পেটের মেদ কমানোর উপায়: ব্যায়াম, খাবার ও দৈনন্দিন অভ্যাস
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ:
দিনে একশোটা সিট-আপ দিলেই ভুঁড়ি গলে যাবে, এই ধারণাটা যত প্রচলিত, ততটাই ভুল। শরীর নির্দিষ্ট একটি জায়গা থেকে বেছে বেছে চর্বি খরচ করে না। পেটের ব্যায়ামে পেটের পেশি শক্ত হয়, কিন্তু তার ওপরের চর্বির স্তর কমে তখনই, যখন সারা শরীরের চর্বি কমে। তাই পেটের মেদ কমানোর উপায় আসলে তিনটি কাজের যোগফল: খাবারে ক্যালরি কমানো, নিয়মিত হাঁটা বা দৌড়ানোর মতো ব্যায়াম, আর পেশি শক্ত করার ব্যায়াম।
বিজ্ঞাপন
ভালো খবর হলো, পেটের ভেতরের চর্বি, যেটি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকর, সেটি সাধারণত নিয়মিত ব্যায়াম ও খাদ্যাভ্যাস বদলালে তুলনামূলক দ্রুত সাড়া দেয়। কয়েক কেজি ওজন কমলেই কোমরের মাপে পরিবর্তন চোখে পড়ে।
পেটের মেদ কেন বেশি ক্ষতিকর
পেটে দুই ধরনের চর্বি জমে। চামড়ার ঠিক নিচের নরম চর্বি, যা আঙুলে চিমটি কেটে ধরা যায়। আর পেটের ভেতরে লিভার, অন্ত্র ও অন্যান্য অঙ্গের চারপাশে জমা চর্বি, যাকে ভিসেরাল ফ্যাট বলে। দ্বিতীয়টি টাইপ-২ ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্রোগ, ফ্যাটি লিভার ও রক্তে চর্বির সমস্যার ঝুঁকি বাড়ায়। দক্ষিণ এশীয়দের মধ্যে কম ওজনেও পেটে চর্বি জমার প্রবণতা বেশি, তাই হালকা-পাতলা মানুষেরও ভুঁড়ি থাকলে তা অবহেলা করা ঠিক নয়।
নিজে মাপুন: সকালে খালি পেটে, স্বাভাবিকভাবে শ্বাস ছেড়ে, নাভির সামান্য ওপরে কোমরের চারপাশে মাপার ফিতা পেঁচিয়ে মাপ নিন। দক্ষিণ এশীয় পুরুষের কোমর ৯০ সেন্টিমিটার (প্রায় সাড়ে ৩৫ ইঞ্চি) এবং নারীর ৮০ সেন্টিমিটারের (প্রায় সাড়ে ৩১ ইঞ্চি) বেশি হলে ঝুঁকি বেশি ধরা হয়। মাসে একবার মেপে খাতায় লিখে রাখুন; ওজনের চেয়ে এই সংখ্যাটা পেটের মেদের ভালো সূচক।
বিজ্ঞাপন
খাবারে যা বদলাবেন
১. চিনি ও মিষ্টি পানীয় বাদ দিন: কোমল পানীয়, প্যাকেটজাত জুস, চিনি দেওয়া চা-কফি আর মিষ্টি পেটের চর্বি বাড়ানোর অন্যতম বড় কারণ। চায়ে চিনি এক চামচ থেকে আধা চামচে নামান, তারপর ধীরে ধীরে ছেড়ে দিন।
২. সাদা চাল ও ময়দার পরিমাণ কমান: ভাতের প্লেট ছোট করুন, পরোটা-নান-পাউরুটির বদলে লাল আটার রুটি খান। চাল-ময়দার জায়গা নিক সবজি আর ডাল।
৩. প্রোটিন বাড়ান: ডিম, মাছ, মুরগি, ডাল, ছোলা, দই প্রতিবেলায় রাখুন। প্রোটিন ক্ষুধা কমায় এবং ওজন কমানোর সময় পেশি রক্ষা করে।
বিজ্ঞাপন
