গর্ভাবস্থায় খাবার তালিকা: মা ও শিশুর জন্য কী খাবেন, কী খাবেন না
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ:
গর্ভবতী মাকে দুজনের খাবার খেতে হবে, পরিবারের বড়দের এই পরামর্শ অর্ধেক ঠিক। খাবারের পরিমাণ দ্বিগুণ করার দরকার নেই, কিন্তু পুষ্টির চাহিদা সত্যিই অনেকটা বেড়ে যায়। প্রথম তিন মাসে বাড়তি ক্যালরি প্রায় লাগে না, তবে দ্বিতীয় তিন মাসে দিনে মোটামুটি ৩০০ থেকে ৩৫০ এবং শেষ তিন মাসে প্রায় ৪৫০ ক্যালরি বেশি দরকার হয়। এটা মানে বাড়তি এক বেলা হালকা নাশতা, যেমন এক গ্লাস দুধ আর একটি ডিম, কিংবা দুটি রুটি আর ডাল।
বিজ্ঞাপন
গর্ভাবস্থায় খাবার তালিকার মূল কথা তাই বৈচিত্র্য: প্রতিদিন শর্করা, প্রোটিন, দুধজাতীয় খাবার, শাকসবজি আর ফল। একই সঙ্গে কিছু খাবার এড়িয়ে চলা জরুরি, কারণ সেগুলো সংক্রমণ বা শিশুর ক্ষতির ঝুঁকি বাড়ায়। প্রত্যেক মায়ের শারীরিক অবস্থা আলাদা; ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, থাইরয়েড বা রক্তস্বল্পতা থাকলে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের দেওয়া তালিকাই অনুসরণ করুন।
যে পুষ্টিগুলো এ সময় বেশি দরকার
১. ফলিক অ্যাসিড: শিশুর মস্তিষ্ক ও মেরুদণ্ডের জন্মগত ত্রুটি প্রতিরোধে জরুরি, বিশেষ করে গর্ভধারণের আগে থেকে প্রথম তিন মাস। সবুজ শাক, ডাল, ছোলা, কমলা ও ডিমে পাওয়া যায়, তবে চিকিৎসকেরা সাধারণত সাপ্লিমেন্টও দেন।
২. আয়রন: মায়ের রক্তের পরিমাণ বাড়ে বলে আয়রনের চাহিদাও বাড়ে। আমাদের দেশে গর্ভবতী নারীদের মধ্যে রক্তস্বল্পতা বেশ প্রচলিত। মাছ, মাংস, ডিম, ডাল, কচুশাক, লালশাক, পালংশাক ও কাঁচকলায় আয়রন আছে। সঙ্গে আমলকী, পেয়ারা, লেবু বা টমেটো খেলে আয়রন ভালো শোষিত হয়।
বিজ্ঞাপন
৩. ক্যালসিয়াম: শিশুর হাড় ও দাঁতের জন্য। দুধ, দই, পনির, ছোট মাছ কাঁটাসহ, যেমন মলা-ঢেলা, আর সবুজ শাক ভালো উৎস।
৪. প্রোটিন: শিশুর বৃদ্ধি ও মায়ের শরীরের পরিবর্তনের জন্য প্রতিবেলায় দরকার। মাছ, মুরগি, ডিম, ডাল, দুধ, বাদাম।
৫. আয়োডিন: শিশুর মস্তিষ্ক বিকাশে লাগে। রান্নায় আয়োডিনযুক্ত লবণ ব্যবহার করুন, তবে লবণের পরিমাণ বেশি নয়।
৬. ভিটামিন ডি ও ওমেগা-৩: সকালের রোদ থেকে ভিটামিন ডি, আর সামুদ্রিক মাছ ও দেশি তৈলাক্ত মাছ থেকে উপকারী চর্বি পাওয়া যায়।
বিজ্ঞাপন
আয়রন, ফলিক অ্যাসিড ও ক্যালসিয়ামের বড়ি কখন, কতটা খাবেন, তা চিকিৎসক ঠিক করে দেবেন। আয়রন বড়ি চা বা দুধের সঙ্গে না খেয়ে পানি বা লেবুর শরবতের সঙ্গে খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়; আয়রন আর ক্যালসিয়ামের বড়ি একসঙ্গে না খেয়ে আলাদা সময়ে খান।
