ইস্তিখারার নামাজের নিয়ম ও দোয়া: সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুন্নাহ পদ্ধতি
ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশ:
চাকরির দুটি প্রস্তাব হাতে, কোনটি নেবেন বুঝতে পারছেন না। কিংবা বিয়ের একটি সম্বন্ধ এসেছে, সব ঠিকঠাক মনে হলেও মনে খচখচ করছে। ব্যবসায় নতুন বিনিয়োগ, বিদেশে পড়তে যাওয়া, বাড়ি কেনা—জীবনের এমন অনেক মোড়ে মানুষ দোটানায় পড়ে। এসব মুহূর্তের জন্য নবী (সা.) একটি সুন্দর পদ্ধতি শিখিয়ে গেছেন, যার নাম ইস্তিখারা।
বিজ্ঞাপন
ইস্তিখারা শব্দের অর্থ কল্যাণ চাওয়া। পদ্ধতিটি সহজ: দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ে একটি নির্দিষ্ট দোয়া পড়া, যেখানে বান্দা বলে, হে আল্লাহ, আপনি জানেন আমি জানি না; এই কাজটি আমার জন্য ভালো হলে সহজ করে দিন, খারাপ হলে আমাকে এ থেকে সরিয়ে দিন। এরপর আল্লাহর ওপর ভরসা করে সামনে এগোনো।
মনে রাখার মতো কথা হলো, ইস্তিখারা কোনো ভবিষ্যৎ জানার কৌশল নয়। এটি একটি দোয়া, যার মাধ্যমে বান্দা নিজের সীমিত জ্ঞান স্বীকার করে আল্লাহর অসীম জ্ঞানের ওপর সিদ্ধান্তের ভার ছেড়ে দেয়।
হাদিসে ইস্তিখারা
সহিহ বুখারিতে জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) সাহাবিদের সব কাজে ইস্তিখারা শেখাতেন, যেভাবে কোরআনের সূরা শেখাতেন। তিনি বলতেন, তোমাদের কেউ যখন কোনো কাজের ইচ্ছা করে, তখন সে যেন ফরজ ছাড়া দুই রাকাত নামাজ পড়ে, তারপর এই দোয়া পড়ে।
বিজ্ঞাপন
কোরআনের সূরা শেখানোর মতো যত্ন নিয়ে শেখানো—এই তুলনা থেকেই বোঝা যায়, সাহাবিদের জীবনে ইস্তিখারা কতটা স্বাভাবিক অভ্যাস ছিল। শুধু বড় সিদ্ধান্ত নয়, সব কাজে, এ কথাটিও হাদিসে আছে। তবে ফরজ কাজ, যেমন নামাজ পড়া, কিংবা হারাম কাজ, যেমন সুদের কারবার, এসবের জন্য ইস্তিখারা নেই। ইস্তিখারা শুধু বৈধ বিষয়ের মধ্যে কোনটি বেছে নেবেন, কিংবা কখন ও কীভাবে করবেন, সে প্রশ্নে।
ইস্তিখারার নামাজের নিয়ম
১. অজু করে নিন: পবিত্র হয়ে নিরিবিলি জায়গায় কিবলামুখী হোন।
২. নিয়ত: মনে মনে নিয়ত করুন, আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দুই রাকাত ইস্তিখারার নফল নামাজ পড়ছি। আরবি নিয়ত জরুরি নয়।
বিজ্ঞাপন
৩. দুই রাকাত নামাজ: সাধারণ নফল নামাজের মতো দুই রাকাত পড়ুন। প্রতি রাকাতে সূরা ফাতিহার পর যেকোনো সূরা পড়া যায়। কিছু আলেম প্রথম রাকাতে সূরা কাফিরুন আর দ্বিতীয় রাকাতে সূরা ইখলাস পড়া উত্তম বলেছেন, তবে হাদিসে নির্দিষ্ট সূরার কথা নেই।
৪. সালামের পর দোয়া: নামাজ শেষে আল্লাহর প্রশংসা ও দরুদ পড়ে ইস্তিখারার দোয়া পড়ুন। দোয়ায় হাজাল আমরা, অর্থাৎ এই কাজটি অংশে পৌঁছালে মনে মনে নির্দিষ্ট বিষয়টি ভাবুন, কিংবা নাম উল্লেখ করুন। যেমন, এই চাকরিটি বা এই বিয়েটি।
৫. শেষে আবার দরুদ: দোয়া শেষে দরুদ পড়ে নিজের ভাষায় মনের কথা আল্লাহকে বলুন।
ইস্তিখারার জন্য নির্দিষ্ট সময় নেই। নিষিদ্ধ ও মাকরুহ সময় ছাড়া দিনে-রাতে যেকোনো সময় পড়া যায়। অনেকে রাতে ঘুমানোর আগে বা শেষ রাতে তাহাজ্জুদের সঙ্গে পড়েন, কারণ তখন মন বেশি স্থির থাকে।
