খুশকি দূর করার উপায়: ঘরোয়া প্যাক, শ্যাম্পু ও মাথার ত্বকের যত্ন
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ:
কালো জামার কাঁধে সাদা গুঁড়া, মাথা চুলকানো, চিরুনিতে আঁশ, খুশকির এই চেনা অস্বস্তি শীতকালে আরও বাড়ে। অনেকে ভাবেন, চুল নোংরা বলেই খুশকি হয়। আসলে খুশকির মূল কারণ মাথার ত্বকে স্বাভাবিকভাবে থাকা মালাসেজিয়া নামের একধরনের ইস্ট বা ছত্রাক। ত্বকের তেল খেয়ে এরা বাড়ে, আর কারও কারও ত্বক এদের প্রতি সংবেদনশীল হওয়ায় ত্বকের কোষ দ্রুত ঝরে পড়ে আঁশের মতো দেখায়।
বিজ্ঞাপন
খুশকি দূর করার উপায় তাই দুটি: ছত্রাকের বাড়বাড়ন্ত নিয়ন্ত্রণ আর মাথার ত্বকের বাড়তি তেল ও আঁশ নিয়মিত পরিষ্কার। খুশকি সাধারণত একবারে চিরতরে যায় না, তবে সঠিক শ্যাম্পু আর অভ্যাসে প্রায় পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।
খুশকি কেন হয়, কখন বাড়ে
তৈলাক্ত মাথার ত্বকে খুশকি বেশি হয়, কারণ সেখানে ছত্রাকের খাবার বেশি। বয়ঃসন্ধির পর থেকে মধ্যবয়স পর্যন্ত এটি সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। শীতের শুষ্ক বাতাস, মানসিক চাপ, ঘুমের অভাব, কম চুল ধোয়া, মাথায় ঘাম জমে থাকা এবং চুলে ভারী তেল বা জেল ব্যবহারে খুশকি বাড়ে।
শুষ্ক মাথার ত্বকেও ছোট ছোট সাদা আঁশ ওঠে, যেটি আসলে খুশকি নয়, শুষ্কতা। এর আঁশ ছোট ও শুকনো, চুলকানি কম, আর তেল দিলে কমে। অন্যদিকে খুশকির আঁশ একটু বড়, তেলতেলে, হলদেটে হতে পারে। পার্থক্যটা বোঝা জরুরি, কারণ শুষ্ক ত্বকে কড়া খুশকিনাশক শ্যাম্পু বেশি দিলে সমস্যা বাড়তে পারে।
বিজ্ঞাপন
খুশকি দূর করার শ্যাম্পু: কোন উপাদান দেখবেন
বাজারের শ্যাম্পুর নাম নয়, মোড়কে লেখা কার্যকর উপাদান দেখে কিনুন।
১. কিটোকোনাজল: ছত্রাকনাশক, খুশকির মূল কারণের ওপর সরাসরি কাজ করে। মাঝারি থেকে বেশি খুশকিতে কার্যকর।
২. জিঙ্ক পাইরিথিয়ন: ছত্রাক ও ব্যাকটেরিয়া কমায়, হালকা খুশকিতে নিয়মিত ব্যবহারের উপযোগী।
বিজ্ঞাপন
৩. সেলেনিয়াম সালফাইড: ছত্রাক কমায় এবং কোষ ঝরে পড়ার গতি ধীর করে। রং করা চুলে রং কিছুটা বদলে দিতে পারে।
৪. স্যালিসাইলিক অ্যাসিড: পুরু আঁশ নরম করে তুলে ফেলতে সাহায্য করে।
৫. কোল টার: পুরোনো ও একগুঁয়ে খুশকিতে ব্যবহার হয়, তবে গন্ধ কড়া এবং হালকা রঙের চুলে দাগ ফেলতে পারে।
