অনলাইনে ই-পাসপোর্ট আবেদন করার নিয়ম: কাগজপত্র, ফি ও ধাপসমূহ
প্রযুক্তি ডেস্ক
প্রকাশ:
বিদেশে পড়াশোনা, চাকরি, চিকিৎসা বা ওমরাহ, যে কারণেই হোক, দেশের বাইরে যেতে প্রথমে দরকার পাসপোর্ট। বাংলাদেশে এখন নতুন পাসপোর্ট মানেই ই-পাসপোর্ট, যার ভেতরে একটি ইলেকট্রনিক চিপে আপনার ছবি, আঙুলের ছাপসহ তথ্য সংরক্ষিত থাকে। আবেদনের শুরু অনলাইনে, শেষ পাসপোর্ট অফিসে।
বিজ্ঞাপন
ই-পাসপোর্ট আবেদন করার নিয়ম চার ধাপে বোঝা যায়। প্রথমে ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের পোর্টাল epassport.gov.bd তে অ্যাকাউন্ট খুলে ফরম পূরণ। দ্বিতীয়ত, পাসপোর্টের পাতা, মেয়াদ ও ডেলিভারির ধরন অনুযায়ী ফি পরিশোধ। তৃতীয়ত, নির্ধারিত দিনে আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে গিয়ে কাগজপত্র জমা ও বায়োমেট্রিক দেওয়া। চতুর্থত, পুলিশি যাচাইয়ের পর পাসপোর্ট সংগ্রহ।
পাসপোর্ট করতে কি কি লাগে
১. জাতীয় পরিচয়পত্র: ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সীদের জন্য এনআইডি বাধ্যতামূলক। মূল কার্ড ও ফটোকপি সঙ্গে রাখুন।
২. অনলাইন জন্ম নিবন্ধন সনদ: ১৮ বছরের কম বয়সীদের জন্য ইংরেজিতে তথ্যসহ অনলাইন জন্মসনদ। সঙ্গে মা-বাবার এনআইডির কপি লাগে।
বিজ্ঞাপন
৩. পুরোনো পাসপোর্ট: আগে পাসপোর্ট থাকলে মূল কপি ও তথ্যপাতার ফটোকপি।
৪. সরকারি চাকরিজীবীদের অনাপত্তিপত্র: সরকারি, আধা-সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের অনাপত্তিপত্র বা সংশ্লিষ্ট আদেশ।
৫. পেশার প্রমাণ: চিকিৎসক, প্রকৌশলী, আইনজীবীর মতো পেশা উল্লেখ করলে সংশ্লিষ্ট সনদ চাওয়া হতে পারে।
৬. বিবাহের প্রমাণ: স্বামী বা স্ত্রীর নাম যোগ করলে নিকাহনামা বা বিবাহ সনদ লাগতে পারে।
বিজ্ঞাপন
৭. ফি পরিশোধের প্রমাণ ও আবেদনের প্রিন্ট: অনলাইনে ফি দিলে রসিদ, আর আবেদনের সারসংক্ষেপের প্রিন্ট কপি।
ছবি আলাদা করে নিয়ে যেতে হয় না, পাসপোর্ট অফিসেই ছবি তোলা হয়।
অনলাইনে পাসপোর্ট আবেদন করার নিয়ম: ধাপে ধাপে
১. অবস্থান বাছাই: epassport.gov.bd তে গিয়ে অনলাইনে আবেদনের অপশন বেছে নিন। আপনি দেশে না বিদেশে আছেন, কোন জেলা ও থানার বাসিন্দা, তা নির্বাচন করুন। এর ভিত্তিতে আপনার আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস ঠিক হয়।
বিজ্ঞাপন
২. অ্যাকাউন্ট খোলা: ইমেইল ঠিকানা দিয়ে নিবন্ধন করুন। ইমেইলে আসা লিংকে চাপ দিয়ে অ্যাকাউন্ট সক্রিয় করুন, তারপর পাসওয়ার্ড দিয়ে লগইন করুন।
