দোয়া ইউনুস: বাংলা উচ্চারণ, অর্থ, ঘটনা ও পড়ার ফজিলত
ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশ:
লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনাজ জালিমিন—মাত্র কয়েকটি শব্দের এই দোয়াটি বাংলাদেশের মুসলমানদের কাছে দোয়া ইউনুস নামে পরিচিত। বিপদ, অসুখ, ঋণ, মামলা কিংবা মনের ভার—যেকোনো সংকটে মানুষ এই দোয়াটির কাছে ফিরে যায়। এর পেছনে আছে কোরআনে বর্ণিত এক নবীর ঘটনা, আর আছে একটি সহিহ হাদিসের প্রতিশ্রুতি।
বিজ্ঞাপন
দোয়াটি কোরআনের সূরা আম্বিয়ার ৮৭ নম্বর আয়াতের অংশ। নবী ইউনুস (আ.) মাছের পেটের অন্ধকারে আটকে পড়ে এই কথাগুলো বলে আল্লাহকে ডেকেছিলেন। তিরমিজিতে সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেছেন, মাছের পেটে থাকা অবস্থায় জুন্নুন, অর্থাৎ ইউনুস (আ.), যে দোয়া করেছিলেন, কোনো মুসলমান কোনো বিষয়ে সেই দোয়া দিয়ে আল্লাহকে ডাকলে আল্লাহ অবশ্যই তার ডাকে সাড়া দেন।
এই লেখায় দোয়াটির আরবি, উচ্চারণ, অর্থ, ঘটনার পটভূমি এবং খতমে ইউনুস নিয়ে আলেমদের মতামত তুলে ধরা হলো।
দোয়া ইউনুস আরবি, উচ্চারণ ও অর্থ
لَا إِلَٰهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّالِمِينَ
বিজ্ঞাপন
বাংলা উচ্চারণ: লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনাজ জালিমিন।
অর্থ: আপনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, আপনি পবিত্র মহান। নিশ্চয়ই আমি জালিমদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম।
উচ্চারণে দুটি জায়গায় সতর্ক থাকুন। ইল্লা আনতা অংশে আনতা শব্দের তা স্পষ্ট হবে। আর জালিমিন শব্দের প্রথম অক্ষরটি আরবি জোয়া, যা বাংলার জ থেকে আলাদা, মোটা স্বরে উচ্চারিত হয়। কোনো কারির কাছে একবার শুনে নিলে ভুল থাকবে না।
তিন অংশে গভীর অর্থ
বিজ্ঞাপন
এত ছোট দোয়া এত শক্তিশালী কেন, তা বুঝতে এর তিনটি অংশ আলাদা করে দেখা যায়।
১. লা ইলাহা ইল্লা আনতা: আপনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। এটি তাওহিদের ঘোষণা। অন্ধকারে আটকে পড়া মানুষ প্রথমেই স্বীকার করছে, উদ্ধারের ক্ষমতা আর কারও নেই।
২. সুবহানাকা: আপনি পবিত্র। অর্থাৎ আমার ওপর যা এসেছে, তাতে আপনার কোনো অবিচার নেই। আল্লাহকে সব ত্রুটি থেকে মুক্ত ঘোষণা করা।
৩. ইন্নি কুনতু মিনাজ জালিমিন: নিশ্চয়ই আমি জালিমদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম। দোষ নিজের ঘাড়ে নেওয়া, ভুল স্বীকার করা।
বিজ্ঞাপন
