শবে বরাত কী: অর্থ, তাৎপর্য ও এ রাতে মুমিনের করণীয়
ধর্ম ডেস্ক
প্রকাশ:
শাবান মাসের চৌদ্দ তারিখ সূর্যাস্তের পর যে রাত শুরু হয়, বাংলাদেশে সেটিকে শবে বরাত বলা হয়। হাদিসে এ রাতকে বলা হয়েছে লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান, অর্থাৎ শাবান মাসের মধ্যবর্তী রাত। শবে বরাত নামটি কোরআন বা হাদিসের নয়; এটি ফারসি-আরবি মিশ্রণে গড়ে ওঠা একটি প্রচলিত নাম, যা উপমহাদেশে বেশি ব্যবহৃত।
বিজ্ঞাপন
এ রাত নিয়ে মানুষের আগ্রহ যেমন বেশি, ভুল ধারণাও তেমন অনেক। কেউ মনে করেন এ রাতেই সারা বছরের ভাগ্য লেখা হয়, কেউ মনে করেন হালুয়া-রুটি না বানালে বা আতশবাজি না ফোটালে শবে বরাত হয় না। আবার কেউ মনে করেন, এ রাতের কোনো ভিত্তিই নেই।
সঠিক চিত্রটি জানতে হাদিসের বর্ণনা ও আলেমদের মতামত দুটোই দেখা দরকার। সংক্ষেপে বললে, মধ্য শাবানের রাতে আল্লাহর বিশেষ ক্ষমার কথা একটি হাদিসে এসেছে, যাকে অনেক মুহাদ্দিস গ্রহণযোগ্য বলেছেন। তাই বাংলাদেশের অধিকাংশ আলেম এ রাতে ব্যক্তিগত নফল ইবাদতকে উত্তম মনে করেন। কিন্তু এ রাতের জন্য নির্দিষ্ট নামাজ, নির্দিষ্ট খাবার বা উৎসবের যে রীতি সমাজে চালু আছে, তার কোনো ভিত্তি নেই।
শবে বরাত অর্থ কী
শব ফারসি শব্দ, অর্থ রাত। আর বরাত শব্দটি আরবি বারাআত থেকে এসেছে বলে ধরা হয়, যার অর্থ মুক্তি, নিষ্কৃতি বা দায়মুক্তি। সে হিসেবে শবে বরাতের অর্থ মুক্তির রাত, অর্থাৎ গুনাহ ও জাহান্নাম থেকে মুক্তির আশার রাত।
বিজ্ঞাপন
আমাদের দেশে অনেকে বরাত শব্দটিকে ভাগ্য অর্থে বোঝেন, যেমন কপাল বা বরাত ভালো। এই ভাষাগত মিল থেকেই হয়তো এ রাতকে ভাগ্যের রাত মনে করার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। কিন্তু হাদিসে এ রাতের যে বৈশিষ্ট্য এসেছে, তা ক্ষমার, ভাগ্য লেখার নয়।
হাদিসে মধ্য শাবানের রাত
এ বিষয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হাদিসটি মুআজ ইবনে জাবাল (রা.) থেকে বর্ণিত, যা ইবনে মাজাহ, ইবনে হিব্বানসহ কয়েকটি গ্রন্থে এসেছে:
আল্লাহ তাআলা মধ্য শাবানের রাতে তাঁর সৃষ্টির প্রতি দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারী ছাড়া সবাইকে ক্ষমা করে দেন।
বিজ্ঞাপন
এই হাদিসের সনদ নিয়ে মুহাদ্দিসদের মধ্যে আলোচনা আছে। বেশ কয়েকটি সূত্রে বর্ণিত হওয়ায় অনেক মুহাদ্দিস একে হাসান বা গ্রহণযোগ্য বলেছেন। আবার কিছু মুহাদ্দিস এর প্রতিটি সূত্রকে দুর্বল মনে করেন।