৩. পাসপোর্টের ধরন: সাধারণ নাগরিকেরা সাধারণ পাসপোর্ট বেছে নেবেন। তারপর ব্যক্তিগত তথ্য: নাম, জন্মতারিখ, জন্মস্থান, লিঙ্গ, পেশা, ধর্ম, যোগাযোগের তথ্য।
৪. পরিচয়পত্রের তথ্য: এনআইডি বা জন্ম নিবন্ধন নম্বর দিন। নাম ও জন্মতারিখ যেন হুবহু এনআইডির মতো হয়, এখানে অমিল থাকলে পরে আবেদন আটকে যায়।
৫. ঠিকানা ও পারিবারিক তথ্য: স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা, মা-বাবার নাম ও তাঁদের এনআইডি নম্বর, বিবাহিত হলে স্বামী বা স্ত্রীর তথ্য দিন।
বিজ্ঞাপন
৬. জরুরি যোগাযোগ ও আগের পাসপোর্ট: জরুরি প্রয়োজনে যোগাযোগের জন্য একজনের নাম-ঠিকানা দিন। আগে পাসপোর্ট থাকলে তার নম্বর ও তথ্য লিখুন।
৭. পাসপোর্টের বিকল্প: ৪৮ পাতা না ৬৪ পাতা, ৫ বছর না ১০ বছর মেয়াদ, আর রেগুলার, এক্সপ্রেস না সুপার এক্সপ্রেস ডেলিভারি, তা বেছে নিন। ১৮ বছরের কম বয়সীরা সাধারণত শুধু পাঁচ বছর মেয়াদি পাসপোর্ট পান।
৮. সাক্ষাতের তারিখ: যেসব অফিসে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ব্যবস্থা আছে, সেখানে ক্যালেন্ডার থেকে সুবিধাজনক দিন বেছে নিন।
৯. ফি পরিশোধ ও জমা: অনলাইন পেমেন্টের মাধ্যমে ফি দিন। সব তথ্য আবার মিলিয়ে আবেদন জমা দিন এবং আবেদনের সারসংক্ষেপ ডাউনলোড করে প্রিন্ট নিন।
বিজ্ঞাপন
ফি কীভাবে নির্ধারিত হয়
পাসপোর্টের ফি তিনটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে: পাতার সংখ্যা, মেয়াদ এবং কত দ্রুত চান। ৪৮ পাতার ৫ বছর মেয়াদি রেগুলার পাসপোর্টের ফি সবচেয়ে কম, ৬৪ পাতার ১০ বছর মেয়াদি সুপার এক্সপ্রেসের ফি সবচেয়ে বেশি। ফির সঙ্গে ভ্যাট যুক্ত থাকে। হালনাগাদ ফির তালিকা পোর্টালেই দেওয়া থাকে, আবেদনের আগে সেখান থেকে মিলিয়ে নিন। ঘন ঘন বিদেশে যাতায়াত না করলে ৪৮ পাতাই যথেষ্ট, আর প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ১০ বছর মেয়াদ নিলে বারবার নবায়নের ঝামেলা কমে।
পাসপোর্ট অফিসে যেদিন যাবেন
নির্ধারিত দিনে সকাল সকাল পৌঁছান। আবেদনের প্রিন্ট, ফি পরিশোধের রসিদ, মূল এনআইডি বা জন্মসনদ এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য কাগজের মূল ও ফটোকপি সঙ্গে রাখুন। কাগজ যাচাইয়ের পর ছবি তোলা হবে, দশ আঙুলের ছাপ আর চোখের মণির ছবি নেওয়া হবে। ছবির জন্য সাদা পোশাক এড়িয়ে চলুন এবং চশমা খুলে রাখুন।
বিজ্ঞাপন
সব শেষে একটি ডেলিভারি স্লিপ দেওয়া হবে। এই স্লিপ পাসপোর্ট সংগ্রহের দিন লাগবে, তাই যত্নে রাখুন। এরপর আপনার ঠিকানায় পুলিশি যাচাই হতে পারে। পুলিশ যোগাযোগ করলে কাগজপত্র দেখান। পাসপোর্ট প্রস্তুত হলে সাধারণত এসএমএস আসে, epassport.gov.bd তে স্ট্যাটাস দেখেও জানা যায়।
