রিজিক বৃদ্ধির দোয়া ও আমল: কোরআন-হাদিসে বর্ণিত উপায়গুলো
ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশ:
রিজিক বলতে আমরা সাধারণত টাকাপয়সা বুঝি। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে রিজিক অনেক বড় ধারণা: স্বাস্থ্য, জ্ঞান, সময়, ভালো সন্তান, মনের শান্তি, এমনকি একটি ভালো বন্ধুও রিজিক। আর রিজিক বৃদ্ধি মানে শুধু আয়ের অঙ্ক বাড়া নয়, যা আছে তাতে বরকত আসা। অনেকের আয় কম, কিন্তু সংসার চলে স্বচ্ছন্দে; আবার অনেকের আয় বেশি, অথচ মাস শেষে টানাটানি।
বিজ্ঞাপন
কোরআন ও সহিহ হাদিসে রিজিক বৃদ্ধি ও বরকতের জন্য কিছু আমল এবং কিছু দোয়ার কথা এসেছে। আমলগুলোর মধ্যে আছে তাকওয়া, ইস্তিগফার, কৃতজ্ঞতা, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা, দান-সদকা, আল্লাহর ওপর ভরসা এবং হালাল পথে পরিশ্রম। দোয়াগুলোর মধ্যে আছে রিজকান তাইয়িবান বা পবিত্র রিজিক চাওয়া এবং হালাল দিয়ে হারাম থেকে বেঁচে থাকার প্রার্থনা।
এই লেখায় সেগুলো উৎসসহ তুলে ধরা হলো। সঙ্গে এমন কিছু প্রচলিত ধারণার কথাও বলা হলো, যেগুলোর ভিত্তি দুর্বল।
কোরআনে রিজিকের প্রতিশ্রুতি
রিজিক নিয়ে কোরআনের সবচেয়ে পরিচিত আয়াতগুলোর একটি সূরা তালাকে:
বিজ্ঞাপন
আর যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ বের করে দেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিজিক দেন, যা সে কল্পনাও করে না। আর যে আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তার জন্য তিনিই যথেষ্ট। (সূরা তালাক, আয়াত ২-৩)
সূরা নুহে নুহ (আ.) তাঁর জাতিকে বলেছিলেন, তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা চাও, তিনি তো মহাক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের ওপর মুষলধারে বৃষ্টি বর্ষণ করবেন, তোমাদের ধনসম্পদ ও সন্তান দিয়ে সাহায্য করবেন এবং তোমাদের জন্য বাগান ও নদী দেবেন (সূরা নুহ, আয়াত ১০-১২)। আর সূরা ইব্রাহিমের ৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, তোমরা কৃতজ্ঞ হলে আমি অবশ্যই তোমাদের আরও বাড়িয়ে দেব।
এই তিনটি আয়াত থেকে তিনটি আমল স্পষ্ট: তাকওয়া, ইস্তিগফার ও শোকর।
হাদিসে বর্ণিত রিজিক বৃদ্ধির আমল
বিজ্ঞাপন
১. আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা: বুখারি ও মুসলিমে আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, যে চায় তার রিজিক প্রশস্ত হোক এবং আয়ু বৃদ্ধি পাক, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করে। গরিব আত্মীয়ের খোঁজ নেওয়া, ভাইবোনের সঙ্গে বিরোধ মিটিয়ে ফেলা, মা-বাবার সেবা—এগুলো রিজিকের দরজা খোলে।
২. আল্লাহর ওপর যথাযথ ভরসা: তিরমিজিতে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তোমরা যদি আল্লাহর ওপর যথাযথ ভরসা করতে, তবে তিনি তোমাদের পাখির মতো রিজিক দিতেন; পাখি সকালে খালি পেটে বের হয় আর সন্ধ্যায় ভরা পেটে ফেরে। খেয়াল করুন, পাখিও কিন্তু বাসায় বসে থাকে না, বের হয়।