বিজ্ঞাপন
ইস্তিখারার দোয়া: আরবি, উচ্চারণ ও অর্থ
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْتَخِيرُكَ بِعِلْمِكَ، وَأَسْتَقْدِرُكَ بِقُدْرَتِكَ، وَأَسْأَلُكَ مِنْ فَضْلِكَ الْعَظِيمِ، فَإِنَّكَ تَقْدِرُ وَلَا أَقْدِرُ، وَتَعْلَمُ وَلَا أَعْلَمُ، وَأَنْتَ عَلَّامُ الْغُيُوبِ، اللَّهُمَّ إِنْ كُنْتَ تَعْلَمُ أَنَّ هَذَا الْأَمْرَ خَيْرٌ لِي فِي دِينِي وَمَعَاشِي وَعَاقِبَةِ أَمْرِي فَاقْدُرْهُ لِي وَيَسِّرْهُ لِي ثُمَّ بَارِكْ لِي فِيهِ، وَإِنْ كُنْتَ تَعْلَمُ أَنَّ هَذَا الْأَمْرَ شَرٌّ لِي فِي دِينِي وَمَعَاشِي وَعَاقِبَةِ أَمْرِي فَاصْرِفْهُ عَنِّي وَاصْرِفْنِي عَنْهُ، وَاقْدُرْ لِيَ الْخَيْرَ حَيْثُ كَانَ ثُمَّ أَرْضِنِي بِهِ
বাংলা উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নি আসতাখিরুকা বিইলমিকা, ওয়া আসতাকদিরুকা বিকুদরাতিকা, ওয়া আসআলুকা মিন ফাদলিকাল আজিম। ফাইন্নাকা তাকদিরু ওয়ালা আকদিরু, ওয়া তালামু ওয়ালা আলামু, ওয়া আনতা আল্লামুল গুয়ুব। আল্লাহুম্মা ইন কুনতা তালামু আন্না হাজাল আমরা খাইরুল লি ফি দিনি ওয়া মাআশি ওয়া আকিবাতি আমরি, ফাকদুরহু লি ওয়া ইয়াসসিরহু লি, সুম্মা বারিক লি ফিহি। ওয়া ইন কুনতা তালামু আন্না হাজাল আমরা শাররুল লি ফি দিনি ওয়া মাআশি ওয়া আকিবাতি আমরি, ফাসরিফহু আন্নি ওয়াসরিফনি আনহু, ওয়াকদুর লিয়াল খাইরা হাইসু কানা, সুম্মা আরদিনি বিহি।
অর্থ: হে আল্লাহ, আমি আপনার জ্ঞানের উসিলায় আপনার কাছে কল্যাণ চাইছি, আপনার শক্তির উসিলায় শক্তি চাইছি এবং আপনার মহা অনুগ্রহ প্রার্থনা করছি। কারণ আপনি ক্ষমতা রাখেন, আমি রাখি না; আপনি জানেন, আমি জানি না; আর আপনি সব অদৃশ্য বিষয়ে মহাজ্ঞানী। হে আল্লাহ, আপনার জ্ঞানে যদি এই কাজটি আমার দ্বীন, জীবিকা ও পরিণতির জন্য কল্যাণকর হয়, তবে তা আমার জন্য নির্ধারণ করুন, সহজ করে দিন এবং তাতে বরকত দিন। আর আপনার জ্ঞানে যদি এ কাজটি আমার দ্বীন, জীবিকা ও পরিণতির জন্য অকল্যাণকর হয়, তবে তা আমার থেকে সরিয়ে দিন এবং আমাকেও তা থেকে সরিয়ে রাখুন। আর যেখানেই কল্যাণ থাকুক, তা আমার জন্য নির্ধারণ করুন এবং তাতে আমাকে সন্তুষ্ট রাখুন।
বিজ্ঞাপন
দোয়াটি লম্বা, তাই প্রথম দিকে কাগজ বা বই দেখে পড়া যায়। নামাজের পরে পড়া হয় বলে দেখে পড়তে বাধা নেই। ধীরে ধীরে মুখস্থ করে নিলে ভালো, কারণ জীবনে এটি বারবার প্রয়োজন হবে।
ইস্তিখারার ফল কীভাবে বুঝবেন
সবচেয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা হলো, ইস্তিখারার পর ঘুমিয়ে স্বপ্নে কিছু দেখতে হবে—সবুজ রং মানে হ্যাঁ, লাল রং মানে না। কোরআন-হাদিসে এমন কিছু নেই। স্বপ্ন দেখা যেতে পারে, না-ও দেখা যেতে পারে; ইস্তিখারার ফল তার ওপর নির্ভর করে না।
আলেমরা ফল বোঝার কয়েকটি স্বাভাবিক লক্ষণের কথা বলেছেন। প্রথমত, দোয়ার পর মন কোন দিকে স্থির ও প্রশান্ত হয়। দ্বিতীয়ত, বাস্তবে কাজটির পথ খুলে যায় নাকি বারবার বাধা আসে। যদি কাজটি সহজ হতে থাকে, সামনে এগোন। আর যদি একের পর এক বাধা আসে, সেটিকে আল্লাহর পক্ষ থেকে সরিয়ে দেওয়া হিসেবে মেনে নিন।