প্রবাসী, বয়স্ক ও জরুরি প্রয়োজনের আবেদনকারী
বিদেশে থাকা বাংলাদেশিরা সংশ্লিষ্ট দেশের বাংলাদেশ দূতাবাস বা মিশনের মাধ্যমে ই-পাসপোর্টের আবেদন করতে পারেন। অনলাইন ফরমে অবস্থান হিসেবে বিদেশ এবং নির্দিষ্ট মিশন বাছাই করতে হয়। ফি ও প্রয়োজনীয় কাগজ মিশনভেদে কিছুটা আলাদা হতে পারে, তাই মিশনের নির্দেশনা দেখে নিন।
বয়স্ক বা অসুস্থ আবেদনকারীর ক্ষেত্রে অনেক অফিসে আলাদা সারি বা সহায়তার ব্যবস্থা থাকে। চিকিৎসার জন্য জরুরি ভিত্তিতে বিদেশ যেতে হলে চিকিৎসকের কাগজপত্রসহ সুপার এক্সপ্রেস ডেলিভারি বেছে নেওয়া যায়। তবে পুলিশি যাচাইসহ নানা কারণে নির্ধারিত সময়ের চেয়ে বেশি লাগার সম্ভাবনা মাথায় রেখে ভ্রমণের টিকিট কাটুন। পাসপোর্ট হাতে না পাওয়া পর্যন্ত ফেরতযোগ্য নয় এমন টিকিট বা হোটেল বুকিং না করাই নিরাপদ।
বিজ্ঞাপন
যে ভুলগুলো আবেদন আটকে দেয়
এনআইডি আর আবেদনে নামের বানান বা জন্মতারিখে অমিল সবচেয়ে বড় সমস্যা। পেশা হিসেবে এমন কিছু লেখা, যার প্রমাণ দেখাতে পারবেন না, তা-ও ঝামেলা বাড়ায়। মা-বাবার নাম তাঁদের এনআইডির বানানের সঙ্গে না মিললে প্রশ্ন ওঠে। আর দালালের হাতে আবেদন তুলে দিলে ভুল তথ্য বসানোর ঝুঁকি থাকে। নিজে ধীরেসুস্থে ফরম পূরণ করুন, প্রয়োজনে অফিসের হেল্পডেস্কের সাহায্য নিন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
পাসপোর্ট করার নিয়ম কি শিশুদের জন্য আলাদা?
বিজ্ঞাপন
ধাপ একই, তবে শিশুদের ক্ষেত্রে অনলাইন জন্মসনদ ও মা-বাবার এনআইডি লাগে। সাধারণত মা বা বাবাকে সঙ্গে যেতে হয় এবং পাঁচ বছর মেয়াদি পাসপোর্ট দেওয়া হয়।
ই-পাসপোর্টের আবেদন কি নিজ জেলার বাইরে করা যায়?
সাধারণত স্থায়ী বা বর্তমান ঠিকানার ভিত্তিতে নির্ধারিত আঞ্চলিক অফিসে আবেদন করতে হয়। ঠিকানা বাছাইয়ের সময় সঠিক অফিস নির্বাচন করুন।
আবেদনের পর তথ্য ভুল দেখলে কী করব?
বিজ্ঞাপন
বায়োমেট্রিকের দিন অফিসে কাগজ যাচাইয়ের সময় কর্মকর্তাকে জানান। পাসপোর্ট ছাপা হয়ে গেলে সংশোধনে নতুন আবেদন লাগতে পারে।
ই পাসপোর্ট আবেদন কি মোবাইল দিয়ে করা যায়?
যায়, তবে ফরম লম্বা হওয়ায় কম্পিউটারে করা সুবিধাজনক। মোবাইলে করলে ফোনের ব্রাউজারের ডেস্কটপ সংস্করণ চালু করে নিলে পূরণ সহজ হয়।
আবেদন অর্ধেক পূরণ করে রেখে পরে শেষ করা যায়?
বিজ্ঞাপন
হ্যাঁ, অ্যাকাউন্টে লগইন করে অসম্পূর্ণ আবেদন পরে আবার খোলা যায়। তবে ফি পরিশোধ ও চূড়ান্ত জমার আগে সব তথ্য আরেকবার মিলিয়ে নিন, কারণ জমার পর অনলাইনে বদলানোর সুযোগ খুব সীমিত।