৩. দান-সদকা: মুসলিম শরিফে আছে, সদকা সম্পদ কমায় না। হিসাবের খাতায় টাকা কমে, কিন্তু বরকত বাড়ে।
৪. হজ ও ওমরাহ: তিরমিজি ও নাসায়িতে বর্ণিত, তোমরা হজ ও ওমরাহ পরপর আদায় করো, কারণ এ দুটি দারিদ্র্য ও গুনাহ দূর করে, যেভাবে হাপর লোহার ময়লা দূর করে। এটি সামর্থ্যবানদের জন্য।
বিজ্ঞাপন
৫. সকালের সময়ে কাজ শুরু: আবু দাউদ ও তিরমিজিতে বর্ণিত, নবী (সা.) দোয়া করেছেন, হে আল্লাহ, আমার উম্মতের জন্য দিনের প্রথম ভাগে বরকত দিন। ফজরের পর ঘুমিয়ে না থেকে দিনের কাজ শুরু করা এ বরকত পাওয়ার উপায়।
৬. দুর্বলদের প্রতি সদয় হওয়া: বুখারিতে বর্ণিত, তোমাদের মধ্যে যারা দুর্বল, তাদের উসিলায়ই তোমাদের সাহায্য করা হয় ও রিজিক দেওয়া হয়। অধীন কর্মচারী, গৃহকর্মী, বৃদ্ধ মা-বাবার প্রতি আচরণ তাই রিজিকের সঙ্গে জড়িত।
রিজিক বৃদ্ধির মাসনুন দোয়া
ফজরের পর পবিত্র রিজিক চাওয়ার দোয়া: ইবনে মাজাহতে উম্মে সালামা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) ফজরের নামাজের সালাম ফিরিয়ে বলতেন:
বিজ্ঞাপন
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ عِلْمًا نَافِعًا، وَرِزْقًا طَيِّبًا، وَعَمَلًا مُتَقَبَّلًا
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকা ইলমান নাফিআ, ওয়া রিজকান তাইয়িবা, ওয়া আমালাম মুতাকাব্বালা। অর্থ: হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে উপকারী জ্ঞান, পবিত্র রিজিক এবং কবুলযোগ্য আমল চাই।
অভাব দূর করার দোয়া: তিরমিজিতে আলি (রা.) থেকে বর্ণিত, ঋণের বোঝায় জর্জরিত এক ব্যক্তিকে তিনি এই দোয়া শিখিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন, পাহাড় পরিমাণ ঋণ থাকলেও আল্লাহ তা পরিশোধের ব্যবস্থা করে দেবেন:
اللَّهُمَّ اكْفِنِي بِحَلَالِكَ عَنْ حَرَامِكَ، وَأَغْنِنِي بِفَضْلِكَ عَمَّنْ سِوَاكَ
বিজ্ঞাপন
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মাকফিনি বিহালালিকা আন হারামিকা, ওয়া আগনিনি বিফাদলিকা আম্মান সিওয়াক। অর্থ: হে আল্লাহ, আপনার হালাল দিয়ে আমাকে আপনার হারাম থেকে যথেষ্ট রাখুন, আর আপনার অনুগ্রহ দিয়ে আমাকে আপনি ছাড়া অন্য সবার থেকে অমুখাপেক্ষী করুন।
মুসা (আ.)-এর দোয়া: মাদইয়ানে নিঃস্ব অবস্থায় এক গাছের ছায়ায় বসে মুসা (আ.) বলেছিলেন:
رَبِّ إِنِّي لِمَا أَنْزَلْتَ إِلَيَّ مِنْ خَيْرٍ فَقِيرٌ
উচ্চারণ: রাব্বি ইন্নি লিমা আনজালতা ইলাইয়া মিন খাইরিন ফাকির। অর্থ: হে আমার রব, আপনি আমার প্রতি যে কল্যাণই নাজিল করবেন, আমি তার মুখাপেক্ষী। (সূরা কাসাস, আয়াত ২৪) এর পরপরই তাঁর জন্য আশ্রয়, কাজ ও পরিবারের ব্যবস্থা হয়ে যায়।
বিজ্ঞাপন
যা রিজিকের বরকত নষ্ট করে
হারাম উপার্জন সবচেয়ে বড় বাধা। সুদ, ঘুষ, ওজনে কম দেওয়া, ভেজাল, প্রতারণা—এসব দিয়ে অঙ্ক বাড়লেও বরকত চলে যায়। মুসলিম শরিফের এক হাদিসে নবী (সা.) এমন এক ব্যক্তির কথা বলেছেন, যে দীর্ঘ সফরে এলোমেলো চুলে আকাশের দিকে হাত তুলে দোয়া করছে, অথচ তার খাবার, পানীয়, পোশাক সবই হারাম; তার দোয়া কীভাবে কবুল হবে?