৪. আঁশযুক্ত খাবার: শাক, সবজি, ফল, ডাল আর ওটস পেট ভরা রাখে। দিনে অন্তত তিন-চার বাটি সবজি ও দুটি ফল রাখার চেষ্টা করুন।
৫. তেল ও ভাজাপোড়া: রান্নায় তেল মেপে দিন, ভাজার বদলে ভাপে, সেদ্ধ বা কম তেলে রান্না করুন। বিকেলের সিঙ্গাড়া-পুরির বদলে মুড়ি-ছোলা, ফল বা এক মুঠো বাদাম খান।
৬. রাতের খাবার হালকা ও আগে: রাতে দেরিতে ভারী খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ার অভ্যাস বদলান।
পেটের মেদ কমানোর ব্যায়াম
বিজ্ঞাপন
কার্ডিও বা হৃৎস্পন্দন বাড়ানো ব্যায়াম: সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট দ্রুত হাঁটা, সাইকেল চালানো, সাঁতার বা সিঁড়ি ভাঙা। পেটের মেদ কমাতে এর চেয়ে বেশি, দিনে ৪৫ থেকে ৬০ মিনিট পর্যন্ত বাড়াতে পারলে ভালো। এমন গতিতে হাঁটুন, যাতে কথা বলা যায় কিন্তু গান গাওয়া কঠিন লাগে।
পেশি শক্ত করার ব্যায়াম: সপ্তাহে দুই-তিন দিন। পেশি বাড়লে শরীর বিশ্রামেও বেশি শক্তি খরচ করে। নিচের ব্যায়ামগুলো ঘরেই করা যায়:
১. প্ল্যাংক: কনুই ও পায়ের আঙুলে ভর দিয়ে শরীর মাথা থেকে গোড়ালি পর্যন্ত সোজা রাখুন। ২০ সেকেন্ড দিয়ে শুরু করে ধীরে ধীরে এক মিনিটে নিন। কোমর ঝুলে পড়তে বা উঁচু হয়ে যেতে দেবেন না।
২. স্কোয়াট: পা কাঁধের সমান ফাঁক করে দাঁড়িয়ে চেয়ারে বসার ভঙ্গিতে নিতম্ব পেছনে নামান, তারপর উঠে দাঁড়ান। ১০-১৫ বার করে দুই-তিন সেট।
বিজ্ঞাপন
৩. ব্রিজ: চিত হয়ে শুয়ে হাঁটু ভাঁজ করে পা মেঝেতে রাখুন, তারপর কোমর ওপরে তুলে কয়েক সেকেন্ড ধরে রেখে নামান।
৪. বার্ড ডগ: হামাগুড়ির ভঙ্গিতে এক হাত সামনে আর বিপরীত পা পেছনে সোজা করে কয়েক সেকেন্ড রাখুন, তারপর অন্য পাশে করুন। কোমরের জন্য নিরাপদ।
৫. পুশআপ: শুরুতে দেয়ালে বা হাঁটু মেঝেতে রেখে করা যায়।
কোমর বা হাঁটুর ব্যথা, হৃদ্রোগ বা উচ্চ রক্তচাপ থাকলে নতুন ব্যায়াম শুরুর আগে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলুন। সিট-আপ বা ক্রাঞ্চ করতে চাইলে ঘাড়ে টান না দিয়ে পেটের পেশি দিয়ে উঠুন; কোমরব্যথা থাকলে এগুলো এড়িয়ে চলাই ভালো।
বিজ্ঞাপন
মহিলাদের পেটের মেদ কমানোর উপায়
নারীদের পেটের মেদ বাড়ার সঙ্গে জীবনের কয়েকটি পর্ব জড়িত। সন্তান জন্মের পর পেট ঝুলে থাকা খুব স্বাভাবিক; জরায়ু আগের আকারে ফিরতে সময় লাগে। সাধারণ প্রসবের পর হাঁটা দিয়ে শুরু করা যায়, তবে পেটের জোরালো ব্যায়াম শুরুর আগে চিকিৎসকের অনুমতি নিন, আর সিজারিয়ান হলে আরও বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয়। কারও কারও পেটের মাঝখানের পেশি দুই পাশে সরে যায়; এ অবস্থায় সাধারণ ক্রাঞ্চ ক্ষতি করতে পারে, তাই চিকিৎসক বা ফিজিওথেরাপিস্টের দেখানো ব্যায়াম করাই নিরাপদ। বুকের দুধ খাওয়ানোর সময় কঠোর ডায়েট নয়, পুষ্টিকর খাবার পরিমিত পরিমাণে খান।
