কুয়াকাটা ভ্রমণ: সাগরকন্যায় যাওয়ার উপায়, থাকা ও খরচের হিসাব
ট্রাভেল ডেস্ক · পটুয়াখালী
প্রকাশ:
ভোরে পূর্ব দিকের সাগর থেকে সূর্য উঠছে, আবার সন্ধ্যায় একই সৈকতের পশ্চিমে সাগরে ডুবে যাচ্ছে। দেশের খুব কম জায়গায় এই দুই দৃশ্য একসঙ্গে দেখা যায়, আর সে কারণেই পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার কুয়াকাটাকে বলা হয় সাগরকন্যা। প্রায় ১৮ কিলোমিটার লম্বা এই সৈকত কক্সবাজারের মতো জমজমাট নয়, তবে সেটাই এর আকর্ষণ।
বিজ্ঞাপন
পদ্মা সেতু চালুর পর কুয়াকাটা ভ্রমণ অনেক সহজ হয়েছে। ঢাকা থেকে সরাসরি বাসে এখন ছয় থেকে সাত ঘণ্টায় পৌঁছানো যায়। নদীপথ যাঁদের প্রিয়, তাঁরা লঞ্চে পটুয়াখালী বা বরিশাল গিয়ে সেখান থেকে সড়কপথে যেতে পারেন।
কুয়াকাটায় থাকার জন্য সাধারণ আবাসিক হোটেল থেকে শুরু করে ভালো মানের রিসোর্ট, সবই আছে। দুই রাত তিন দিনের একটি সাধারণ ভ্রমণে জনপ্রতি খরচ আনুমানিক ছয় থেকে নয় হাজার টাকা।
ঢাকা থেকে কুয়াকাটা যাওয়ার উপায়
১. বাসে: সায়েদাবাদ, যাত্রাবাড়ী ও গাবতলী এলাকা থেকে কুয়াকাটার সরাসরি এসি ও নন-এসি বাস ছাড়ে। পদ্মা সেতু হয়ে যাওয়া বাসে সাধারণত ছয় থেকে সাত ঘণ্টা লাগে। নন-এসি বাসের ভাড়া আনুমানিক ৭০০ থেকে ৯০০ টাকা, এসি বাসে আনুমানিক ১২০০ থেকে ১৮০০ টাকা।
বিজ্ঞাপন
২. লঞ্চে: ঢাকার সদরঘাট থেকে সন্ধ্যায় পটুয়াখালী ও বরিশালের লঞ্চ ছাড়ে, ভোরে পৌঁছায়। পটুয়াখালী থেকে কুয়াকাটা সড়কপথে দুই ঘণ্টার মতো, বরিশাল থেকে আরও বেশি সময় লাগে। লঞ্চে ডেক, সিঙ্গেল ও ডাবল কেবিন পাওয়া যায়, কেবিনের ভাড়া আনুমানিক ১২০০ থেকে ৩০০০ টাকা। ঈদ বা লম্বা ছুটিতে কেবিন আগে বুক করতে হয়।
৩. উড়োজাহাজ ও সড়কপথ: ঢাকা থেকে বরিশাল পর্যন্ত ফ্লাইট আছে। বরিশাল থেকে বাস বা ভাড়া করা গাড়িতে কুয়াকাটা যেতে তিন ঘণ্টার মতো লাগে।
কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত ও আশপাশে যা দেখবেন
মূল সৈকত ঘিরেই বেশির ভাগ হোটেল আর দোকান। সৈকতের পাশে সারি সারি ঝাউগাছ আর নারকেলবাগান। ভাটার সময় সৈকত অনেকখানি চওড়া হয়ে যায়, তখন হেঁটে বা মোটরসাইকেলে দূরের পয়েন্টগুলোতে যাওয়া যায়।
বিজ্ঞাপন
১. গঙ্গামতির চর: মূল সৈকত থেকে পূর্ব দিকে। সূর্যোদয় দেখার জন্য সবচেয়ে ভালো জায়গা। ভোরে রওনা দিতে হয়, তাই আগের রাতেই মোটরসাইকেল বা ভ্যান ঠিক করে রাখুন।
২. লেবুর চর ও লাল কাঁকড়ার চর: পশ্চিম দিকের এই এলাকাগুলো সূর্যাস্ত দেখার জন্য জনপ্রিয়। নির্জন বালুচরে লাল কাঁকড়ার ছোটাছুটি দেখা যায়, কাছে গেলেই তারা গর্তে লুকিয়ে পড়ে।
