মাথা ব্যথা কমানোর উপায়: ঘরোয়া পদ্ধতি ও কখন সতর্ক হবেন
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ:
কারও মাথা ব্যথা হয় কপাল আর মাথার চারপাশে বেল্টের মতো চাপ ধরে, কারও এক পাশে দপদপ করে, সঙ্গে বমিভাব আর আলো অসহ্য লাগে। কারও আবার সারা দিন না খেয়ে থাকলে বা রোদে ঘুরে এলে মাথা ধরে যায়। মাথা ব্যথা খুবই সাধারণ সমস্যা, আর বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এটি গুরুতর কোনো রোগের লক্ষণ নয়।
বিজ্ঞাপন
মাথা ব্যথা কমানোর উপায় বেছে নিতে হলে আগে বোঝা দরকার ব্যথাটা কোন ধরনের এবং কী থেকে শুরু হলো। পানি পান, বিশ্রাম, সেঁক আর কিছু অভ্যাস বদলে অনেক ব্যথা ওষুধ ছাড়াই কমে। তবে কিছু লক্ষণ আছে যেগুলো দেখা দিলে ঘরোয়া প্রতিকারে সময় নষ্ট করা বিপজ্জনক; সেগুলো আলাদা করে মনে রাখুন।
কোন ধরনের মাথা ব্যথা
১. টেনশন হেডেক: সবচেয়ে প্রচলিত। মাথার দুই পাশে বা কপালে চাপ ধরা, ভারী ভাব, ঘাড় ও কাঁধ শক্ত হয়ে থাকা। মানসিক চাপ, দীর্ঘক্ষণ ঝুঁকে কাজ, ঘুমের অভাব এর কারণ।
২. মাইগ্রেন: সাধারণত মাথার এক পাশে দপদপে ব্যথা, কয়েক ঘণ্টা থেকে দুই-তিন দিন পর্যন্ত থাকতে পারে। বমিভাব, বমি, আলো ও শব্দ অসহ্য লাগা সাধারণ। কারও কারও ব্যথার আগে চোখে আলোর ঝিলিক বা আঁকাবাঁকা রেখা দেখা যায়। নারীদের মধ্যে বেশি, অনেক সময় পরিবারে অন্যদেরও থাকে।
বিজ্ঞাপন
৩. পানিশূন্যতা ও ক্ষুধাজনিত: গরমে ঘাম, কম পানি পান বা দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকলে।
৪. চোখের চাপজনিত: চশমার পাওয়ার বদলে গেলে বা দীর্ঘক্ষণ স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকলে কপাল ও চোখের চারপাশে ব্যথা।
৫. সাইনাসজনিত: ঠান্ডা লাগার পর নাক বন্ধ, কপাল ও গালে চাপ, মাথা নিচু করলে বাড়ে।
৬. চা-কফি ছাড়ার পর: যাঁরা নিয়মিত অনেক চা-কফি খান, হঠাৎ বন্ধ করলে এক-দুই দিন মাথা ব্যথা হতে পারে।
বিজ্ঞাপন
দ্রুত মাথা ব্যথা কমানোর উপায়
১. পানি পান করুন: এক-দুই গ্লাস পানি ধীরে ধীরে খান। পানিশূন্যতাজনিত ব্যথা আধা ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টার মধ্যে কমতে শুরু করে।
২. কিছু খান: দীর্ঘ সময় খালি পেটে থাকলে হালকা কিছু খান, যেমন একটি কলা, বিস্কুট বা মুড়ি।
৩. অন্ধকার ও শান্ত ঘরে বিশ্রাম: মাইগ্রেনে আলো ও শব্দ থেকে দূরে চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকলে আরাম মেলে। অনেকের অল্প ঘুমের পর ব্যথা চলে যায়।