ব্যবহারের নিয়ম: চুল ভিজিয়ে শ্যাম্পু মূলত মাথার ত্বকে লাগান, আঙুলের ডগায় আলতো ঘষে ফেনা তুলুন, তারপর পাঁচ মিনিটের মতো রেখে ভালো করে ধুয়ে ফেলুন। সাধারণত শুরুতে সপ্তাহে দুই-তিন বার ব্যবহার করতে বলা হয়; খুশকি কমে গেলে সপ্তাহে একবার চালিয়ে যান, মাঝের দিনগুলোতে সাধারণ মৃদু শ্যাম্পু ব্যবহার করুন। মোড়কের নির্দেশনা মেনে চলুন। একটি শ্যাম্পু কয়েক সপ্তাহ পর কম কাজ করলে অন্য উপাদানের শ্যাম্পুর সঙ্গে পালা করে ব্যবহার করা যায়।
বিজ্ঞাপন
মাথার খুশকি দূর করার ঘরোয়া উপায়
ঘরোয়া উপায় হালকা খুশকিতে সহায়ক হতে পারে, তবে বেশি খুশকিতে ওষুধযুক্ত শ্যাম্পুর বিকল্প নয়। নতুন কিছু লাগানোর আগে কানের পেছনে অল্প পরীক্ষা করে নিন।
১. অ্যালোভেরা জেল: তাজা জেল মাথার ত্বকে লাগিয়ে ২০-৩০ মিনিট পর ধুয়ে ফেলুন। চুলকানি ও প্রদাহে আরাম দেয়।
২. টি ট্রি অয়েল: কিছু গবেষণায় কম ঘনত্বের টি ট্রি অয়েলযুক্ত শ্যাম্পুতে খুশকি কমতে দেখা গেছে। খাঁটি তেল সরাসরি মাথায় লাগাবেন না; শ্যাম্পুর সঙ্গে দুই-এক ফোঁটা মেশানো যায়, তবে জ্বালা করলে বন্ধ করুন।
বিজ্ঞাপন
৩. টক দই: অনেকে টক দই মাথার ত্বকে ১৫-২০ মিনিট রেখে ধুয়ে ফেলেন। এটি ত্বক নরম ও শীতল রাখে; উপকার মৃদু, ভালোভাবে ধুয়ে না ফেললে গন্ধ থাকে।
৪. মেথি ভেজানো পেস্ট: রাতভর ভিজিয়ে রাখা মেথি বেটে মাথায় লাগানো প্রচলিত; চুল নরম করে, খুশকিতে উপকার নিয়ে জোরালো প্রমাণ নেই।
লেবুর রস সরাসরি মাথার ত্বকে ঘষার পরামর্শ বহুল প্রচলিত, কিন্তু চুলকানো ত্বকে এটি জ্বালা বাড়াতে পারে। নারকেল তেল শুষ্কতায় উপকারী, তবে তৈলাক্ত খুশকিতে মাথার ত্বকে ভারী তেল দিলে ছত্রাক বাড়তে পারে; সে ক্ষেত্রে তেল শুধু চুলের দৈর্ঘ্যে দিন। অলিভ অয়েলসহ কিছু তেল মালাসেজিয়ার খাবার হিসেবে কাজ করে বলে খুশকি বাড়াতে পারে।
ছেলেদের খুশকি দূর করার উপায়
বিজ্ঞাপন
ছেলেদের মাথার ত্বকে সাধারণত তেল বেশি তৈরি হয়, আর হেলমেট, টুপি ও রোদে ঘামের কারণে খুশকির প্রবণতাও বেশি। ছোট চুল হওয়ায় ওষুধযুক্ত শ্যাম্পু সরাসরি মাথার ত্বকে লাগানো সহজ, এই সুবিধাটা কাজে লাগান।
ঘামে ভেজা মাথা দীর্ঘক্ষণ হেলমেট বা টুপির নিচে না রেখে সুযোগ পেলে ধুয়ে নিন। হেলমেটের ভেতরের প্যাড ও টুপি নিয়মিত পরিষ্কার করুন। হেয়ার জেল, ওয়াক্স বা পোমেড প্রতিদিন ব্যবহার করলে রাতে ধুয়ে ফেলুন। দাড়ি ও ভুরুতেও খুশকির মতো আঁশ উঠতে পারে; একই খুশকিনাশক শ্যাম্পু দাড়িতে অল্প সময় লাগিয়ে ধোয়া যায়, তবে চোখে যেন না যায়।
যেসব অভ্যাস খুশকি বাড়ায়
খুশকি হলে অনেকে চুল ধোয়া কমিয়ে দেন, ভাবেন শ্যাম্পু খুশকি বাড়ায়। আসলে কম ধুলে তেল ও আঁশ জমে খুশকি আরও বাড়ে। নখ দিয়ে মাথা চুলকানো, ভেজা চুল বেঁধে রাখা, অন্যের চিরুনি-তোয়ালে ব্যবহার এবং প্রতিদিন খুব গরম পানিতে মাথা ধোয়া এড়িয়ে চলুন। সুষম খাবার, পর্যাপ্ত ঘুম আর মানসিক চাপ কমানোও খুশকি নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