অপচয়, অহংকার, নামাজে অবহেলা, মিথ্যা কসম খেয়ে পণ্য বিক্রি এবং মা-বাবার অবাধ্যতাও বরকত নষ্ট করে বলে আলেমরা সতর্ক করেছেন। আর অলসতা তো আছেই। দোয়া করে ঘরে বসে থাকা ইসলামের শিক্ষা নয়।
প্রচলিত কিছু ধারণা নিয়ে সতর্কতা
বিজ্ঞাপন
রিজিক বৃদ্ধির নামে বাজারে অনেক আমল ও বই প্রচলিত, যার অনেকগুলোর ভিত্তি দুর্বল বা নেই। যেমন সূরা ওয়াকিয়া প্রতি রাতে পড়লে কখনো অভাব আসবে না, এমন একটি বর্ণনা প্রচলিত আছে, যার সনদকে অনেক মুহাদ্দিস দুর্বল বলেছেন। সূরা ওয়াকিয়া পড়া নিঃসন্দেহে সওয়াবের কাজ, কিন্তু এই নির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতিকে নিশ্চিত হাদিস হিসেবে প্রচার করা ঠিক নয়। নির্দিষ্ট সংখ্যায় নির্দিষ্ট নাম পড়লে টাকা আসবে, এমন দাবিও এড়িয়ে চলুন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
রিজিক কি আগে থেকেই নির্ধারিত, তাহলে চেষ্টা কেন?
রিজিক আল্লাহর জ্ঞানে নির্ধারিত, কিন্তু তা অর্জনের মাধ্যম হিসেবে চেষ্টা ও দোয়াকে তিনিই বানিয়েছেন। নবী (সা.) নিজে ব্যবসা করেছেন, সাহাবিরা কৃষি ও ব্যবসা করেছেন। চেষ্টা ছেড়ে দেওয়া তাওয়াক্কুল নয়।
বিজ্ঞাপন
রিজিক বৃদ্ধির দোয়া কখন পড়ব?
ফজরের পরের দোয়াটি ফজরের সালামের পর পড়ার কথা হাদিসে আছে। বাকিগুলো যেকোনো সময়, বিশেষত শেষ রাতে, সিজদায় বা ফরজ নামাজের পর পড়া যায়।
ইস্তিগফার কীভাবে করলে রিজিক বাড়ে?
নিয়মিত আস্তাগফিরুল্লাহ পড়ুন, সকাল-সন্ধ্যা সাইয়্যেদুল ইস্তিগফার পড়ুন, আর গুনাহ ছেড়ে দেওয়ার চেষ্টা করুন। মুখের ইস্তিগফারের সঙ্গে জীবনের পরিবর্তনও দরকার।
বিজ্ঞাপন
ব্যবসায় বরকতের জন্য কী করব?
বুখারি ও মুসলিমে হাকিম ইবনে হিজাম (রা.) থেকে বর্ণিত, ক্রেতা ও বিক্রেতা যদি সত্য বলে এবং পণ্যের দোষ গোপন না করে, তবে তাদের লেনদেনে বরকত দেওয়া হয়; আর মিথ্যা বললে ও দোষ লুকালে বরকত মুছে যায়। তাই সঠিক ওজন, সত্য কথা, সময়মতো পাওনা পরিশোধ এবং যাকাত আদায়ই ব্যবসার বরকতের মূল সূত্র।