পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে প্রতিমা ভাসছে, স্থানীয় বাসিন্দা উদ্বেগে
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র উপস্থিত, অমলিন স্মৃতি ও বিদায়ের বেদনা
চট্টগ্রাম জেলা প্রতিনিধি · চট্টগ্রাম
প্রকাশ:
ঢাকের শেষ বোল, শঙ্খধ্বনি এবং চোখের জল মিশে যায় সমুদ্রের গর্জনে, যখন চট্টগ্রামের পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে দেবী দুর্গার প্রতিমা নিরঞ্জন করা হয়। শারদীয় দুর্গোৎসবের শেষ মুহূর্তে আনন্দের রেশ পেরিয়ে হৃদয়ে শুধু বিষাদ আর পরের বছরের অপেক্ষা বেঁচে থাকে।
বিজ্ঞাপন
পতেঙ্গা সৈকতে প্রতিমা নিরঞ্জনের সঙ্গে সঙ্গে শারদীয় দুর্গোৎসবের সমাপ্তি ঘটে, যেখানে ভক্তদের চোখের কোণে জল জমে যায় এবং বুকের ভেতর শূন্যতার অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ে। এক বছরের পূর্ণ উৎসবের পর, সবাই জানে যে আরেক বছর আবার আসবে।
পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে প্রতিমা নিরঞ্জন, দুর্গোৎসবের শেষ দিনের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ, শহরের বিভিন্ন পূজামণ্ডপ থেকে প্রতিমা নিয়ে ভক্তরা সমুদ্রসৈকতে সমবেত হন। একই সঙ্গে অভয়মিত্র ঘাট ও কালুরঘাটে থেকেও বিসর্জন অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়, তবে বিস্তীর্ণ সৈকত, নীল জলরাশি এবং দিগন্তজোড়া আকাশ নিরঞ্জনের মুহূর্তে আলাদা আবহ তৈরি করে।
প্রতিমা নিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে সৈকতের পরিবেশ বদলে যায়; ঢাকের তালে তালে ভক্তরা এগিয়ে চলেন, কেউ ফুল হাতে, কেউ পূজার উপকরণ নিয়ে। কেউ নতজানু হয়ে প্রার্থনা করেন, কেউ শেষবারের মতো প্রতিমার মুখে তাকিয়ে থাকেন, আর সবই একসঙ্গে ভিড় করে আসে মনে।
বিসর্জনের সময় শুধু ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়, ব্যক্তিগত অনুভূতি, পারিবারিক স্মৃতি এবং সমষ্টিগত আবেগও মিশে থাকে। ঢাকের শেষ ছন্দের সঙ্গে যখন প্রতিমা জলের দিকে এগিয়ে যায়, তখন অনেকের চোখে অশ্রু দেখা যায় এবং কণ্ঠে ‘আসছে বছর আবার হবে’ চিৎকার শোনা যায়, যা ভবিষ্যতের আশার প্রতিধ্বনি।
বিজ্ঞাপন
দুর্গোৎসবের সৌন্দর্য শুধুই মণ্ডপের সাজসজ্জা বা শিল্পকলা নয়; এটি নগরের মানুষের মিলন, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং সাংস্কৃতিক সহাবস্থানের প্রতিফলন। বিভিন্ন ধর্মের মানুষ সমুদ্রসৈকতে সমবেত হন, কেউ ধর্মীয় উৎসবের সমাপ্তি হিসেবে, কেউ শিল্প ও ঐতিহ্যের দৃশ্য হিসেবে, আবার কেউ শহরের সাংস্কৃতিক জীবনের পরিচিত একটি অধ্যায় হিসেবে দেখেন।