বিজ্ঞাপন
একটি সহজ সাপ্তাহিক রুটিন অনেকের কাজে লাগে। সপ্তাহে দুই দিন খুশকিনাশক শ্যাম্পু, মাঝে আরও এক-দুই দিন মৃদু সাধারণ শ্যাম্পু। শ্যাম্পুর পর কন্ডিশনার লাগালে শুধু চুলের দৈর্ঘ্যে দিন, মাথার ত্বকে নয়। গোসলের পর চুল তোয়ালে দিয়ে চেপে শুকিয়ে নিন, ভেজা অবস্থায় বেঁধে ফেলবেন না বা ঘুমাবেন না। বালিশের কভার সপ্তাহে একবার আর চিরুনি সপ্তাহে একবার সাবান পানিতে ধুয়ে নিন। চার সপ্তাহ এই রুটিন মেনে খুশকির পরিমাণ মিলিয়ে দেখুন।
চিনি ও ভাজাপোড়া বেশি খেলে খুশকি বাড়ে বলে অনেকে অভিজ্ঞতার কথা বলেন, যদিও এর পক্ষে জোরালো প্রমাণ নেই। তবে ফল, সবজি, মাছ ও বাদামসমৃদ্ধ সুষম খাবার ত্বকের সার্বিক সুস্থতার জন্য ভালো, তাই খাদ্যাভ্যাস ঠিক রাখা ক্ষতির কিছু নয়।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন
চার থেকে ছয় সপ্তাহ নিয়ম মেনে খুশকিনাশক শ্যাম্পু ব্যবহারের পরও উন্নতি না হলে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ দেখান। মাথার ত্বকে লাল, পুরু, রুপালি আঁশের চাকা থাকলে সোরিয়াসিস হতে পারে। ভুরু, নাকের পাশ, কানের পেছনে আঁশ আর লালচে ভাব ছড়িয়ে পড়লে সেবোরিক ডার্মাটাইটিস হতে পারে। শিশুদের মাথায় গোল গোল চুল ওঠা জায়গায় আঁশ থাকলে তা ছত্রাক সংক্রমণ বা দাদ হতে পারে, যার জন্য মুখে খাওয়ার ওষুধ লাগে। মাথার ত্বকে পুঁজ, ব্যথা বা ঘা হলেও দেরি করবেন না।
বিজ্ঞাপন
সাধারণ জিজ্ঞাসা
খুশকি কি ছোঁয়াচে?
না, সাধারণ খুশকি ছোঁয়াচে নয়। তবে শিশুদের মাথায় দাদের মতো ছত্রাক সংক্রমণ ছড়াতে পারে, তাই চিরুনি ও টুপি আলাদা রাখা ভালো।
খুশকির কারণে কি চুল পড়ে?
বিজ্ঞাপন
খুশকি নিজে সরাসরি টাক তৈরি করে না, তবে চুলকানি, প্রদাহ আর বারবার চুলকানোর কারণে চুল পড়া বাড়তে পারে। খুশকি নিয়ন্ত্রণে এলে এই চুল পড়াও কমে।
শিশুর মাথায় হলদে আঁশ উঠলে কী করব?
নবজাতকের মাথায় হলদে পুরু আঁশ সাধারণত ক্র্যাডল ক্যাপ, যা ক্ষতিকর নয়। হালকা শিশু শ্যাম্পু দিয়ে ধুয়ে নরম ব্রাশে আলতো আঁশ তুলুন; ছড়িয়ে পড়লে বা লাল হয়ে গেলে শিশু বিশেষজ্ঞ দেখান।
খুশকিনাশক শ্যাম্পু কি সারা জীবন ব্যবহার করতে হবে?
বিজ্ঞাপন
খুশকি ফিরে আসার প্রবণতা থাকে বলে অনেকে সপ্তাহে একবার রক্ষণাবেক্ষণ হিসেবে ব্যবহার চালিয়ে যান। খুশকি না থাকলে প্রতিদিন ব্যবহারের দরকার নেই।