৩. ফাতরার চর: নদীর ওপারে ম্যানগ্রোভ বন, অনেকে একে সুন্দরবনের অংশ মনে করেন, যদিও এটি আলাদা বনাঞ্চল। সৈকতের পশ্চিম প্রান্তের ঘাট থেকে ট্রলারে যেতে হয়, জোয়ার-ভাটার সময় মিলিয়ে।
৪. রাখাইন পল্লি ও বৌদ্ধ বিহার: কুয়াকাটার আশপাশে রাখাইন জনগোষ্ঠীর বসবাস। মিশ্রিপাড়ার বৌদ্ধ বিহারে বড় আকারের বুদ্ধমূর্তি আছে। সৈকতের কাছের বৌদ্ধ মন্দিরের পাশেই সেই পুরোনো কুয়া, যার নাম থেকে এলাকার নাম কুয়াকাটা হয়েছে বলে প্রচলিত আছে। রাখাইন নারীদের হাতে বোনা কাপড়ও এখানে কেনা যায়।
বিজ্ঞাপন
৫. কুয়াকাটা জাতীয় উদ্যান ও ঝাউবন: সৈকতের পূর্ব দিকে ঝাউ ও অন্যান্য গাছের বাগান, বিকেলে হাঁটার জন্য ভালো।
৬. শুঁটকিপল্লি ও জেলেপাড়া: শীতের মৌসুমে সৈকতের আশপাশে জেলেরা মাছ শুকিয়ে শুঁটকি তৈরি করেন। ভোরে সাগর থেকে ফেরা মাছ ধরার নৌকা আর ঘাটের ব্যস্ততাও দেখার মতো। এখান থেকে সরাসরি শুঁটকি কেনা যায়, তবে মান দেখে কিনুন।
কুয়াকাটার সৈকত তুলনামূলক সমতল ও চওড়া বলে অনেক জায়গায় হেঁটেই দূর পর্যন্ত যাওয়া যায়। ভোর আর বিকেলের নরম আলোয় ছবি তোলার জন্য সৈকতের দুই প্রান্তই ভালো। ঝাউবনের দিকে সন্ধ্যার পর একা না যাওয়াই নিরাপদ।
থাকা ও খাওয়া
বিজ্ঞাপন
হোটেলগুলো মূলত সৈকতের দিকে যাওয়া প্রধান সড়ক আর তার আশপাশে। সাধারণ মানের হোটেলে প্রতি রাত আনুমানিক ১০০০ থেকে ২৫০০ টাকা, মাঝারি ও ভালো মানের হোটেলে আনুমানিক ৩০০০ থেকে ৬০০০ টাকা বা তার বেশি। সৈকতের একেবারে কাছের হোটেলে ভাড়া কিছুটা বেশি পড়ে, তবে ভোরে সূর্যোদয় দেখতে বেরোনো সহজ হয়।
শীতের ছুটি আর সরকারি লম্বা ছুটিতে কুয়াকাটায় ভিড় বাড়ে, তখন আগে বুক করে যাওয়া ভালো। বছরের বাকি সময়ে অনেক হোটেল ভালো ছাড় দেয়, সরাসরি গিয়ে দর-কষাকষি করেও কক্ষ পাওয়া যায়।
সৈকতের পাশে সন্ধ্যায় সাজিয়ে রাখা মাছের দোকান কুয়াকাটার পরিচিত দৃশ্য। কাঁকড়া, চিংড়ি, কোরাল, টুনা আর নানা সামুদ্রিক মাছ বেছে দিলে সেখানেই ভেজে দেয়। দাম ঠিক করে নিয়ে তবেই অর্ডার দিন। সাধারণ রেস্তোরাঁয় ইলিশসহ নদী ও সাগরের মাছ দিয়ে ভাত পাওয়া যায়, একবেলার খরচ আনুমানিক ২০০ থেকে ৪০০ টাকা। ফেরার সময় অনেকে স্থানীয় শুঁটকি আর রাখাইন তাঁতের কাপড় কিনে আনেন।
কুয়াকাটা ভ্রমণ খরচ: আনুমানিক হিসাব
বিজ্ঞাপন
