প্রথমবারের মতো সবুজ রঙের শ্বেত বামন নক্ষত্রের সন্ধান
একই গবেষণায় স্যামন মাছের মতো গোলাপি রঙের আরেকটি নক্ষত্রের বৈশিষ্ট্যও উঠে এসেছে
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ:
জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা শ্বেত বামন নক্ষত্র নিয়ে কাজ করতে গিয়ে এমন এক নক্ষত্রের খোঁজ পেয়েছেন, মানুষের চোখে যার রং সবুজ দেখাতে পারে। একই গবেষণায় স্যামন মাছের মতো গোলাপি রঙের আরেকটি নক্ষত্রের বৈশিষ্ট্যও ধরা পড়েছে। বিজ্ঞানীদের ব্যাখ্যা, নক্ষত্রের আলোর বর্ণালী খতিয়ে দেখলে এই অস্বাভাবিক রঙের কারণ অনুমান করা যায়।
বিজ্ঞাপন
গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছে যুক্তরাজ্যের ওয়ারউইক বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্বিজ্ঞানী মার্ক হল্যান্ডসের নেতৃত্বে। এতে শ্বেত বামন নক্ষত্রের রঙ ও রাসায়নিক গঠন যাচাই করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার এ-সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ হয়।
নক্ষত্রের রং সাধারণত তার তাপমাত্রার ওপর নির্ভর করে, তাই বেশির ভাগ নক্ষত্র কমলা, সাদা বা নীল দেখায়। কিন্তু সূর্যের মতো নক্ষত্র জীবনের শেষ দিকে যে অতি ঘন অবশিষ্টাংশে পরিণত হয়, সেই শ্বেত বামনের বেলায় ব্যতিক্রম চোখে পড়ে। এদের বাইরের স্তরে ঘটে যাওয়া ভৌত ও রাসায়নিক প্রক্রিয়া আলোর বর্ণালী বদলে দিতে পারে।
হল্যান্ডস বলেন, শ্বেত বামনের বায়ুমণ্ডলে থাকা হিলিয়াম অন্য উপাদানের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করে, আর এটিই রঙের তারতম্যের একটি কারণ। অতীতে নক্ষত্রগুলো কোন কোন পদার্থের সংস্পর্শে এসেছে, তার ভিত্তিতে এসব উপাদানের উপস্থিতি ও পরিমাণও ভিন্ন হয়।
শ্বেত বামনের আশপাশের গ্রহাণু বা পাথুরে মহাজাগতিক বস্তু নক্ষত্রটির খুব কাছে এসে পড়লে মহাকর্ষের টানে টুকরো হয়ে যেতে পারে। সেসব বস্তুর ধুলা ও ধ্বংসাবশেষ পরে নক্ষত্রের বাইরের স্তরে জমে। ধ্বংসাবশেষে লোহা, ম্যাগনেশিয়াম ও সোডিয়ামের মতো উপাদান থাকতে পারে।
বিজ্ঞাপন
হল্যান্ডসের ভাষ্য, বাইরের স্তরে জমা এসব উপাদান বিশ্লেষণ করলে নক্ষত্রটির কাছে একসময় থাকা গ্রহাণু বা পাথুরে বস্তুর রাসায়নিক গঠন সম্পর্কে ধারণা মেলে। ফলে শ্বেত বামনকে ব্যবহার করে ধ্বংস হয়ে যাওয়া গ্রহের উপাদান চিহ্নিত করা সম্ভব।
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সান দিয়েগো ক্যাম্পাসের জ্যোতির্বিজ্ঞান ও জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক অ্যাডাম বারগাসারের কথায়, শ্বেত বামন থেকে জানা যায় ধ্বংস হওয়া গ্রহের ভেতরে কোন কোন উপাদান ছিল এবং সেগুলোর অনুপাত কেমন ছিল। এ থেকে গ্রহ কীভাবে গড়ে উঠেছিল, তার গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পাওয়া যায়। তিনি ব্যাপারটিকে অপরাধস্থল থেকে আলামত কুড়ানোর সঙ্গে তুলনা করেন। তাঁর মতে, ধ্বংসাবশেষের রাসায়নিক বিশ্লেষণ করে অতীতের কোনও গ্রহের গঠন ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