গর্ভাবস্থায় কী খাবার খাওয়া উচিত
শর্করা: ভাত, রুটি, চিড়া, ওটস, আলু। সম্ভব হলে লাল আটা বা লাল চাল, তাতে আঁশ বেশি এবং কোষ্ঠকাঠিন্য কম হয়।
প্রোটিন: দিনে অন্তত দুই-তিনবার। একটি ডিম, এক-দুই টুকরা মাছ বা মুরগি, এক বাটি ঘন ডাল।
বিজ্ঞাপন
দুধজাতীয় খাবার: দিনে দুই-তিন পরিবেশন, যেমন এক গ্লাস দুধ, এক বাটি দই। দুধ ভালোভাবে ফুটিয়ে খান।
শাকসবজি: প্রতিবেলায় রঙিন সবজি। গাজর, মিষ্টিকুমড়া, টমেটো, লাউ, পটোল, ঢ্যাঁড়স, শাক।
ফল: দিনে অন্তত দুটি। পাকা কলা, পেয়ারা, কমলা, আপেল, পাকা আম, পাকা পেঁপে, মৌসুমি দেশি ফল।
পানি: দিনে মোটামুটি আট থেকে দশ গ্লাস বা তার বেশি, গরমে আরও বেশি। প্রস্রাবের রং হালকা থাকলে বুঝবেন পানি যথেষ্ট হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
গর্ভাবস্থায় খাবার রুটিন: একটি নমুনা দিন
সকাল: দুটি রুটি, সবজি ভাজি, একটি সেদ্ধ ডিম।
মধ্যসকাল: একটি ফল আর এক গ্লাস দুধ, অথবা দই-চিড়া।
দুপুর: পরিমিত ভাত, ডাল, মাছের তরকারি, শাক, সালাদ।
বিজ্ঞাপন
বিকেল: ছোলা বা বাদাম, একটি ফল, অথবা সবজি দিয়ে সুজি বা খিচুড়ি।
রাত: ভাত বা রুটি, মুরগি বা মাছ, সবজি, ডাল।
ঘুমের আগে: প্রয়োজনে এক গ্লাস দুধ।
বমিভাব থাকলে বড় বেলার বদলে প্রতি দুই-তিন ঘণ্টায় অল্প অল্প খান। সকালে বিছানা ছাড়ার আগে দুটি শুকনো বিস্কুট বা মুড়ি খেলে অনেকের বমিভাব কমে। তেল-মসলা কম রাখুন। বুকজ্বালা হলে খাওয়ার পরপর শোবেন না, রাতের খাবার একটু আগে খান। কোষ্ঠকাঠিন্যে পানি, সবজি, ফল আর ইসবগুলের ভুসি সাহায্য করে; যেকোনো জোলাপ খাওয়ার আগে চিকিৎসককে জিজ্ঞেস করুন।
বিজ্ঞাপন
গর্ভাবস্থায় কী খাবার খাওয়া যাবে না
১. কাঁচা বা আধা সেদ্ধ খাবার: কম সেদ্ধ মাংস, ভেতরে লাল থাকা কাবাব, আধা কাঁচা ডিম বা পোচ, কাঁচা ডিম দিয়ে তৈরি মেয়োনেজ। এগুলোতে সালমোনেলা ও অন্যান্য জীবাণুর ঝুঁকি থাকে। ডিমের কুসুম শক্ত হওয়া পর্যন্ত রান্না করুন।
২. না ফোটানো দুধ ও এমন দুধের তৈরি খাবার: কাঁচা দুধ, অপাস্তুরিত দুধে তৈরি নরম পনির। এতে লিস্টেরিয়ার মতো জীবাণু থাকতে পারে, যা গর্ভের শিশুর জন্য বিপজ্জনক।
৩. কাঁচা ও আধা পাকা পেঁপে: এর কষ জরায়ুর সংকোচন ঘটাতে পারে বলে এড়াতে বলা হয়। পুরো পাকা পেঁপে পরিমিত খাওয়া সাধারণত নিরাপদ ধরা হয়।
বিজ্ঞাপন
৪. পারদ বেশি থাকা বড় সামুদ্রিক মাছ: হাঙর, সোর্ডফিশ বা বড় টুনার মতো মাছ সীমিত বা বাদ দিন। দেশি মাছ ও ছোট সামুদ্রিক মাছ নিরাপদ এবং উপকারী।
৫. কলিজা বেশি পরিমাণে: কলিজায় ভিটামিন এ অনেক বেশি; গর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত ভিটামিন এ শিশুর ক্ষতি করতে পারে। নিয়মিত বা বেশি পরিমাণে খাবেন না।
