বিপদের দোয়া: বিপদ-আপদ ও দুঃসময়ে পড়ার মাসনুন দোয়াগুলো
ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশ:
হঠাৎ দুঃসংবাদ, প্রিয়জনের অসুখ, চাকরি হারানো, মামলা-মোকদ্দমা কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগ—বিপদ আসে নানা চেহারায়। এমন মুহূর্তে মুমিনের প্রথম বাক্য হওয়া উচিত ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন, অর্থাৎ আমরা আল্লাহরই এবং তাঁর কাছেই ফিরে যাব। তারপর নবী (সা.)-এর শেখানো কয়েকটি দোয়া, যেগুলো সহিহ হাদিসে বর্ণিত এবং বিপদের সময় পড়ার জন্যই শেখানো হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
এই লেখায় এমন ছয়টি দোয়া আরবি, বাংলা উচ্চারণ ও অর্থসহ দেওয়া হলো, প্রতিটির উৎস উল্লেখ করে। কোনোটি মুসিবতে ধৈর্যের জন্য, কোনোটি দুশ্চিন্তা দূর করার জন্য, কোনোটি শত্রু বা ভয়ের মোকাবিলায়, আর কোনোটি বিপদ থেকে আগাম সুরক্ষার জন্য।
একটি কথা শুরুতেই বলা দরকার। দোয়া মানে হাত গুটিয়ে বসে থাকা নয়। অসুখে চিকিৎসা, আইনি সমস্যায় আইনি সহায়তা, আর্থিক সংকটে পরিকল্পনা—এগুলো করতে হবে, সঙ্গে দোয়া। তিরমিজির এক হাদিসে নবী (সা.) এক সাহাবিকে বলেছিলেন, আগে উট বাঁধো, তারপর আল্লাহর ওপর ভরসা করো।
মুসিবতের মুহূর্তে: ইন্না লিল্লাহ
কোরআনে সূরা বাকারার ১৫৫ থেকে ১৫৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, তিনি ভয়, ক্ষুধা, সম্পদ, প্রাণ ও ফসলের ক্ষতি দিয়ে মানুষকে পরীক্ষা করবেন। আর সুসংবাদ দিয়েছেন সেই ধৈর্যশীলদের, যারা বিপদে পড়লে বলে:
বিজ্ঞাপন
إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ
উচ্চারণ: ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। অর্থ: নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্য এবং নিশ্চয়ই আমরা তাঁর দিকেই প্রত্যাবর্তনকারী। (সূরা বাকারা, আয়াত ১৫৬)
মুসলিম শরিফে উম্মে সালামা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেছেন, কোনো মুসলমানের ওপর বিপদ এলে সে যদি ইন্না লিল্লাহ পড়ার পর এই দোয়াটি পড়ে, আল্লাহ তাকে এর চেয়ে উত্তম কিছু দান করেন:
اللَّهُمَّ أْجُرْنِي فِي مُصِيبَتِي وَأَخْلِفْ لِي خَيْرًا مِنْهَا
বিজ্ঞাপন
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা জুরনি ফি মুসিবাতি ওয়া আখলিফ লি খাইরাম মিনহা। অর্থ: হে আল্লাহ, আমার এই বিপদে আমাকে প্রতিদান দিন এবং এর বদলে আমাকে এর চেয়ে উত্তম কিছু দান করুন। উম্মে সালামা (রা.) স্বামী আবু সালামার মৃত্যুর পর এই দোয়া পড়েছিলেন, আর পরে নবী (সা.)-এর সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়।
কঠিন দুশ্চিন্তায়: আরশের রবের দোয়া
বুখারি ও মুসলিমে ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) কঠিন অস্থিরতা ও দুশ্চিন্তার সময় এই দোয়া পড়তেন:
لَا إِلَٰهَ إِلَّا اللَّهُ الْعَظِيمُ الْحَلِيمُ، لَا إِلَٰهَ إِلَّا اللَّهُ رَبُّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ، لَا إِلَٰهَ إِلَّا اللَّهُ رَبُّ السَّمَاوَاتِ وَرَبُّ الْأَرْضِ وَرَبُّ الْعَرْشِ الْكَرِيمِ