দোয়াটিতে সরাসরি কিছু চাওয়া হয়নি। আমাকে বের করুন বা আমাকে বাঁচান, এমন কোনো শব্দ নেই। অথচ আল্লাহ সাড়া দিয়েছেন। আলেমরা বলেন, তাওহিদ, আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা আর নিজের ভুল স্বীকার—এই তিনটি একসঙ্গে থাকলে চাওয়ার কথা আলাদা করে বলার প্রয়োজন পড়ে না।
ইউনুস (আ.)-এর ঘটনা
কোরআনের কয়েকটি সূরায় ঘটনাটি এসেছে। সূরা সাফফাতের ১৩৯ থেকে ১৪৮ নম্বর আয়াতে আছে, ইউনুস (আ.) রাসুলদের একজন ছিলেন। তিনি তাঁর জাতিকে আল্লাহর দিকে ডেকেছিলেন, কিন্তু তারা সাড়া দেয়নি। আল্লাহর নির্দেশ আসার আগেই তিনি অভিমান করে জাতিকে ছেড়ে চলে যান এবং একটি বোঝাই নৌকায় ওঠেন।
নৌকা বিপদে পড়লে লটারি করে একজনকে নামিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়, আর লটারিতে তাঁর নাম ওঠে। তাঁকে সমুদ্রে ফেলে দেওয়া হলে একটি বিশাল মাছ তাঁকে গিলে ফেলে। সূরা আম্বিয়ায় বলা হয়েছে, তিনি অন্ধকারের মধ্যে আল্লাহকে ডাকলেন। মুফাসসিররা এই অন্ধকারের ব্যাখ্যায় রাতের অন্ধকার, সমুদ্রের অন্ধকার ও মাছের পেটের অন্ধকারের কথা বলেছেন।
বিজ্ঞাপন
সূরা সাফফাতে আল্লাহ বলেছেন, তিনি যদি আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণাকারীদের অন্তর্ভুক্ত না হতেন, তবে পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত মাছের পেটেই থেকে যেতেন। এরপর আল্লাহ তাঁকে অসুস্থ অবস্থায় এক খোলা প্রান্তরে নিক্ষেপ করেন এবং তাঁর ওপর একটি লাউজাতীয় গাছ জন্মিয়ে দেন। পরে তিনি আবার তাঁর জাতির কাছে প্রেরিত হন, যাদের সংখ্যা ছিল এক লাখ বা তার বেশি, এবং এবার তারা ইমান আনে। সূরা ইউনুসের ৯৮ নম্বর আয়াতেও এই জাতির ইমান আনার কথা আছে।
সূরা আম্বিয়ার ৮৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন:
অতঃপর আমি তার ডাকে সাড়া দিলাম এবং তাকে দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি দিলাম। আর এভাবেই আমি মুমিনদের মুক্তি দিয়ে থাকি। (সূরা আম্বিয়া, আয়াত ৮৮)
শেষ বাক্যটিই আমাদের জন্য আশার বার্তা। এভাবেই আমি মুমিনদের মুক্তি দিই—অর্থাৎ এই সাড়া শুধু ইউনুস (আ.)-এর জন্য নয়।
বিজ্ঞাপন
দোয়া ইউনুস কেন পড়ে, কখন পড়বেন
মানুষ দোয়া ইউনুস পড়ে মূলত তিন কারণে: বিপদ থেকে মুক্তির জন্য, গুনাহ থেকে তওবার জন্য এবং দুশ্চিন্তা থেকে প্রশান্তির জন্য। এর জন্য নির্দিষ্ট সময় বা সংখ্যা হাদিসে বাঁধা নেই। যেকোনো সময়, অজু থাকুক বা না থাকুক, শুয়ে-বসে-দাঁড়িয়ে পড়া যায়।
তবে কিছু সময় দোয়ার জন্য বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ, যেমন শেষ রাত, সিজদা, ফরজ নামাজের পর, আজান ও ইকামতের মাঝখান, জুমার দিনের শেষ ভাগ ও ইফতারের সময়। এসব সময়ে দোয়া ইউনুস পড়ে তারপর নিজের প্রয়োজনের কথা আল্লাহকে বলতে পারেন।