বিজ্ঞাপন
৪. ঠান্ডা বা গরম সেঁক: মাইগ্রেনে কপাল বা ঘাড়ে কাপড়ে মোড়ানো বরফ বা ঠান্ডা পানিতে ভেজানো তোয়ালে ১০-১৫ মিনিট রাখুন। টেনশন হেডেকে ঘাড় ও কাঁধে কুসুম গরম সেঁক বেশি আরাম দেয়।
৫. ঘাড় ও কপাল মালিশ: আঙুলের ডগা দিয়ে কপালের দুই পাশ, মাথার পেছনে খুলির গোড়া আর কাঁধে ছোট ছোট বৃত্তে আলতো চাপ দিন। ঘাড় ধীরে ডানে-বাঁয়ে কাত করে হালকা স্ট্রেচ করুন।
৬. আদা চা: কিছু গবেষণায় মাইগ্রেনে আদার হালকা উপকারের ইঙ্গিত মিলেছে, বিশেষ করে বমিভাব কমাতে। কয়েক টুকরা আদা পানিতে ফুটিয়ে খেতে পারেন।
৭. অল্প চা বা কফি: কারও কারও ক্ষেত্রে এক কাপ চা বা কফি শুরুর দিকের ব্যথা কমাতে সাহায্য করে। তবে প্রতিদিন বেশি খেলে উল্টো ব্যথা বাড়ে।
বিজ্ঞাপন
৮. টাইট কিছু খুলে ফেলুন: শক্ত করে বাঁধা চুল, টাইট হেলমেট, টুপি বা চশমা ব্যথা বাড়াতে পারে।
তীব্র মাথা ব্যথা কমানোর উপায় ও ব্যথানাশক নিয়ে সতর্কতা
তীব্র ব্যথায় অনেকে ফার্মেসি থেকে ব্যথানাশক কিনে খান। মাঝেমধ্যে সাধারণ ব্যথানাশক খাওয়া সমস্যা নয়, তবে মোড়কের নির্দেশনা ও নির্দিষ্ট মাত্রা মেনে চলুন এবং লিভার, কিডনি, আলসার বা অন্য রোগ থাকলে বা গর্ভাবস্থায় আগে চিকিৎসককে জিজ্ঞেস করুন। মাসে অনেক দিন, যেমন সপ্তাহে দুই-তিন দিনের বেশি নিয়মিত ব্যথানাশক খেলে ওষুধজনিত মাথা ব্যথা তৈরি হতে পারে, অর্থাৎ ব্যথা কমানোর ওষুধই তখন ব্যথা চালু রাখে।
ঘন ঘন মাইগ্রেনের রোগীদের জন্য চিকিৎসকেরা আক্রমণের সময়ের ওষুধ আর প্রতিরোধমূলক ওষুধ আলাদা করে দিতে পারেন। নিজে নিজে কড়া ব্যথানাশক বা ঘুমের ওষুধ খাওয়া উচিত নয়।
বিজ্ঞাপন
মাথা ব্যথা কমানোর ঘরোয়া উপায়: প্রতিরোধই আসল
যাঁদের প্রায়ই মাথা ব্যথা হয়, তাঁদের জন্য প্রতিরোধ সবচেয়ে কার্যকর। দুই মাস একটি ছোট ডায়েরি রাখুন: কবে ব্যথা হলো, কতক্ষণ, তার আগে কী খেয়েছিলেন, কত ঘণ্টা ঘুমিয়েছিলেন, মাসিকের সঙ্গে সম্পর্ক আছে কি না। এতে নিজের ট্রিগার চেনা যায়।
প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমানো ও ওঠা, বেলা বাদ না দেওয়া, দিনে পর্যাপ্ত পানি পান, নিয়মিত হাঁটা বা ব্যায়াম মাইগ্রেন ও টেনশন হেডেক দুটোই কমায়। কম্পিউটারে কাজের সময় পর্দা চোখের সমান উচ্চতায় রাখুন, প্রতি ঘণ্টায় একটু উঠে হাঁটুন, ঘাড় ঝুঁকিয়ে দীর্ঘক্ষণ মোবাইল দেখবেন না। অনেক দিন চোখ পরীক্ষা না করালে চশমার পাওয়ার দেখিয়ে নিন। কড়া রোদে ছাতা বা টুপি ব্যবহার করুন। মাইগ্রেনের রোগীদের কারও কারও ক্ষেত্রে কড়া সুগন্ধি, পনির, চকলেট, প্রক্রিয়াজাত মাংস বা না খেয়ে থাকা ব্যথা উসকে দেয়; ডায়েরি দেখে নিজেরটা বুঝে নিন।
