জুলাই সনদ স্বাক্ষরের এক বছরেও দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই
সংবিধান সংস্কার পরিষদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়ন নিয়ে বিএনপি এবং জামায়াতের মধ্যে বিরোধ
নিজস্ব প্রতিবেদক · ঢাকা
প্রকাশ:
এক বছর আগে জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষর হলেও রাষ্ট্র সংস্কারের অঙ্গীকার বাস্তবায়নে চোখে পড়ার মতো কোনো অগ্রগতি হয়নি। উপরন্তু সংবিধান সংস্কার ও সংশোধনের পদ্ধতি নিয়ে ক্ষমতাসীন বিএনপি এবং প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী ও তাদের মিত্রদের মধ্যে বিরোধ দেখা দিয়েছে। গণভোটের রায় কার্যকর করা, সংবিধান সংস্কার পরিষদের কাজ এবং সনদে প্রস্তাবিত নানা প্রতিষ্ঠানের সংস্কার নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েই গেছে।
বিজ্ঞাপন
সংশ্লিষ্ট দফতরে যোগাযোগ করে জানা যায়, সনদ বাস্তবায়নে এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। রাজনৈতিক দলগুলোর অঙ্গীকার ও গণভোটের রায় কার্যকরে সুস্পষ্ট উদ্যোগ না থাকায় অনিশ্চয়তা বেড়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে নেওয়া কিছু সংস্কারও এর মধ্যে বাতিল হয়েছে।
সরকার অবশ্য প্রথম থেকেই বলছে, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করা হবে। সম্প্রতি জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি আবারও সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, সনদ অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করবে সরকার। এ জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সাংবাদিক ও জুলাই যোদ্ধাসহ নানা অংশীজনের সঙ্গে সরকারের মতবিনিময় অব্যাহত আছে।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে দীর্ঘ আলোচনার পর প্রস্তুত করা জুলাই জাতীয় সনদে সই হয় ২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর, জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায়। সনদে রাষ্ট্র সংস্কারের মোট ৮৪টি দফা অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এর ৪৮টি সংবিধান-সম্পর্কিত; বাকি ৩৬টি আইন, অধ্যাদেশ, বিধি বা নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়নযোগ্য বলে চিহ্নিত।
সনদের বক্তব্য অনুযায়ী, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ-সংক্রান্ত ঐকমত্য কার্যকর হবে। সে ক্ষেত্রে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ সংবিধান সংস্কার পরিষদের দায়িত্বও পালন করবে এবং ১৮০ কার্যদিবসের ভেতরে সনদের সংবিধান-সম্পর্কিত বিষয়গুলো সংবিধানে যুক্ত করবে।
বিজ্ঞাপন
এর পর একই বছরের ১৩ নভেম্বর জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ-২০২৫-এর গেজেট প্রকাশিত হয়। সই অনুষ্ঠানে বিএনপি ও জামায়াতসহ ২৪টি রাজনৈতিক দল অংশ নেয়। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সনদে সই করে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের দুই দিন পর। এখন পর্যন্ত ২৫টি রাজনৈতিক দল সনদে সম্মতি দিয়েছে। চার বাম দল—বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), বাসদ (মার্কসবাদী) ও বাংলাদেশ জাসদ—জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সংলাপে অংশ নিলেও বাহাত্তরের সংবিধানের চার মূলনীতি সংস্কারের প্রশ্নে সই করেনি।
জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়ন নিয়ে এখন মুখোমুখি অবস্থানে একদিকে ক্ষমতাসীন বিএনপি, অন্যদিকে প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী ও তাদের মিত্ররা। বিরোধী দলের অভিযোগ, রাষ্ট্রপতির সংস্কার আদেশ অনুসারে সংসদ সদস্য হিসেবে শপথের পর সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও দ্বিতীয় শপথ নেওয়ার কথা ছিল। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বিরোধী দলের সদস্যরা সেই দ্বিতীয় শপথ নিলেও ক্ষমতাসীন দলের সদস্যরা কেবল সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছেন।
মন্ত্রীরা একাধিকবার সনদ পুরোপুরি বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করলেও তাঁদের বক্তব্য, তা করা হবে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে। এর অংশ হিসেবে গত ১৩ জুলাই ১৭ সদস্যের একটি সংবিধান সংশোধন কমিটির প্রস্তাব করা হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ওই কমিটির জন্য বিরোধী দলকে পাঁচজনের নাম দিতে বলেন। বিরোধী দল সে প্রস্তাবে সাড়া দেয়নি; সংবিধান সংস্কারের দাবিতেই তারা অনড়।