গবেষণায় হল্যান্ডস পৃথিবী থেকে ২০ পারসেক বা প্রায় ৬৫ আলোকবর্ষের মধ্যে থাকা ১৫১টি পরিচিত শ্বেত বামন নক্ষত্রের তথ্য খতিয়ে দেখেন। ব্যতিক্রমী সবুজ রঙের নক্ষত্রটিতে ক্যালসিয়াম, সোডিয়াম ও লিথিয়ামের মতো উপাদানের উপস্থিতি মিলেছে।
গবেষণায় যুক্ত না থাকা অধ্যাপক বারগাসার জানান, নক্ষত্রটিতে এত বেশি উপাদান কীভাবে জমল, তা জানার বিষয়টি তাঁর কৌতূহল বাড়িয়েছে। এমন গবেষণা বিজ্ঞানীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মনেও মহাবিশ্বের ব্যতিক্রমী বস্তু নিয়ে আগ্রহ জাগাতে পারে। তালিকার আরেকটি নক্ষত্রের রং ছিল স্যামন মাছের মতো গোলাপি। হল্যান্ডসের বক্তব্য অনুযায়ী, নক্ষত্রটিতে কার্বন অণুর ঘনত্ব বেশি, আর এর সঙ্গেই এই রঙের সম্পর্ক রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
এসব নক্ষত্র এত দূরে যে পৃথিবী থেকে খালি চোখে দেখা যায় না। তাই গবেষকেরা বর্ণালীর তথ্য বিশ্লেষণ করে নক্ষত্রগুলোর সম্ভাব্য রং ঠিক করেছেন। প্রিজমের ভেতর দিয়ে গেলে সূর্যের আলো যেমন নানা রঙে ভাগ হয়, তেমনি তরঙ্গদৈর্ঘ্য ধরে নক্ষত্রের আলো ভাঙলে বর্ণালী পাওয়া যায়। এই বর্ণালী দেখে নক্ষত্রের রাসায়নিক গঠনসহ নানা বৈশিষ্ট্য বোঝা সম্ভব।
পেন স্টেট স্ক্র্যান্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক ও জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানী অ্যাগনেস কিম এই গবেষণার সঙ্গে যুক্ত নন। তিনি বলেন, সবুজ নক্ষত্র নিয়ে এ কাজ নতুন কোনও বড় আবিষ্কার না হলেও শ্বেত বামন বোঝার ক্ষেত্রে এটি আকর্ষণীয় একটি দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েছে। বর্ণালী থেকে পাওয়া রং মানুষের চোখে কেমন লাগতে পারে, তা বিশ্লেষণ করাকে তিনি পদার্থবিজ্ঞান ও জীববিজ্ঞানের সংযোগস্থল বলে মনে করেন। তাঁর মতে, নক্ষত্রগুলো পৃথিবীর কাছাকাছি থাকলে কিছু নক্ষত্রকে সবুজ এবং কয়েকটিকে গোলাপি দেখা যেতে পারত।
বারগাসারের মতে, তাপমাত্রা ও বায়ুমণ্ডলের বৈশিষ্ট্য ধরে নক্ষত্রের এমন শ্রেণিবিন্যাস ভবিষ্যতের গবেষণায় কাজে লাগতে পারে। এতে নক্ষত্রের রং, রাসায়নিক গঠন ও এদের মধ্যকার সম্ভাব্য সম্পর্ক বোঝা সহজ হবে।
হল্যান্ডসের পরিকল্পনা, ভবিষ্যতে আরও বেশি শ্বেত বামনের বর্ণালী বিশ্লেষণ করা। নতুন প্রযুক্তি ও বর্ণালীবীক্ষণ জরিপের সাহায্যে পৃথিবী থেকে আরও দূরের নক্ষত্রের তথ্যও সংগ্রহ করা যাবে বলে তিনি আশা করছেন। তিনি জানান, অনেক শ্বেত বামনের কথা জানা থাকলেও এদের বর্ণালীর তথ্য এখনও মেলেনি। নতুন জরিপের তথ্য আসতে শুরু করলে বিশ্লেষণযোগ্য নক্ষত্রের সংখ্যা প্রায় ১০ গুণ বাড়তে পারে।
বিজ্ঞাপন
ফলে এখন যেখানে এক বা দুটি সবুজ শ্বেত বামন শনাক্ত হয়েছে, সেখানে ভবিষ্যতে ১০ থেকে ২০টি এমন নক্ষত্র পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।