হানাফি মাজহাবে নামাজের সিজদায় কোরআনের আয়াত তেলাওয়াতের নিয়তে পড়া মাকরুহ, তবে দোয়ার নিয়তে কোরআনের দোয়া পড়ার অবকাশ আছে বলে অনেক আলেম বলেছেন; নফল নামাজে এ সুযোগ বেশি। ফরজ নামাজে সিজদার মাসনুন তাসবিহে সীমাবদ্ধ থাকাই নিরাপদ।
বিজ্ঞাপন
খতমে ইউনুস: আলেমরা যা বলেন
আমাদের দেশে বিপদ-আপদে কয়েকজন মিলে দোয়া ইউনুস সোয়া লাখবার পড়ার একটি রীতি আছে, যাকে খতমে ইউনুস বলা হয়। এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ আছে, তাই বিষয়টি পরিষ্কার জানা দরকার।
প্রথমত, সোয়া লাখ বা অন্য কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যার কথা কোরআন বা হাদিসে নেই। দোয়া ইউনুস যত বেশি পড়া হয়, ততই উত্তম, এটুকু নিশ্চিত। দ্বিতীয়ত, কিছু আলেম একে পূর্ববর্তী বুজুর্গদের অভিজ্ঞতালব্ধ আমল হিসেবে দেখেন এবং বলেন, সুন্নত বা জরুরি মনে না করে, কোনো বিনিময় বা ভোজের শর্ত ছাড়া কেউ একা বা কয়েকজন মিলে পড়লে তা জায়েজ। তৃতীয়ত, অনেক আলেম একে প্রচলিত রীতি হিসেবে নিরুৎসাহিত করেন, বিশেষত যখন একে বাধ্যতামূলক মনে করা হয়, টাকা দিয়ে লোক ভাড়া করে পড়ানো হয়, কিংবা নির্দিষ্ট সংখ্যার মধ্যে বিশেষ ক্ষমতা আছে বলে বিশ্বাস করা হয়।
সবার জন্য নিরাপদ পথ হলো, নিজে আন্তরিকতার সঙ্গে নিয়মিত দোয়া ইউনুস পড়া, পরিবারের সবাইকে নিয়ে দোয়া করা এবং সংখ্যার চেয়ে মনোযোগকে বড় করে দেখা।
বিজ্ঞাপন
সাধারণ জিজ্ঞাসা
দোয়া ইউনুস কতবার পড়তে হয়?
নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা হাদিসে নেই। একবার আন্তরিকভাবে পড়লেও হাদিসের প্রতিশ্রুতি প্রযোজ্য। অনেকে প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সংখ্যা ঠিক করে পড়েন, এটি নিজের অভ্যাস গড়ার জন্য ঠিক আছে।
অজু ছাড়া কি দোয়া ইউনুস পড়া যায়?
বিজ্ঞাপন
যায়। মুখস্থ জিকির ও দোয়ার জন্য অজু শর্ত নয়। তবে অজু অবস্থায় পড়া উত্তম। ঋতুস্রাবের সময়ও নারীরা দোয়ার নিয়তে এটি পড়তে পারেন।
দোয়া ইউনুস কি শুধু বিপদেই পড়তে হয়?
না। এটি তওবা, ইস্তিগফার ও আল্লাহর প্রশংসার দোয়া। সুখের দিনেও পড়া যায়, যাতে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক শুধু বিপদের সময়ের না হয়।
ঋণমুক্তি, চাকরি বা সন্তান লাভের জন্য কি দোয়া ইউনুস পড়া যায়?
বিজ্ঞাপন
যায়। হাদিসে বলা হয়েছে, কোনো বিষয়ে এ দোয়া দিয়ে ডাকলে আল্লাহ সাড়া দেন; এখানে বিষয়ের কোনো সীমা টানা হয়নি। দোয়া ইউনুস পড়ার পর নিজের নির্দিষ্ট প্রয়োজনের কথা নিজের ভাষায় আল্লাহকে বলুন, সঙ্গে বাস্তব চেষ্টাও চালিয়ে যান।