ্ট খেয়েও ওজন বাড়ছে না, এমন হলে আগে চিকিৎসকের কাছে যান। কারণ এর পেছনে থাকতে পারে:
বিজ্ঞাপন
১. থাইরয়েড হরমোন বেশি: বুক ধড়ফড়, গরম লাগা, হাত কাঁপা, ঘন ঘন পায়খানার সঙ্গে ওজন কমা।
২. ডায়াবেটিস: ঘন ঘন প্রস্রাব, বেশি পিপাসা, ক্লান্তি।
৩. যক্ষ্মা: দুই সপ্তাহের বেশি কাশি, সন্ধ্যায় জ্বর, রাতে ঘাম।
৪. পেটের সমস্যা: কৃমি, আলসার, দীর্ঘদিনের ডায়রিয়া বা খাবার শোষণে সমস্যা।
বিজ্ঞাপন
৫. মানসিক অবস্থা: বিষণ্নতা, দুশ্চিন্তা বা খাওয়ার প্রতি অনীহা তৈরি করা মানসিক সমস্যা।
এসব বাদ গেলে সাধারণত দেখা যায়, আসলে খাওয়াটাই কম হচ্ছে। অনেকে ভাবেন প্রচুর খাচ্ছেন, কিন্তু দুই-তিন দিন খাবার লিখে রাখলে দেখা যায় বেলা বাদ যাচ্ছে বা পরিমাণ কম।
মোটা হওয়ার মূল নিয়ম
১. পাঁচ-ছয় বেলা খান: যাঁদের অল্পতেই পেট ভরে যায়, তাঁদের জন্য তিন বেলা ভারী খাবারের চেয়ে তিন বেলা মূল খাবার আর মাঝে দুই-তিনবার নাশতা সহজ।
বিজ্ঞাপন
২. প্রতি বেলায় একটু বাড়ান: হঠাৎ দ্বিগুণ খাওয়ার চেষ্টা টেকে না। ভাতে আধা কাপ বাড়ান, ডালে এক চামচ ঘি বা তেল দিন, নাশতায় একটি ডিম যোগ করুন।
৩. ক্যালরি ঘন খাবার বেছে নিন: অল্প পরিমাণে বেশি পুষ্টি ও শক্তি দেয় এমন খাবার, যেমন বাদাম, চিনাবাদাম, ঘি, দুধ, ডিম, কলা, খেজুর, কিশমিশ।
৪. পানীয়তে ক্যালরি: খাবারের আগে বেশি পানি খেলে পেট ভরে যায়। খাবারের আধা ঘণ্টা পরে পানি খান। দুধ, লাচ্ছি, ফল ও দুধের স্মুদি দিয়ে সহজে বাড়তি ক্যালরি পাওয়া যায়।
৫. ঘুম ও নিয়মিততা: রাতে সাত-আট ঘণ্টা ঘুম আর নির্দিষ্ট সময়ে খাওয়া ক্ষুধার স্বাভাবিক ছন্দ ফেরায়।
বিজ্ঞাপন
কী খেলে মোটা হওয়া যায়: ওজন বাড়ানোর খাবার
শর্করা: ভাত, রুটি, পরোটা পরিমিত, চিড়া, মুড়ি, সুজি, ওটস, আলু, মিষ্টি আলু। খিচুড়ি চাল, ডাল আর সবজির ভালো মিশ্রণ, সঙ্গে ডিম দিলে পূর্ণাঙ্গ খাবার।
প্রোটিন: ডিম, মাছ, মুরগি, গরু-খাসির মাংস পরিমিত, ডাল, ছোলা, দুধ, দই, পনির। পেশি তৈরিতে প্রোটিন জরুরি।
স্বাস্থ্যকর চর্বি: চিনাবাদাম, কাজুবাদাম, কাঠবাদাম, পিনাট বাটার, তিল, অল্প ঘি বা মাখন, ডিমের কুসুম, সামুদ্রিক মাছ।
বিজ্ঞাপন
ফল: পাকা কলা, আম, খেজুর, কিশমিশ, কাঁঠাল, সফেদা। এগুলো সহজে বাড়তি শক্তি দেয়।
ঘরে বানানো একটি সহজ পানীয়: এক গ্লাস দুধ, একটি পাকা কলা, দুই-তিনটি খেজুর আর এক চামচ পিনাট বাটার বা এক মুঠো বাদাম ব্লেন্ড করে নিন। বিকেলের নাশতা হিসেবে এটি মোটামুটি চার থেকে পাঁচশো ক্যালরি দিতে পারে, পরিমাণভেদে কম-বেশি হয়।
ঘরোয়া উপায়ে মোটা হওয়া: একটি নমুনা দিনের তালিকা
সকাল: দুটি রুটি বা পরোটা, একটি ডিম ভাজি বা সেদ্ধ, সবজি, এক গ্লাস দুধ।
বিজ্ঞাপন
মধ্যসকাল: একটি কলা আর এক মুঠো বাদাম, অথবা দই-চিড়া।
দুপুর: দেড় থেকে দুই কাপ ভাত, ঘন ডাল, মাছ বা মুরগির তরকারি, সবজি, সালাদ।