এ ছাড়া আয়েশা (রা.)-এর একটি বর্ণনা তিরমিজিতে আছে, যেখানে এক রাতে নবী (সা.)-কে জান্নাতুল বাকি কবরস্থানে পাওয়ার কথা এবং মধ্য শাবানের রাতে বিপুলসংখ্যক মানুষকে ক্ষমার কথা এসেছে। ইমাম তিরমিজি নিজেই এর সনদকে দুর্বল বলেছেন। আর রাতে নামাজ পড়ো ও দিনে রোজা রাখো—এমন একটি বর্ণনা ইবনে মাজাহতে আছে, যার সনদ মুহাদ্দিসদের মতে খুবই দুর্বল।
আলেমদের মতামত
এসব বর্ণনার ভিত্তিতে আলেমদের মধ্যে দুটি প্রধান অবস্থান আছে। বাংলাদেশের অধিকাংশ আলেমসহ অনেক আলেমের মত হলো, মধ্য শাবানের রাতের একটি বিশেষ মর্যাদা আছে। এ রাতে ব্যক্তিগতভাবে নফল নামাজ, তেলাওয়াত, জিকির, দোয়া ও তওবা করা উত্তম। পূর্ববর্তী যুগের অনেক তাবেয়ি ও আলেম এ রাতে ইবাদত করতেন বলে বর্ণনা পাওয়া যায়।
বিজ্ঞাপন
অন্য একদল আলেমের মতে, এ রাতের বিশেষ ফজিলত সম্পর্কে কোনো বর্ণনা যথেষ্ট শক্তিশালী নয়। তাই এ রাতকে আলাদা করে বিশেষ ইবাদতের জন্য নির্দিষ্ট করা ঠিক নয়; অন্য রাতের মতোই এ রাতে যে যার নিয়মিত আমল করবেন।
দুই পক্ষই একটি বিষয়ে একমত: এ রাতের জন্য বিশেষ পদ্ধতির নামাজ, সম্মিলিত আনুষ্ঠানিকতা, খাবারের রসম, আলোকসজ্জা ও আতশবাজি শরিয়তসম্মত নয়।
শবে বরাত ও ভাগ্য নির্ধারণ
অনেকে সূরা দুখানের তৃতীয় ও চতুর্থ আয়াতকে শবে বরাতের দলিল হিসেবে উল্লেখ করেন, যেখানে বলা হয়েছে, আমি একে বরকতময় রাতে নাজিল করেছি; সে রাতে প্রতিটি প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয় স্থির করা হয়। কিন্তু অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে এ বরকতময় রাত হলো লাইলাতুল কদর, কারণ কোরআন রমজানে, কদরের রাতে নাজিল হয়েছে বলে অন্য আয়াতে স্পষ্ট বলা আছে। এক তাবেয়ির মতে এটি মধ্য শাবানের রাত, তবে মুফাসসিররা সে মতকে দুর্বল বলেছেন।
বিজ্ঞাপন
তাই এ রাতে সারা বছরের ভাগ্য লেখা হয়, হায়াত-মওত-রিজিক বণ্টন হয়—এই ধারণার পক্ষে শক্ত দলিল নেই। মুমিনের জন্য নিরাপদ অবস্থান হলো, হাদিসে যতটুকু এসেছে, অর্থাৎ ক্ষমার আশা, ততটুকু নিয়েই এ রাতকে দেখা।
এ রাতে মুমিনের করণীয় ও বর্জনীয়
করণীয়:
১. এশা ও ফজর জামাতে: যেকোনো রাতের মতো এ রাতেরও প্রথম কাজ ফরজ নামাজ ঠিক রাখা।
বিজ্ঞাপন
২. ব্যক্তিগত নফল ইবাদত: সামর্থ্য অনুযায়ী নফল নামাজ, কোরআন তেলাওয়াত, জিকির, দরুদ ও ইস্তিগফার। ঘরে একা করাই উত্তম।
৩. তওবা ও দোয়া: নিজের গুনাহের জন্য তওবা, মা-বাবা ও মৃত আত্মীয়দের জন্য দোয়া।