মেনোপজের কাছাকাছি বয়সে হরমোনের পরিবর্তনে চর্বি পেটের দিকে জমার প্রবণতা বাড়ে। এ সময় পেশির ব্যায়াম বিশেষ জরুরি। পিসিওএস থাকলে পেটে মেদ জমা ও ওজন কমাতে কষ্ট হওয়া সাধারণ; অনিয়মিত মাসিক, মুখে লোম বা ব্রণ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন, কারণ তখন খাবার ও ব্যায়ামের সঙ্গে চিকিৎসাও লাগতে পারে।
ঘুম, চাপ আর যা কাজ করে না
বিজ্ঞাপন
নিয়মিত ছয় ঘণ্টার কম ঘুম এবং দীর্ঘ মানসিক চাপ পেটে চর্বি জমার সঙ্গে সম্পর্কিত। রাতে সাত-আট ঘণ্টা ঘুমের চেষ্টা করুন, দিনে কিছু সময় নিজের জন্য রাখুন। ধূমপানও পেটের চর্বি বাড়ানোর সঙ্গে যুক্ত।
পেটে বেল্ট বা ঘাম ঝরানো র্যাপ পরে থাকলে পানি বেরিয়ে সাময়িক কোমর ছোট দেখায়, চর্বি কমে না। ভুঁড়ি কমানোর চা, মালিশের তেল বা বড়ির বিজ্ঞাপনে ভরসা করবেন না। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ খাবেন না।
কত সময় লাগবে: নিয়ম মেনে চললে সাধারণত চার থেকে আট সপ্তাহের মধ্যে কোমরের মাপে পরিবর্তন দেখা শুরু হয়। তিন মাস পর মাপ মিলিয়ে দেখুন। ধীর কিন্তু স্থির পরিবর্তনই টেকে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
বিজ্ঞাপন
ভুঁড়ি কমানোর উপায় হিসেবে কি শুধু সকালে হাঁটা যথেষ্ট?
হাঁটা উপকারী, তবে খাবারে চিনি ও তেল না কমালে ফল আসে ধীরে। হাঁটার সঙ্গে খাদ্যাভ্যাস বদল আর সপ্তাহে দুই দিন পেশির ব্যায়াম যোগ করলে ভুঁড়ি দ্রুত কমে।
গরম পানিতে লেবু-মধু খেলে কি পেটের চর্বি গলে?
না। এটি চিনিযুক্ত পানীয়ের ভালো বিকল্প হতে পারে, কিন্তু নিজে চর্বি গলায় না।
বিজ্ঞাপন
পেটের মেদ কি আগে কমে, না অন্য জায়গার?
এটি ব্যক্তিভেদে ভিন্ন। অনেকের মুখ ও হাতের চর্বি আগে কমে, পেটেরটা পরে। ধৈর্য ধরে নিয়ম চালিয়ে গেলে পেটও কমে।
কত দিন পরপর কোমর মাপব?
মাসে একবার মাপাই যথেষ্ট, একই সময়ে, একই জায়গায়। প্রতিদিন মাপলে সামান্য ওঠানামায় অযথা হতাশ লাগে।
বিজ্ঞাপন
ভুঁড়ি কমাতে কি ভাত পুরোপুরি ছাড়তে হবে?
না। ভাতের পরিমাণ কমিয়ে প্লেটের অর্ধেক সবজি দিয়ে ভরলে এবং সঙ্গে মাছ, ডিম বা ডাল রাখলেই যথেষ্ট। পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়া বেশির ভাগ মানুষ দীর্ঘদিন ধরে রাখতে পারেন না, ফলে আবার আগের অভ্যাসে ফিরে যান।