বিজ্ঞাপন
দোয়ার শেষ বাক্যটি খেয়াল করুন: যেখানে কল্যাণ, তাতে আমাকে সন্তুষ্ট রাখুন। অর্থাৎ ইস্তিখারার পর ফল যা-ই হোক, সেটিকে আল্লাহর ফয়সালা ভেবে মেনে নেওয়াই এর শিক্ষা। যে কাজ হয়নি, তা নিয়ে আফসোস না করা, আর যা হয়েছে তাতে বরকত খোঁজা।
ইস্তিখারার সঙ্গে পরামর্শ
ইস্তিখারা মানে নিজের বুদ্ধি-বিবেচনা বন্ধ করে বসে থাকা নয়। আলেমরা বলেন, আগে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞ ও বিশ্বস্ত মানুষের পরামর্শ নিন, তথ্য যাচাই করুন, তারপর ইস্তিখারা করুন। কোরআনে আল্লাহ নবী (সা.)-কে কাজে-কর্মে সাহাবিদের সঙ্গে পরামর্শ করতে বলেছেন, তারপর সিদ্ধান্ত নিয়ে আল্লাহর ওপর ভরসা করতে বলেছেন (সূরা আলে ইমরান, আয়াত ১৫৯)। পরামর্শ ও ইস্তিখারা একসঙ্গে চললে সিদ্ধান্ত নিয়ে পরে অনুশোচনা কম হয়।
বিয়ের মতো বিষয়ে পাত্র-পাত্রীর দ্বীনদারি, চরিত্র, পরিবার সম্পর্কে খোঁজখবর নেওয়া জরুরি। চাকরি বা ব্যবসার ক্ষেত্রে শর্ত, ঝুঁকি ও হালাল-হারামের দিক যাচাই করা দরকার। এসব কাজ শেষ করে যখন দুই বা ততোধিক বৈধ পথের মধ্যে দোটানা থাকে, তখনই ইস্তিখারার আসল জায়গা।
বিজ্ঞাপন
যে ভুলগুলো এড়িয়ে চলবেন
১. অন্যকে দিয়ে ইস্তিখারা করানো: আমাদের সমাজে অনেকে কোনো হুজুর বা পীরের কাছে গিয়ে ইস্তিখারা করিয়ে নেন। হাদিসে যে ব্যক্তির কাজ, তাকেই ইস্তিখারা করতে বলা হয়েছে। অন্যরা আপনার জন্য সাধারণ দোয়া করতে পারেন, কিন্তু নিজের ইস্তিখারা নিজে করাই সুন্নত।
২. তাসবিহ গুনে বা কোরআন খুলে ফল নির্ধারণ: তাসবিহের দানা গুনে জোড়-বিজোড় দেখে, কিংবা কোরআনের পাতা খুলে প্রথম আয়াত দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া ইস্তিখারা নয়। এগুলো শরিয়তে প্রমাণিত কোনো পদ্ধতি নয়।
৩. হারাম বিষয়ে ইস্তিখারা: যে কাজ স্পষ্ট হারাম, তার জন্য ইস্তিখারা করা অর্থহীন।
বিজ্ঞাপন
৪. মন আগেই ঠিক করে রাখা: মনে একটি সিদ্ধান্ত পাকা করে শুধু আনুষ্ঠানিকতার জন্য ইস্তিখারা করলে এর প্রকৃত উপকার মেলে না। খোলা মন নিয়ে দোয়া করুন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
ইস্তিখারা কতবার করা যায়?
একবার করে মন স্থির না হলে কয়েক দিন ধরে বারবার করা যায়। সাত দিন পর্যন্ত করার একটি বর্ণনা প্রচলিত আছে, যার সনদ দুর্বল; তবে আলেমরা প্রয়োজনে একাধিকবার করাকে উত্তম বলেছেন।
বিজ্ঞাপন
নামাজ ছাড়া শুধু দোয়া পড়লে কি ইস্তিখারা হবে?
সুন্নত পদ্ধতি হলো দুই রাকাত নামাজের পর দোয়া। কিন্তু নামাজ পড়া সম্ভব না হলে, যেমন নারীদের ঋতুস্রাবের সময়, শুধু দোয়া পড়েও ইস্তিখারা করা যায়।
ইস্তিখারার পর মন যেদিকে টানছে, সেটিই কি চূড়ান্ত?
মনের প্রশান্তি একটি লক্ষণ, কিন্তু একমাত্র লক্ষণ নয়। বাস্তব পরিস্থিতি, পরামর্শ ও কাজের সহজতা মিলিয়ে সিদ্ধান্ত নিন এবং ফলাফল আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিন।
বিজ্ঞাপন
ইস্তিখারা কি শুধু বিয়ের জন্য?
না। হাদিসে সব কাজের কথা বলা হয়েছে। পড়াশোনা, চাকরি, ব্যবসা, সফর, বাসা বদল—যেকোনো বৈধ সিদ্ধান্তে ইস্তিখারা করা যায়।