৪. বিদ্বেষ দূর করা: হাদিসে বিদ্বেষ পোষণকারীকে ক্ষমা থেকে বাদ রাখার কথা এসেছে। তাই কারও সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ থাকলে এ রাতের আগেই তা মিটিয়ে ফেলুন। এটিই সম্ভবত এ রাতের সবচেয়ে বড় প্রস্তুতি।
৫. শাবানের রোজা: নবী (সা.) শাবান মাসে অন্য মাসের চেয়ে বেশি নফল রোজা রাখতেন (বুখারি, মুসলিম)। প্রতি মাসের তেরো, চৌদ্দ ও পনেরো তারিখের রোজাও সুন্নত। এ হিসেবে পনেরো শাবানের রোজা রাখা যায়।
বিজ্ঞাপন
বর্জনীয়: আতশবাজি, পটকা, আলোকসজ্জা, হালুয়া-রুটিকে আবশ্যক রসম বানানো, দলবেঁধে রাতভর ঘোরাঘুরি, কবরস্থানে ভিড় করে মেলার পরিবেশ তৈরি, মসজিদে বিশেষ আয়োজনে নফলের জামাত এবং অপচয়। এগুলো ইবাদত নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে গুনাহের কারণ।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
শবে বরাত কেন পালন করা হয়?
মধ্য শাবানের রাতে আল্লাহর বিশেষ ক্ষমার হাদিসের কারণে অনেক মুসলমান এ রাতে ইবাদত করেন। এটি উৎসব নয়, ক্ষমা চাওয়ার রাত হিসেবে দেখাই সঠিক।
বিজ্ঞাপন
শবে বরাত কি ফরজ বা সুন্নত?
এ রাতে বিশেষ কোনো ইবাদত ফরজ বা ওয়াজিব নয়। যে আলেমরা এ রাতের ফজিলত স্বীকার করেন, তাঁরাও ইবাদতকে নফল ও ঐচ্ছিক বলেছেন।
শবে বরাতে হালুয়া-রুটি খাওয়া কি গুনাহ?
হালুয়া-রুটি খাওয়া নিজে গুনাহ নয়। কিন্তু একে এ রাতের ধর্মীয় রীতি বা সওয়াবের কাজ মনে করা ভিত্তিহীন। খাবার রান্নার ব্যস্ততায় যেন ইবাদতের সময় নষ্ট না হয়।
বিজ্ঞাপন
শবে বরাত কবে, কীভাবে হিসাব করব?
চাঁদ দেখে শাবান মাস শুরু হওয়ার পর চৌদ্দ শাবানের সূর্যাস্তের পর যে রাত আসে, সেটিই মধ্য শাবানের রাত। ইসলামি দিন সূর্যাস্ত থেকে শুরু হয় বলে একে চৌদ্দ শাবান দিবাগত রাত বলা হয়। বাংলাদেশে জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির ঘোষণার ভিত্তিতে তারিখ নির্ধারিত হয়।
শবে বরাতে কবর জিয়ারত করা কি জরুরি?
জরুরি নয়। কবর জিয়ারত যেকোনো দিন সুন্নত, এ রাতের বিশেষ আমল নয়। কেউ একা গিয়ে নীরবে দোয়া করলে দোষ নেই, তবে একে রীতি বানানো বা দলবেঁধে ভিড় করা ঠিক নয়।
বিজ্ঞাপন
মৃত মা-বাবার জন্য এ রাতে কী করতে পারি?
তাঁদের জন্য ক্ষমা ও রহমতের দোয়া করুন, তাঁদের পক্ষ থেকে দান করুন। মৃতদের জন্য দোয়া ও সদকা যেকোনো দিনই উপকারে আসে; এ জন্য কোনো নির্দিষ্ট রাতের অপেক্ষা করতে হয় না।