২০২৬ সালের দুর্গোৎসবের সমাপ্তি উপলক্ষে পতেঙ্গায় আয়োজিত প্রতিমা নিরঞ্জন অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র উপস্থিত ছিলেন। তিনি উৎসবের সম্প্রীতি, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং সহযোগিতার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন, যা অনুষ্ঠানের মূল থিম হয়ে উঠেছে।
এই সম্প্রীতির দৃশ্য উৎসবের আবেগকে আরও গভীর করে, কারণ আনন্দ শুধু ব্যক্তিগত নয়, এটি প্রতিবেশী, বন্ধু, সহকর্মী এবং নগরের অন্যান্য মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। বিসর্জনের দিন বিদায়ের বেদনা ও স্মৃতির একত্রিত রূপ হয়ে থাকে, যা তিক্ততা ও মধুরতা দুটিই বহন করে।
শারদীয় দুর্গোৎসবের শুরুতেই প্রকৃতি নিজস্ব রঙে জানায় যে বিশেষ কিছু আসছে; নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা, মাঠে কাশফুল, ভোরের বাতাসে শিউলির সুবাস—সব মিলিয়ে শরৎকে উৎসবের প্রতীক করে তুলেছে। ষষ্ঠীর আগমনী থেকে দশমীর বিদায় পর্যন্ত দিনগুলো পূজা, অঞ্জলি, নতুন পোশাক, ধূপ-ধুনোর গন্ধ এবং প্রিয়জনদের সঙ্গে দেখা হওয়ার আনন্দে কাটে।
বিজ্ঞাপন
মণ্ডপের আলো, ঢাকের ছন্দ, সিঁদুরের রং কিংবা সন্ধ্যার আরতির মুহূর্তে নতুন স্মৃতি গড়ে ওঠে; যারা সারা বছর ব্যস্ততায় একে অপরের কাছ থেকে দূরে থাকে, তারা এই কয়েক দিনে পুনরায় মিলিত হন। পূজা শৈশবের স্মৃতি, পরিবারের সঙ্গে কাটানো সময় এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলা ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা এখানে একসঙ্গে ফুটে ওঠে।
বিসর্জনের পর মণ্ডপের আলো ধীরে ধীরে নিভে যায় এবং নীরবতা ফিরে আসে; তবে অসংখ্য ছবি, গল্প এবং স্মৃতি মনেই বেঁচে থাকে। প্রতিমা চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উৎসবের আয়োজন গুটিয়ে যায়, কিন্তু সেই মুহূর্তের অনুভূতি মানুষের হৃদয়ে রয়ে যায়।
বিসর্জন কেবল প্রতিমার বিদায় নয়, এটি জীবনের গভীর দর্শনও প্রকাশ করে; আগমন ও প্রস্থান, আনন্দ ও বিষাদ, সৃষ্টি ও বিলীন হওয়া চিরন্তন সত্যের প্রতিফলন। দেবী দুর্গা অশুভ শক্তির বিনাশ এবং শুভ শক্তির জাগরণের প্রতীক, তাঁর বিদায় ভক্তদের মনে নতুন করে দাঁড়িয়ে থাকার দৃঢ়তা জাগায়।
বিসর্জনের বেদনার মাঝে আশার আলো জ্বলে; এটি মানুষকে নতুন উদ্যমে জীবন শুরু করতে এবং আগামী দিনের জন্য অপেক্ষা করতে অনুপ্রাণিত করে। পতেঙ্গার নোনা বাতাসে শুধুমাত্র প্রতিমা নয়, উৎসবের রঙিন দিন, মণ্ডপের আলো এবং একরাশ আবেগের বিদায় নেওয়া হয়।
বিজ্ঞাপন
সমুদ্রের ঢেউ তীরে এসে ফিরে আসে, তেমনি সময়ও থেমে থাকে না। একেকটি উৎসব শেষ হলে অন্যটি শুরু হয়, এবং আগামী শরতে আবার কাশফুল ফুটবে, শিউলি ঝরবে, মণ্ডপে আলো জ্বলে উঠবে এবং ঢাকের শব্দে চারপাশ গুঞ্জরাবে।
দেবী দুর্গার আসন বাঙালির হৃদয়ে অমলিন থাকবে; পতেঙ্গার ঢেউয়ের দিকে তাকিয়ে থাকা চোখ হয়তো একদিন শুকিয়ে যাবে, তবে বুকের ভেতরে বিদায়ের মধুর বেদনা চিরকাল বজায় থাকবে।