৬. অতিরিক্ত চা-কফি: দিনে এক-দুই কাপের বেশি নয়। কোমল পানীয় ও এনার্জি ড্রিংকেও ক্যাফেইন থাকে।
৭. তামাক ও মাদক: ধূমপান, পরোক্ষ ধূমপান, জর্দা, সাদাপাতা, গুল সম্পূর্ণ বাদ। এগুলো কম ওজনের শিশু ও অকাল প্রসবের ঝুঁকি বাড়ায়।
বিজ্ঞাপন
৮. অপরিষ্কার খাবার: রাস্তার খোলা খাবার, না ধোয়া সবজি-ফল, বাসি খাবার। ফল-সবজি পরিষ্কার পানিতে ভালো করে ধুয়ে নিন।
চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ভেষজ ওষুধ, কবিরাজি বা হারবাল পানীয় খাবেন না। আনারস বা কলা খেলে গর্ভপাত হয়, এমন অনেক কথা প্রচলিত; স্বাভাবিক পরিমাণে পাকা আনারস খাওয়া সাধারণত সমস্যা নয়, তবে কোনো খাবারে অস্বস্তি হলে তা এড়িয়ে চলুন।
ওজন কতটা বাড়বে, কখন চিকিৎসক
গর্ভধারণের আগে ওজন স্বাভাবিক থাকলে পুরো সময়ে সাধারণত ১১ থেকে ১৬ কেজি ওজন বাড়া স্বাভাবিক ধরা হয়। আগে ওজন কম থাকলে একটু বেশি, আর বেশি থাকলে কম বাড়ানো ভালো। প্রতিবার প্রসবপূর্ব চেকআপে ওজন, রক্তচাপ ও রক্তের হিমোগ্লোবিন দেখিয়ে নিন। গর্ভাবস্থায় অন্তত চারবার, সম্ভব হলে আরও বেশি চেকআপ করানোর পরামর্শ দেওয়া হয়।
বিজ্ঞাপন
এসব লক্ষণে দেরি না করে হাসপাতালে যান: যোনিপথে রক্তপাত বা পানি ভাঙা, তীব্র মাথাব্যথা বা চোখে ঝাপসা দেখা, মুখ-হাত হঠাৎ ফুলে যাওয়া, খিঁচুনি, প্রচণ্ড জ্বর, তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমিতে কিছুই খেতে বা পান করতে না পারা, কিংবা শিশুর নড়াচড়া হঠাৎ কমে যাওয়া।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
গর্ভাবস্থায় কি ঘি বা বেশি তেলে রান্না খাবার বেশি খেতে হয়?
না। অল্প ঘি বা তেল স্বাভাবিক, কিন্তু বেশি খেলে ওজন অতিরিক্ত বাড়ে এবং গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়তে পারে। সুষম খাবারই যথেষ্ট।
বিজ্ঞাপন
গর্ভাবস্থায় কি মিষ্টি খাওয়া যাবে?
পরিমিত খাওয়া যায়, তবে গর্ভকালীন ডায়াবেটিস ধরা পড়লে চিকিৎসকের পরামর্শমতো মিষ্টি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। চিকিৎসক সাধারণত গর্ভাবস্থার একটি নির্দিষ্ট সময়ে রক্তের শর্করা পরীক্ষা করান।
ডাবের পানি কি নিরাপদ?
হ্যাঁ, পরিষ্কার ডাবের পানি নিরাপদ এবং গরমে পানিশূন্যতা কমাতে ভালো। কিডনির রোগ থাকলে চিকিৎসককে জিজ্ঞেস করে নিন।
বিজ্ঞাপন
রোজা রাখা যাবে কি?
এটি মায়ের স্বাস্থ্য ও গর্ভের অবস্থার ওপর নির্ভর করে। রোজা রাখতে চাইলে আগে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলুন; ইসলামে গর্ভবতী নারীর জন্য প্রয়োজনে রোজা পরে আদায়ের সুযোগ আছে।