রাশিয়ার অব্যাহত বিমান হামলায় ইউক্রেনের আর্থিক সংকট আরও গভীর হচ্ছে। ব্যয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাজেট ঘাটতিও বড় হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে আগামী বছর ইউক্রেনের আর্থিক ও সামরিক ঘাটতি পূরণে ইউরোপীয় মিত্রদের জব্দ করা রুশ সম্পদ ব্যবহারের আহ্বান জানিয়েছে কিয়েভ। মিত্ররা সহায়তা না বাড়ালে ২০২৭ সালে ইউক্রেনের ঘাটতি ৭৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। খবর ইউরো নিউজের।
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) ব্রাসেলসে আন্তর্জাতিক দাতা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে ইউক্রেনের অর্থমন্ত্রী সের্হি মার্চেনকো এ আহ্বান জানান।
বৈঠকে মার্চেনকো বলেন, রাশিয়ার জব্দ করা সম্পদের অর্থ ইউক্রেনের নজিরবিহীন যুদ্ধকালীন ব্যয় মেটাতে বাস্তবসম্মত ও ন্যায্য সমাধান হতে পারে। একই সঙ্গে এটি ইউক্রেনের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা ধরে রাখা এবং রাশিয়ার আগ্রাসনের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন। ব্যক্তিগত ওই আলোচনার বিষয়ে অবগত কর্মকর্তাদের বরাতে এসব তথ্য জানা গেছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছে রাশিয়ার প্রায় ২১০ বিলিয়ন ইউরো মূল্যের সম্পদ জব্দ রয়েছে। এর বড় অংশই ব্রাসেলসভিত্তিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইউরোক্লিয়ারে রাখা।
বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত স্পর্শকাতর বলে স্বীকার করে মার্চেনকো ইউরোপীয় ইউনিয়নকে একটি কেন্দ্রীয় ও আইনগতভাবে শক্তিশালী কাঠামো তৈরির বিষয়টি বিবেচনা করার আহ্বান জানান।
সোমবার ইউরোপিয়ান পলিসি সেন্টারের এক আলোচনাতেও একই বার্তা দেন তিনি। ওই আলোচনায় ইউরোক্লিয়ার থেকে রুশ সম্পদ সরিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মালিকানাধীন কোনো সংস্থার কাছে হস্তান্তরের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়। এতে বেলজিয়ামের ওপর সম্ভাব্য ঝুঁকি কমানোর বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হয়।
মার্চেনকো বলেন, আমাদের বন্ধু ও ইউরোপীয় রাজনীতিকদের যথেষ্ট সাহসী হতে হবে এবং কিছু সাহসী পদক্ষেপ নিতে হবে।
তিনি বলেন, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত ও কঠিনতর হচ্ছে। তাই জব্দ করা রুশ সম্পদ ব্যবহারের বিষয়ে সমাধান বের করতে হবে, অথবা ইউক্রেনের টিকে থাকার জন্য বিকল্প কোনো ব্যবস্থা করতে হবে।
মার্চেনকো ২০২৭ সালে ইউক্রেনের সামনে থাকা গুরুতর আর্থিক সংকটের একটি চিত্র তুলে ধরেন। তার হিসাবে, আগামী বছর দাতাদের কাছ থেকে ইউক্রেনের ৫২ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন হবে। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত মাত্র ২০ বিলিয়ন ডলার নিশ্চিত হয়েছে। ফলে ঘাটতি রয়েছে ৩২ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার।
এর বাইরে প্রতিরক্ষা খাতে প্রায় ৪৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয় প্রয়োজন, যার জন্য এখনো মিত্ররা কোনো নিশ্চয়তা দেয়নি। সব মিলিয়ে ইউক্রেনের ৭৮ বিলিয়ন ডলারের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।
রাশিয়ার অব্যাহত হামলা এই আর্থিক সংকট আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে বলে জানান মার্চেনকো। হামলায় স্বাভাবিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ব্যাহত হচ্ছে, বিদ্যুৎ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, কারখানা ধ্বংস হচ্ছে এবং সরকারের কর আদায় বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
সম্প্রতি রাশিয়া ইউক্রেনের ডেটা সেন্টারগুলোতেও হামলা শুরু করেছে বলে দাবি করা হয়েছে। এর ফলে দেশটির ডিজিটাল অর্থনীতি ও যোগাযোগ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এদিকে কৃষ্ণসাগরে অবরোধের কারণে ইউক্রেনের কৃষকেরা বিশ্ববাজারে শস্য বিক্রির জন্য প্রয়োজনীয় সমুদ্রপথ হারিয়েছেন। সমুদ্রপথে বাণিজ্য বন্ধ থাকার প্রতিটি দিনেই ক্ষতির পরিমাণ বাড়ছে।
মার্চেনকো বলেন, ২০২২ সালের পর এই প্রথম ইউক্রেন বুঝতে পারছে যে তাদের কর ও শুল্ক প্রশাসনের কার্যক্রম প্রত্যাশার তুলনায় দুর্বল হয়ে পড়েছে। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে জব্দ করা রুশ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সম্পদ এর আগেও ইউরোপীয় ইউনিয়নের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল।
গত বছর ইউরোপীয় কমিশন এসব সম্পদ ব্যবহার করে ইউক্রেনের জন্য সুদমুক্ত ঋণসুবিধা তৈরির চেষ্টা করেছিল। তবে ডিসেম্বরে এক নাটকীয় শীর্ষ সম্মেলনের পর পরিকল্পনাটি ভেস্তে যায়। ওই সময় বেলজিয়াম এর বিরোধিতা করে বেশ কয়েকটি দেশকে সঙ্গে নিয়ে প্রস্তাবটির বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়।
এরপর বিকল্প পরিকল্পনা হিসেবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতারা যৌথ ঋণের ভিত্তিতে ইউক্রেনের জন্য ৯০ বিলিয়ন ইউরোর সহায়তা ঋণ গঠনে সম্মত হন। এর অর্ধেক অর্থাৎ ৪৫ বিলিয়ন ইউরো ২০২৬ সালের জন্য এবং বাকি ৪৫ বিলিয়ন ইউরো ২০২৭ সালের জন্য নির্ধারণ করা হয়।
সূত্র : ইউরো নিউজ








মন্তব্য