কখন জরুরি চিকিৎসা নেবেন
বিজ্ঞাপন
নিচের কোনো লক্ষণ থাকলে দেরি না করে হাসপাতালে যান:
১. হঠাৎ, বজ্রপাতের মতো এক মুহূর্তে শুরু হওয়া জীবনের সবচেয়ে তীব্র মাথা ব্যথা।
২. মাথা ব্যথার সঙ্গে জ্বর, ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া, শরীরে লাল দানা বা বিভ্রান্তি।
৩. মাথায় আঘাতের পর ব্যথা, বমি, ঝিমুনি।
বিজ্ঞাপন
৪. হাত-পা অবশ বা দুর্বল লাগা, কথা জড়িয়ে যাওয়া, মুখ বেঁকে যাওয়া, চোখে ঝাপসা বা দুটো করে দেখা, খিঁচুনি।
৫. গর্ভাবস্থার শেষ দিকে তীব্র মাথা ব্যথা, সঙ্গে চোখে ঝাপসা দেখা বা মুখ-হাত ফোলা; এটি উচ্চ রক্তচাপজনিত জটিলতার লক্ষণ হতে পারে।
এ ছাড়া পঞ্চাশ বছরের পর নতুন ধরনের মাথা ব্যথা শুরু হলে, ব্যথা দিন দিন বাড়তে থাকলে, ঘুম থেকে ব্যথা নিয়ে জেগে উঠলে বা কাশি দিলে ব্যথা তীব্র হলে, কিংবা উচ্চ রক্তচাপের রোগী হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
বিজ্ঞাপন
গ্যাস্ট্রিক থেকে কি মাথা ব্যথা হয়?
দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা বা বদহজমের সঙ্গে মাথা ব্যথা একসঙ্গে হতে পারে, বিশেষ করে মাইগ্রেনে পেটের অস্বস্তিও থাকে। তবে বারবার ব্যথা হলে শুধু গ্যাস্ট্রিক ভেবে বসে না থেকে কারণ খুঁজুন।
উচ্চ রক্তচাপে কি মাথা ব্যথা হয়?
সাধারণ মাত্রার উচ্চ রক্তচাপে বেশির ভাগ সময় কোনো লক্ষণ থাকে না। তবে রক্তচাপ খুব বেশি হলে মাথা ব্যথা হতে পারে। নিয়মিত রক্তচাপ মাপুন।
বিজ্ঞাপন
বাচ্চাদের মাথা ব্যথা হলে কী করব?
পানি, খাবার, বিশ্রাম আর চোখ পরীক্ষার দিকে খেয়াল রাখুন। জ্বর, বমি, আচরণে পরিবর্তন বা বারবার ব্যথা হলে শিশু বিশেষজ্ঞ দেখান।
মাইগ্রেন কি পুরোপুরি সারে?
মাইগ্রেন সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা, তবে ট্রিগার এড়িয়ে চলা ও সঠিক চিকিৎসায় আক্রমণের সংখ্যা ও তীব্রতা অনেকটা কমানো যায়।
বিজ্ঞাপন
মাসিকের সময় মাথা ব্যথা বাড়ে কেন?
হরমোনের ওঠানামার কারণে অনেক নারীর মাসিকের আগে বা শুরুর দিকে মাইগ্রেন বাড়ে। এ সময় ঘুম, খাবার ও পানির নিয়ম আরও কড়াভাবে মানুন। ব্যথা প্রতি মাসে তীব্র হলে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলুন; তিনি প্রতিরোধের জন্য আলাদা পরিকল্পনা দিতে পারেন।