সংসদেও এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডা হয়েছে। সমাধানের নিশ্চয়তা না পেয়ে বিরোধী দল রাজপথে আন্দোলনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং বিভাগীয় পর্যায়ে লং মার্চসহ নানা কর্মসূচি পালন করছে। বিরোধী দলের শীর্ষ নেতারা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, দাবি না মানলে আগামী ১৪ নভেম্বর ঢাকার মহাসমাবেশ থেকে চূড়ান্ত কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
বিজ্ঞাপন
রাজনীতি বিশ্লেষক ও বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হকের মতে, জুলাই জাতীয় সনদ পুরোপুরি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিএনপির বড় রাজনৈতিক দায় আছে। এই সনদ দেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণে বড় মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে। বিদ্যমান ঐকমত্য অটুট রেখে সনদ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করলেই বিএনপির প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার পরিচয় মিলবে বলে তিনি মনে করেন।
সাইফুল হকের ভাষ্য, সনদ যেভাবে সই হয়েছে, তাতে এর পূর্ণ বাস্তবায়নের রাজনৈতিক দায় বিএনপির, এবং এই অঙ্গীকার থেকে সরে আসার সুযোগ দলটির নেই। কেন বিএনপি সেই সুযোগ নিল না, তার যুক্তিসংগত ও পরিষ্কার ব্যাখ্যাও দলটি জনগণের সামনে দিতে পারেনি। ফলে বিএনপি সনদ মানে না বা মৌলিক সংস্কার চায় না—এমন প্রচারণা জোরদার হয়েছে এবং সনদ বাস্তবায়নে দলটির অবস্থান নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। অথচ সংবিধান সংশোধনের বদলে সংস্কারের পথেও দলটি নিজেদের লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে পারত।
সনদ সইয়ের এক বছর পরও রাষ্ট্র সংস্কারে দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকার পাশাপাশি কিছু ক্ষেত্রে আগের সংস্কার বাতিলও হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় ও বিচারক নিয়োগ কাউন্সিল-সংক্রান্ত যে সংস্কার হয়েছিল, বর্তমান সরকার তা বিলুপ্ত করেছে। পুলিশ কমিশনও গঠিত হয়নি। এসব সংস্কারে কোনো রাজনৈতিক দলের ‘নোট অব ডিসেন্ট’ না থাকলেও সরকার গঠনের পর বিএনপি সেগুলো আর রাখেনি।
সনদ তৈরির সময় প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ এবং নির্বাহী, বিচার ও আইন বিভাগের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য আনার কথা বলা হয়েছিল। নিম্নকক্ষ ও উচ্চকক্ষের সংসদ সদস্যদের গোপন ব্যালটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রস্তাব ছিল সনদে, যাতে সব দল একমত ছিল। অথচ গত ২০ আগস্টের নির্বাচন হয়েছে প্রকাশ্য ব্যালটে।
বিজ্ঞাপন
সনদ অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ছাড়াই রাষ্ট্রপতি জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, প্রেস কাউন্সিল ও আইন কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্য এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ও এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্য নিয়োগ দিতে পারবেন। তবে গভর্নর ও এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে নিয়োগের ক্ষমতা রাষ্ট্রপতিকে দেওয়ায় বিএনপির আপত্তি আছে।
একজন ব্যক্তি ১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না—সনদে এমন প্রস্তাবও রয়েছে, যা সংবিধান সংশোধনের আগে কার্যকর করা যাবে না। বিএনপি সংস্কার বাস্তবায়নের কথা জানিয়েছে। ভোটের অনুপাতে সংসদের উচ্চকক্ষ গঠনের প্রস্তাবও সনদে আছে; সংবিধান সংশোধনে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদনও লাগবে। তবে সংবিধান সংশোধনে গঠিত বিশেষ কমিটি জানিয়েছে, বিএনপির ৩১ দফা অনুসারে সংসদে আসনের অনুপাতেই উচ্চকক্ষ গঠিত হবে।
আপিল বিভাগে বিচারপতির সংখ্যা বাড়ানোর প্রস্তাবও সনদে আছে। এখন আপিল বিভাগে বিচারপতি পাঁচজন, একসময় এ সংখ্যা ছিল ১৭। এ প্রস্তাবেও ‘নোট অব ডিসেন্ট’ ছিল না, কিন্তু এটি কার্যকর হয়নি।
অন্তর্বর্তী সরকার প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কমাতে অধ্যাদেশ জারি করে বিচারক নিয়োগ কাউন্সিল গঠন করেছিল; ২০২৫ সালে এর মাধ্যমে বিচারপতি নিয়োগও হয়। সনদে কাউন্সিলকে কমিশনে রূপান্তরের প্রস্তাব ছিল।