বিজ্ঞাপন
উচ্চারণ: লা ইলাহা ইল্লাল্লাহুল আজিমুল হালিম, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু রাব্বুল আরশিল আজিম, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু রাব্বুস সামাওয়াতি ওয়া রাব্বুল আরদি ওয়া রাব্বুল আরশিল কারিম।
অর্থ: মহান ও সহনশীল আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। মহান আরশের রব আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। আসমানসমূহের রব, জমিনের রব ও সম্মানিত আরশের রব আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই।
লক্ষ করুন, এখানে কিছু চাওয়া হয়নি, শুধু আল্লাহর বড়ত্ব ঘোষণা করা হয়েছে। বিপদ যত বড়ই মনে হোক, আরশের রবের সামনে তা ছোট—এই উপলব্ধিই মনকে শান্ত করে।
অন্ধকারে আটকে গেলে: দোয়া ইউনুস
বিজ্ঞাপন
মাছের পেটের অন্ধকারে ইউনুস (আ.) যে দোয়া পড়েছিলেন:
لَا إِلَٰهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّالِمِينَ
উচ্চারণ: লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনাজ জালিমিন। অর্থ: আপনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, আপনি পবিত্র; নিশ্চয়ই আমি জালিমদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম। (সূরা আম্বিয়া, আয়াত ৮৭)
তিরমিজিতে সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) থেকে বর্ণিত, কোনো মুসলমান কোনো বিষয়ে এই দোয়া দিয়ে আল্লাহকে ডাকলে আল্লাহ তার ডাকে সাড়া দেন। কোরআনে এর পরের আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, আমি তাকে দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি দিলাম, আর এভাবেই মুমিনদের মুক্তি দিই।
বিজ্ঞাপন
ভয় ও শত্রুর মোকাবিলায়: হাসবুনাল্লাহ
حَسْبُنَا اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ
উচ্চারণ: হাসবুনাল্লাহু ওয়া নিমাল ওয়াকিল। অর্থ: আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট, আর তিনি কতই না উত্তম কর্মবিধায়ক। (সূরা আলে ইমরান, আয়াত ১৭৩)
বুখারিতে ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, ইব্রাহিম (আ.)-কে যখন আগুনে নিক্ষেপ করা হয়, তখন তিনি এই বাক্য বলেছিলেন। আর মুহাম্মদ (সা.)-কে যখন বলা হলো, শত্রুরা তোমাদের বিরুদ্ধে বিশাল বাহিনী জড়ো করেছে, তখন তিনিও এটিই বলেছিলেন। কেউ অন্যায়ভাবে ক্ষতি করতে চাইলে, কিংবা ভয়ে বুক কাঁপলে এই ছোট বাক্যটি বারবার পড়ুন।
বিজ্ঞাপন
রহমতের আশ্রয়: ইয়া হাইয়ু ইয়া কাইয়ুম
তিরমিজিতে আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, কোনো বিষয় নবী (সা.)-কে খুব পীড়া দিলে তিনি বলতেন:
يَا حَيُّ يَا قَيُّومُ بِرَحْمَتِكَ أَسْتَغِيثُ
উচ্চারণ: ইয়া হাইয়ু ইয়া কাইয়ুমু বিরাহমাতিকা আসতাগিস। অর্থ: হে চিরঞ্জীব, হে চিরস্থায়ী সত্তা, আপনার রহমতের কাছেই আমি সাহায্য চাই।
বিজ্ঞাপন
এর পাশাপাশি বিপদ থেকে আগাম সুরক্ষার জন্য একটি দোয়া সকাল-সন্ধ্যা তিনবার পড়ার কথা আবু দাউদ ও তিরমিজিতে উসমান (রা.) থেকে বর্ণিত। হাদিসে আছে, যে এটি পড়ে, কোনো কিছু তার ক্ষতি করতে পারে না:
بِسْمِ اللَّهِ الَّذِي لَا يَضُرُّ مَعَ اسْمِهِ شَيْءٌ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي السَّمَاءِ وَهُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ
উচ্চারণ: বিসমিল্লাহিল্লাজি লা ইয়াদুররু মাআসমিহি শাইউন ফিল আরদি ওয়ালা ফিস সামায়ি ওয়া হুয়াস সামিউল আলিম। অর্থ: সেই আল্লাহর নামে, যাঁর নামের সঙ্গে জমিন ও আসমানের কোনো কিছুই ক্ষতি করতে পারে না; তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।
দোয়ার সঙ্গে যে আমলগুলো দরকার
বিজ্ঞাপন
বিপদে নামাজের দিকে ফেরা নবী (সা.)-এর অভ্যাস ছিল। আবু দাউদে হুজাইফা (রা.) বলেছেন, কোনো বিষয় নবী (সা.)-কে চিন্তিত করলে তিনি নামাজে দাঁড়িয়ে যেতেন। তাই অজু করে দুই রাকাত নফল পড়ে সিজদায় মনের কথা বলুন, তারপর সালাম ফিরিয়ে নিজের ভাষায় দোয়া করুন।
ইস্তিগফার বাড়ান, সামর্থ্য অনুযায়ী দান করুন, আত্মীয়দের সঙ্গে সম্পর্ক ঠিক রাখুন। নিজে বিপদে থাকলেও আশপাশে যে আরও বড় বিপদে আছে, তার পাশে দাঁড়ান। মুসলিম শরিফের হাদিসে আছে, যে কোনো মুমিনের দুনিয়ার একটি কষ্ট দূর করে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার একটি কষ্ট দূর করবেন; আর বান্দা যতক্ষণ তার ভাইয়ের সাহায্যে থাকে, আল্লাহ ততক্ষণ বান্দার সাহায্যে থাকেন। আর ধৈর্য ধরুন; কোরআন বারবার বলেছে, কষ্টের সঙ্গেই স্বস্তি আছে (সূরা ইনশিরাহ, আয়াত ৫-৬)। বিপদের সময় এমন কোনো তাবিজ, কবিরাজি বা অদ্ভুত আমলের পেছনে ছুটবেন না, যার ভিত্তি কোরআন-হাদিসে নেই।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
বিপদের দোয়া কতবার পড়তে হয়?
বিজ্ঞাপন
বেশির ভাগ দোয়ার নির্দিষ্ট সংখ্যা হাদিসে নেই। যতবার মন চায়, আন্তরিকতার সঙ্গে পড়ুন। শুধু বিসমিল্লাহিল্লাজি দোয়াটি সকাল-সন্ধ্যা তিনবার পড়ার কথা এসেছে।
অসুস্থ মানুষের জন্য কোন দোয়া পড়ব?
বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত দোয়া: আজহিবিল বাস, রাব্বান নাস, ওয়াশফি আনতাশ শাফি, লা শিফাআ ইল্লা শিফাউক, শিফাআন লা ইউগাদিরু সাকামা। অর্থ: হে মানুষের রব, কষ্ট দূর করুন, আরোগ্য দিন; আপনিই আরোগ্যদাতা, আপনার আরোগ্য ছাড়া কোনো আরোগ্য নেই, এমন আরোগ্য দিন যা কোনো রোগ বাকি রাখে না। সঙ্গে চিকিৎসাও চালিয়ে যান।
বিপদের সময় দোয়া কবুল হচ্ছে না মনে হলে কী করব?
বিজ্ঞাপন
হতাশ হবেন না। হাদিসে আছে, দোয়া কখনো সঙ্গে সঙ্গে কবুল হয়, কখনো তার বদলে কোনো বিপদ সরিয়ে দেওয়া হয়, আবার কখনো আখেরাতের জন্য জমা রাখা হয়। দোয়া চালিয়ে যান।
ঋতুস্রাবের সময় কি এসব দোয়া পড়া যায়?
যায়। এই অবস্থায় নামাজ ও কোরআন তেলাওয়াত নিষেধ, কিন্তু দোয়া ও জিকির নিষেধ নয়। কোরআনের আয়াতগুলো তেলাওয়াতের নিয়তে নয়, দোয়ার নিয়তে পড়বেন।
পরিবারের কারও বিপদে আমি কি তার হয়ে দোয়া করতে পারি?
বিজ্ঞাপন
অবশ্যই। অন্যের অনুপস্থিতিতে তার জন্য করা দোয়ার বিশেষ মর্যাদার কথা মুসলিম শরিফে আছে; সেখানে বলা হয়েছে, ফেরেশতারা বলেন, তোমার জন্যও অনুরূপ হোক।