বিকেল: দুধ-কলা-খেজুরের স্মুদি, অথবা ছোলা-মুড়ি আর ডিম সেদ্ধ।
রাত: ভাত বা রুটি, মাংস বা মাছ, ডাল, সবজি।
বিজ্ঞাপন
ঘুমের আগে: এক গ্লাস গরম দুধ।
এটি একটি উদাহরণ মাত্র। নিজের রুচি ও সামর্থ্য অনুযায়ী বদলে নিন। দুই সপ্তাহ পর ওজন না বাড়লে প্রতিদিনের খাবারে আরও একটি ছোট নাশতা যোগ করুন।
বাজেট কম হলেও ওজন বাড়ানো সম্ভব। দামি বাদাম বা প্রোটিন পাউডারের বদলে চিনাবাদাম, ছোলা, ডাল, ডিম, মৌসুমি কলা, দুধ আর ভাতই যথেষ্ট কাজ করে। ছোলা ও চিনাবাদাম একসঙ্গে ভেজে বা ভিজিয়ে রেখে নাশতায় খাওয়া যায়। সপ্তাহে একবার একই সময়ে ওজন মেপে খাতায় লিখুন। এক মাসে কোনো পরিবর্তন না এলে খাবারের পরিমাণ আরেকটু বাড়ান, অথবা একজন পুষ্টিবিদের সঙ্গে বসে নিজের জন্য আলাদা তালিকা করে নিন।
ব্যায়াম: পেশি না বাড়লে বাড়তি ওজন হবে চর্বি
বিজ্ঞাপন
অনেকে ভাবেন ব্যায়াম করলে ওজন আরও কমবে। আসলে সপ্তাহে তিন দিন পেশি শক্ত করার ব্যায়াম, যেমন স্কোয়াট, পুশআপ, লাঞ্জ, ডাম্বেল বা জিমে ওজন তোলা, খাওয়া বাড়তি খাবারকে পেশিতে রূপ দিতে সাহায্য করে। ব্যায়ামে ক্ষুধাও বাড়ে। দীর্ঘ সময় দৌড়ানোর মতো বেশি ক্যালরি খরচের ব্যায়াম সীমিত রাখুন। জিমে নতুন হলে প্রশিক্ষকের কাছ থেকে সঠিক ভঙ্গি শিখে নিন।
যে ভুলগুলো করবেন না
চিপস, কোমল পানীয়, মিষ্টি আর ফাস্ট ফুডে ওজন বাড়ে ঠিকই, কিন্তু রক্তে চর্বি ও চিনি বাড়ে, পেটে মেদ জমে। মোটা হওয়ার বড়ি বা রুচি বাড়ানোর সিরাপের কিছুতে স্টেরয়েড বা এমন উপাদান থাকতে পারে, যা শরীরে পানি জমায়, হাড় দুর্বল করে, রক্তে চিনি বাড়ায়। চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ছাড়া এমন কিছু খাবেন না। প্রোটিন পাউডার বা ওজন বাড়ানোর পাউডার প্রয়োজন হলে পুষ্টিবিদের পরামর্শ নিয়ে নির্ভরযোগ্য পণ্য বেছে নিন; স্বাভাবিক খাবারেই বেশির ভাগ মানুষের চাহিদা মেটে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
বিজ্ঞাপন
এক মাসে কত কেজি ওজন বাড়ানো যায়?
স্বাস্থ্যকর উপায়ে মাসে এক থেকে দুই কেজি বাড়ানো বাস্তবসম্মত। এর চেয়ে দ্রুত বাড়লে বেশির ভাগই চর্বি হওয়ার সম্ভাবনা।
রাতে ভাত খেলে কি মোটা হওয়া যায়?
ওজন বাড়ে মোট খাবারের পরিমাণে, নির্দিষ্ট সময়ে নয়। রাতে ভাত খেতে পারেন, তবে দিনের মোট খাবার চাহিদার চেয়ে বেশি হতে হবে।
বিজ্ঞাপন
ছেলেদের ও মেয়েদের মোটা হওয়ার নিয়ম কি আলাদা?
মূল নিয়ম একই। ছেলেদের সাধারণত দৈনিক ক্যালরির চাহিদা বেশি, তাই তাঁদের খাবারের পরিমাণও একটু বেশি লাগে।
খুব কম খিদে লাগলে কী করব?
অল্প অল্প করে বারবার খান, তরল খাবার বেশি রাখুন এবং নিয়মিত হাঁটা বা ব্যায়াম করুন। দীর্ঘদিন রুচি না থাকলে চিকিৎসক দেখান, কারণ এর পেছনে কোনো অসুখ থাকতে পারে।