একজনের জন্য নন-এসি বাসে যাওয়া-আসা আনুমানিক ১৫০০ থেকে ১৮০০ টাকা। দুই রাত সাধারণ হোটেলে কক্ষ ভাগ করে থাকলে নিজের ভাগে আনুমানিক ১৫০০ থেকে ২৫০০ টাকা। তিন দিনের খাবারে আনুমানিক ১৫০০ থেকে ২০০০ টাকা। মোটরসাইকেলে গঙ্গামতি, লেবুর চর ঘোরা আর ফাতরার চরের ট্রলারে আনুমানিক ১৫০০ থেকে ২৫০০ টাকা। সব মিলিয়ে ছয় থেকে নয় হাজার টাকার মধ্যে একটি সাধারণ ভ্রমণ সম্ভব।
মোটরসাইকেলে ঘোরার সময় চালকের সঙ্গে কোন কোন জায়গা দেখাবেন আর মোট ভাড়া কত, তা আগে ঠিক করে নিন।
তিন দিনের নমুনা সূচি
১. প্রথম দিন: রাতের বাসে রওনা দিয়ে সকালে কুয়াকাটা পৌঁছান। হোটেলে উঠে বিশ্রাম নিন, দুপুরের পর মূল সৈকত আর ঝাউবনে হাঁটুন। বিকেলে মোটরসাইকেলে লেবুর চর বা লাল কাঁকড়ার চরে গিয়ে সূর্যাস্ত দেখুন।
বিজ্ঞাপন
২. দ্বিতীয় দিন: ভোরে অন্ধকার থাকতেই গঙ্গামতির চরে রওনা দিন সূর্যোদয় দেখতে। ফিরে নাশতা সেরে জোয়ার-ভাটার সময় মিলিয়ে ট্রলারে ফাতরার চর ঘুরে আসুন। সন্ধ্যায় সৈকতের মাছের দোকানে রাতের খাবার।
৩. তৃতীয় দিন: সকালে রাখাইন পল্লি, মিশ্রিপাড়ার বৌদ্ধ বিহার আর পুরোনো কুয়া দেখে কেনাকাটা সারুন। দুপুরের পর ফিরতি বাস ধরুন, অথবা পটুয়াখালী গিয়ে রাতের লঞ্চে ঢাকা।
সময় কম থাকলে প্রথম ও দ্বিতীয় দিনের কাজ এক দিনে সেরে দুই দিনেও ভ্রমণ শেষ করা যায়, তবে তাতে বিশ্রামের সুযোগ কমে যায়। শিশু বা বয়স্করা সঙ্গে থাকলে ভোরের মোটরসাইকেল যাত্রার বদলে ভ্যান বা অটোরিকশা নিন।
সতর্কতা
বিজ্ঞাপন
কুয়াকাটায় সৈকতের ঢাল কম, তবে জোয়ার-ভাটার সময় পানির টান হঠাৎ বেড়ে যায়। সাঁতার না জানলে গভীরে যাবেন না, সন্ধ্যার পর সাগরে নামবেন না। ভাটার সময় সৈকত ধরে মোটরসাইকেল চলাচল করে, শিশুদের সামলে রাখুন। ঘূর্ণিঝড় বা সতর্কসংকেত থাকলে ভ্রমণ পিছিয়ে দিন। নৌকা বা ট্রলারে উঠলে লাইফ জ্যাকেট নিশ্চিত করুন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
কুয়াকাটা যাওয়ার সবচেয়ে ভালো সময় কখন?
অক্টোবর থেকে মার্চ আবহাওয়া আরামদায়ক, আকাশ পরিষ্কার থাকে বলে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত ভালো দেখা যায়। বর্ষায় সাগর উত্তাল থাকে, তবে খরচ কম পড়ে।
বিজ্ঞাপন
সারা বছর কি সূর্যোদয় আর সূর্যাস্ত দুটোই দেখা যায়?
হ্যাঁ, তবে শীতে সূর্যের অবস্থানের কারণে দৃশ্য সবচেয়ে ভালো মেলে। মেঘলা দিনে দেখা না-ও যেতে পারে।
লঞ্চে না বাসে, কোনটি ভালো?
সময় বাঁচাতে বাস ভালো। নদীপথের অভিজ্ঞতা চাইলে আর শিশু-বয়স্কদের আরামের কথা ভাবলে কেবিনসহ লঞ্চ ভালো বিকল্প।
বিজ্ঞাপন
কুয়াকাটায় কয়দিন থাকা উচিত?
দুই রাত থাকলে সূর্যোদয়, সূর্যাস্ত, ফাতরার চর ও রাখাইন পল্লি আরামে দেখা যায়।