রংপুরে শিল্পের বিকাশে অর্থায়ন ও জ্বালানি সংকট
রংপুর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি সভাপতি এমদাদুল হক শিল্পের অগ্রগতিতে আর্থিক ও জ্বালানি সমস্যার বিশদ দেন
রংপুর জেলা প্রতিনিধি · রংপুর
প্রকাশ:
রংপুরে অবকাঠামো উন্নয়ন চলছে, তবে অর্থায়ন ও জ্বালানি সংকট শিল্পের অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত করছে। রংপুর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি সভাপতি এমদাদুল হক এ বিষয়ে আলোকপাত করেছেন। এই সাক্ষাৎকারটি প্রথম আলোর রংপুর প্রতিবেদক আলতাফ হোসেন গ্রহণ করেছেন।
বিজ্ঞাপন
এমদাদুল হক জানান, রংপুরের অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের মূল ভিত্তি কৃষি ও কৃষিনির্ভর বিভিন্ন খাত। ধান, আলু, ভুট্টা, শাকসবজি ও তামাকের উৎপাদন, বিপণন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ এ অঞ্চলের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। নার্সারি ও উদ্যানভিত্তিক ব্যবসারও প্রসার ঘটছে, আর ঐতিহ্যবাহী কুটিরশিল্প ও হস্তশিল্প, বিশেষত শতরঞ্জি, বিদেশেও বাজার পাচ্ছে। চাল, সার, কীটনাশক, পাট, ভোজ্যতেল, কৃষি যন্ত্রপাতি ও তামাকের পাইকারি-খুচরা বাণিজ্য, পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, আবাসন, পরিবহন ও আর্থিক সেবা খাতের বিস্তার স্থানীয় অর্থনীতিকে সচল রাখে।
বর্তমানে রংপুরের যোগাযোগ ব্যবস্থা ও অবকাঠামো উন্নয়নের ধারা চলছে এবং নতুন বিনিয়োগের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে এসব সম্ভাবনা কাজে লাগাতে আরও উদ্যোগ প্রয়োজন, কারণ মূল্যস্ফীতি, ঋণ পাওয়ার সীমাবদ্ধতা এবং অন্যান্য দুর্বলতার কারণে ব্যবসায়ীরা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।
উদ্যোক্তাদের মুখোমুখি প্রধান সমস্যাগুলো প্রথমত অর্থায়নের সংকট। ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদ, কঠিন শর্ত এবং ঋণ বিতরণে জটিলতার কারণে অনেকেই প্রয়োজনীয় তহবিল সংগ্রহে অক্ষম, এবং একই সঙ্গে অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার ধীরগতি বড় বিনিয়োগের সুযোগ ব্যবহারকে কঠিন করে তুলছে। তৃতীয়ত, ১৯৭৮–৮০ সালে প্রতিষ্ঠিত রংপুর বিসিক শিল্পনগরে ড্রেনেজের দুরবস্থা, বর্ষায় জলাবদ্ধতা, নিরাপত্তার ঘাটতি এবং জায়গার সংকট রয়েছে, ফলে দ্বিতীয় বিসিক শিল্পনগরের দাবি দীর্ঘকাল ধরে শোনা যাচ্ছে। চতুর্থত, জ্বালানি ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির ফলে শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা কমছে।
এই সীমাবদ্ধতার ফলে স্থানীয় অনেক প্রতিষ্ঠান পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। আমাদের অনুমান অনুযায়ী, ৫০ থেকে ৫৫ শতাংশ কারখানা আংশিক সক্ষমতায় কাজ করছে, আর ১৫ থেকে ২০ শতাংশ কারখানা বন্ধ বা নিষ্ক্রিয় অবস্থায় রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
রংপুরে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের কিছু শিল্প ইউনিটসহ কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান রয়েছে; এছাড়া অটো রাইস মিল, প্লাস্টিক ও কৃষিপণ্য প্যাকেজিং কারখানা এবং হিমাগারও কার্যকর। ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পের মধ্যে শতরঞ্জি, হস্তশিল্প, বেকারি, আটা-ময়দার মিল ও অ্যালুমিনিয়ামজাত পণ্য উৎপাদন উল্লেখযোগ্য। তবে খেলাপি ঋণ, লোকসান ও ব্যবসায়িক সংকটের কারণে কিছু প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে।
কৃষিপণ্যের পরিমাণ বিশাল হলেও প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়ে গেছে। বর্তমানে অঞ্চলটিতে চালকল, কিছু হিমাগার এবং অল্পসংখ্যক পাটকল রয়েছে।
শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করতে বিনিয়োগকারীদের বিশেষ সুবিধা দরকার, এজন্য আমরা দশ বছরের কর অবকাশ এবং শিল্প, কৃষি ও অবকাঠামো খাতে বিশেষ বরাদ্দের দাবি জানিয়েছি।
রংপুর বিভাগে চারটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা রয়েছে। আমাদের প্রস্তাব হল অগ্রাধিকার অনুসারে অন্তত একটি অঞ্চল দ্রুত প্রস্তুত করে শিল্প প্রতিষ্ঠানের জন্য উন্মুক্ত করা, যাতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও পরিষেবা নিশ্চিত হয়ে বিনিয়োগকারীরা আগ্রহী হন। এই অঞ্চলগুলো কার্যকরভাবে চালু হলে কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, খাদ্যশিল্প, হালকা প্রকৌশল, প্লাস্টিক ও অন্যান্য উৎপাদনশিল্পে বিনিয়োগের সুযোগ বৃদ্ধি পাবে।
বিজ্ঞাপন
নারী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ রংপুরে বাড়ছে; তারা মূলত হস্তশিল্প, শতরঞ্জি, বুটিকস, ই-কমার্স, ক্যাটারিং, রেস্তোরাঁ এবং তথ্যপ্রযুক্তি ও ফ্রিল্যান্সিংয়ের মতো খাতে কাজ করছেন। এসব উদ্যোগ কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এবং নতুন বাজার গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।